জানুয়ারি মাসে বেড়েছে তাপমাত্রা, নড়ছে বিপর্যয়ের কড়া

global warming

global warmingবিশ্বজুড়ে কার্বন নিঃসরণের লাগাম টেনে ধরতে পরিবেশ বিজ্ঞানীরা গত কয়েক দশক থেকেই আহ্বান জানিয়ে আসছেন পৃথিবীর হর্তা-কর্তা দের। কিন্তু বিশ্ব মাতব্বরদের একগুয়েমিতা এবং স্বার্থপরতার কারণে একাধিকবার উদ্যোগ নেওয়ার পরেও ভেস্তে গেছে বৈশ্বিক উষ্ণতা ঠেকানোর আলোচনা। ফলশ্রুতিতে বেড়েই চলেছে পৃথিবীর তাপমাত্রা। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ওশানিক অ্যান্ড অ্যাটমোসফেরিক অ্যাডমিনিসট্রেশন(এনওএএএ) জানিয়েছে সদ্য বিগত জানুয়ারি মাস ছিল বিগত শতাব্দীর সংশ্লিষ্ট মাসের গড়ের তুলনায় উষ্ণতম। আর পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা বলছেন তাতে পরিবেশ বিপর্যয় এবং লোনা আগ্রাসনের বিপদ ঘনিয়ে আসছে বাংলাদেশসহ পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলের সমুদ্রতীরবর্তী দেশগুলোতে।

এনওএএএ প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানানো হয়, ২০১৪ সালের জানুয়ারি মাসে পৃথিবীর সামগ্রিক গড় তাপমাত্রা ছিল ১২ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এই তাপমাত্রা বিগত শতকের জানুয়ারি মাসের সামগ্রিক গড় তাপমাত্রার চেয়ে দশমিক ৭ ডিগ্রি বেশি। ২০ শতকে জানুয়ারি মাসে সামগ্রিক গড় তাপমাত্রা ছিল ১২ ডিগ্রি সেলসিয়াস।

আইপিসিসির এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ২০১৫ সাল নাগাদ বাংলাদেশের জনসংখ্যা বাড়বে ৫০ শতাংশ। আর ২০২০ সাল নাগাদ সমুদ্রে পানির উচ্চতা এমন পর্যায়ে পৌঁছবে যার ফলে বাংলাদেশের ৪০ শতাংশ এলাকা অধিক হারে বন্যার ঝুঁকিতে পড়বে। বাংলাদেশের ওপর পরিচালত গবেষণা থেকে জানা গেছে, ২০৩০ ও ২০৫০ সাল নাগাদ বর্তমানের তুলনায় বার্ষিক গড় তাপমাত্রা যথাক্রমে ১ ও ১.৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং ২১০০ সাল নাগাদ ২.৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস বৃদ্ধি পেতে পারে।

একই সঙ্গে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে ২০৩০ ও ২০৫০ সাল নাগাদ সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বর্তমানের তুলনায় যথাক্রমে ১৪ ও ৩২ সেন্টিমিটার এবং ২১০০ সাল নাগাদ ৮৮ সেন্টিমিটার পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে৷ এর ফলে বাংলাদেশের কমপক্ষে ১০ শতাংশ এলাকা সমুদ্রের পানিতে তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। যার ফলে উপকূলীয় অঞ্চলের কোটি কোটি মানুষ উদ্বাস্তু হয়ে পড়বেন বলে অনুমান করা হচ্ছে৷ সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ৬৭ সেন্টিমিটার বাড়লে গোটা সুন্দরবনই পানিতে তলিয়ে যাবে। ইতিমধ্যে সুন্দরবনের ভারতীয় অংশে অবস্থিত ‘লোহাচরা’ও ‘সুপারিভাঙ্গা নামের দুটি দ্বীপ হারিয়ে গেছে।

