আজ জোহা দিবস

0
45

RU-DR-ZOHAআজ ১৮ ফেব্রুয়ারি। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় গত ৪৫ বছর ধরে এ দিনটিকে ‘শিক্ষক দিবস’ হিসেবে পালন করে আসছে।

আজ থেকে ৪৫ বছর আগে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জীবন রক্ষার্থে যে নিজের জীবন বিলিয়ে দিয়েছিলেন সেই আত্মত্যাগী মানুষটির নাম প্রফেসর ড. শামসুজ্জোহা। বাবা যেমন তার সন্তানকে আগলে রাখে, ঠিক তেমনি জোহা স্যার নিজের জীবন দিয়ে আগলে রেখেছিলেন সব ছাত্রের জীবন। শিক্ষকদের ইতিহাসে যিনি আত্মত্যাগের মহান দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন। এই ব্যক্তির দৃঢ়চেতা মনোভাব শিক্ষার্থীদের প্রেরণা যোগাতে পারে, পারে সাহসী করে তুলতে ।

শহীদ ড. শামসুজ্জোহাই হচ্ছেন পাকিস্তানী হানাদারদের হাতে নিহত প্রথম বুদ্ধিজীবী। মূলত তার শহীদ হওয়ার মধ্য দিয়ে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে আইয়ুব বিরোধী আন্দোলন চরম আকার ধারণ করে ।

১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররাও দুর্বার আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদের আন্দোলনের কর্মসূচির ঘোষণায় পাক-বাহিনী ১৪৪ ধারা জারি করে। কিন্তু ১৮ ফেব্রুয়ারি সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা এ ধারা উপেক্ষা করে মেইন গেটের সামনের মহাসড়কে পাকিস্তানি স্বৈরাশাসনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ মিছিল করেন।

খবর পেয়ে প্রক্টর ড. জোহা মেইন গেইটে ছুটে যান। প্রক্টর হিসেবে তিনি ছাত্রদের শান্ত করার এবং ক্যাম্পাসে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেন। ছাত্ররা পিছু হঠতে না চাইলে পাক বাহিনীর ক্যাপ্টেন হাদী ছাত্রদের গুলি করার নির্দেশ দেয়। ড. জোহা ডন্ট ফায়ার! ডন্ট ফায়ার!! বলে চিৎকার করতে থাকেন। তিনি ছাত্রদের ক্যাম্পাসে ফিরিয়ে আনার আশ্বাস দেন।

জোহা স্যার পাক বাহিনীর ক্যাপ্টেন হাদীর উদ্দেশে বলেন ‘আমার কোনও ছাত্রের গায়ে গুলি লাগার আগে গুলি যেন আমার গায়ে  লাগে’।

৬৯ এর গণঅভ্যুত্থানের সময় পাক বাহিনীর পুলিশদের উদ্দেশ্য তৎকালীন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাবি) প্রক্টর প্রফেসর ড. শামসুজ্জোহা দৃঢ়কণ্ঠে এভাবেই কথাগুলো বলেছিলেন।

কিন্তু প্রক্টরের আশ্বাসে কোনো কর্ণপাত না করে বেলা ১১টার সময় ক্যাপ্টেন হাদী তার পিস্তল বের করে ড. জোহাকে লক্ষ্য করে গুলি করে। গুলি করার সঙ্গে সঙ্গে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন স্বৈরচারবিরোধী আন্দোলনের মহান নেতা। বুকের তাজা রক্তে রঞ্জিত হয়েছিল মতিহারের নিষ্পাপ সবুজ চত্বর। হাসপাতাল নেয়ার পথে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। ছাত্রদের জীবন বাঁচাতে চলে গেলেন না ফেরার দেশে।

গত ২ ফেব্রুয়ারি যখন সহকারী প্রক্টরদের নির্দেশে সাধারণ শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে পুলিশ ও ছাত্রলীগ হামলা করে করে। তখন এক শিক্ষার্থী সহকারী প্রক্টরদের উদ্দেশ্য ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন ‘আমাদের ভাবতে অবাক লাগে যে আপনারা জোহার ক্যাম্পাসে চাকরি করেন, আপনাদের সামনে সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীদের ওপর গুলি চালায় আর আপনারা চেয়ে দেখেন, লজ্জা থাকলে আত্মহত্যা করা উচিত’।

কি এমন শিক্ষা দিয়েছিলেন তৎকালীন প্রক্টর স্যার, যার কারণে এই শিক্ষার্থী তাকে না দেখে তার প্রতি এতো শ্রদ্ধা, আবেগ ও ভালোবাসা।

তার শাহাদতের ফলেই তৎকালীন পূর্ব পকিস্তানে আইয়ুব বিরোধী আন্দোলন চরম আকার ধারণ করে এবং বাংলাদেশ স্বাধীনতার ধারা উন্মুক্ত হয়। তার এই শাহাদাতের দিনটাকে স্মরণ রাখতে নানা কর্মসূচির মধ্যে দিয়ে ১৮ ফেব্রুয়ারি পালন করা হয় রাবি শিক্ষক দিবস। দীর্ঘদিন থেকে এই দিবসটিকে  জাতীয়ভাবে পালনের দাবি করে আসছে রাবি পরিবার।

জন্ম ১৯৩৪ সালে পশ্চিম বঙ্গের বাঁকুড়ায়। লেখাপড়া শুরু করেন বাঁকুড়া জেলা স্কুলে। ১৯৪৮ সালে এই স্কুল হতে প্রথম বিভাগে চারটি লেটারসহ ম্যাট্রিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। পরে বাঁকুড়া ক্রিশ্চিয়ান কলেজ থেকে প্রথম শ্রেণীতে ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রসায়ন সম্মান শ্রেণীতে ভর্তি হন। ১৯৫০ সালের পর ড.জোহার পরিবার তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে চলে আসে। ১৯৫৩ সালে ড. জোহা দ্বিতীয় শ্রেণীতে সম্মান ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৫৪ সালে তিনি প্রথম শ্রেণীতে এমএসসি ডিগ্রি লাভ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র থাকার সময় তিনি ৫২’র ভাষা আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশ গ্রহণ করেন। ১৯৬১ সালে ২৩ ফেব্রুয়ারি রাজশাহী আবাসিক শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬৮ সালের ১৫ এপ্রিল তাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরের দায়িত্ব দেওয়া হয়। ড. জোহা বিভিন্ন গবেষণা কর্মের সঙ্গেও জড়িত ছিলেন। দেশি- বিদেশি বিভিন্ন জার্নালে তার বেশ কয়েকটি প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়।

এই মহাপ্রয়াণের চলে যাওয়ার দিনে  বিভিন্ন মহলের দাবি ড. জোহার নামে প্রশাসন ভবনের সামনে জোহার সমাধী থেকে জুবেরী ভবন পর্যন্ত সড়কটির নামকরণ করা হোক।

ড. জোহার স্মৃতিকে চির অম্লান করে রাখার জন্য রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি ছাত্র হলের নামকরণ করা হয়েছে তার নামানুসারে। মেইন গেটে গুলিবিদ্ধ হওয়া তার স্থানটিতে নির্মাণ করা হয়েছে জোহা স্মৃতি ফলক এবং মেইন গেইট দিয়ে প্রবেশ করলে প্রশাসনিক ভবনের সামনে অবস্থিত শহীদ জোহার সমাধী।