গত বছর সন্দ্বীপ, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও টেকনাফের সমুদ্র উপকূলের পানি পরিমাপ করে গবেষকরা জানিয়েছেন, বাংলাদেশের উপকূলে প্রতি বছর ১৪ মিলিমিটার করে সমুদ্রের পানি বাড়ছে।  ২১০০ সাল নাগাদ যদি সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা এক মিটার বেড়ে যায়, তাহলে বাংলাদেশের দেশের ১৭ ভাগ এলাকা বিলীন হয়ে যাবে সমুদ্র গর্ভে এবং ৩০ লাখ হেক্টর জমি আক্রান্ত হবে লবণাক্ততার আগ্রাসনে। এরইমধ্যে কুতুবদিয়া এলাকার প্রায় ২০ হাজার মানুষ মূল ভূখণ্ড ত্যাগ করে অন্যত্র আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন।

পরিবেশবিদরা আশঙ্কা করছেন উষ্ণতা বাড়লে বাংলাদেশে একদিকে কৃষি জমি কমে যাচ্ছে এবং অপরদিকে ২০৫০ সাল নাগাদ কৃষিখাতে উৎপাদনক্ষমতা অনেক কমে যাবে বলে আইপিসিসির মূল্যায়ন থেকে প্রতীয়মান হয়। ফলে যেমন চলছে তেমন চলতে থাকলে এই শতাব্দীর মাঝামাঝি নাগাদ বাংলাদেশে এক ভয়াবহ রকমের খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা দেখা দিবে৷ বন্যা, ঘূর্ণিঝড়সহ নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগে বাংলাদেশে ফসল, ঘরবাড়ি, অবকাঠামো ঘন ঘন ধ্বংস হওয়ার ফলে একদিকে ত্রাণ ও পুনর্বাসনে ব্যস্ততা ও সম্পদ ব্যয় বাড়বে এবং অপরদিকে দেশে উন্নয়ন ব্যাহত হবে। দরিদ্র মানুষ নিঃস্ব এবং অদরিদ্র দরিদ্র হতে থাকবে। বাংলাদেশে জীববৈচিত্র্য দ্রুত নষ্ট হতে শুরু করেছে; ভবিষ্যতে তা আরো দ্রুত ও ব্যাপকভাবে ঘটতে পারে। কাজেই পরিবেশ ও অর্থনীতি ক্রমবর্ধমান সংকটের মুখোমুখি হতে থাকবে।

পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের সরাসরি ফল হিসেবে বাংলাদেশে অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত, বন্যা, খরা এবং ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানছে। গত বছরের প্রবল বন্যা ও ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় সিডরে ফসল এবং অবকাঠামোর ক্ষতি হয়েছে প্রায় ২.৮ বিলিয়ন ডলার৷ যে কারণে সারা বছরই দেশে লেগেছিল খাদ্য সমস্যা ও পণ্যের উচ্চ মূল্য।

নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী ইউনাইটেড নেশনস ইন্টার-গভর্মেন্টাল প্যানেল অন ক্লাইমেট চেইন (আইপিসিসি) আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছে, ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের মোট ভূমির শতকরা ১৭ ভাগ সমুদ্র গ্রাস করে নেবে৷ এর ফলে অন্তত ২০ মিলিয়ন মানুষ হয়ে পড়বে গৃহহীন। সমুদ্র গ্রাস করে নেয়ার ফলে বাংলাদেশের যে সব অঞ্চল ছেড়ে এরই মধ্যে লোকজন চলে যেতে বাধ্য হয়েছে বিজ্ঞানীরা এবং আইপিসিসি তাদের বাংলাদেশের প্রথম জলবায়ু শরণার্থী বলে অভিহিত করা হয়েছে। উপকূলবর্তী নিচু ভূমিগুলো ক্রমেই সমুদ্র গ্রাস করে নেয়ায় পরিস্থিতির আরো অবনতি ঘটবে বলে তারা ইতিমধ্যে সতর্ক করে দিয়েছে।