ঝিনাইদহে বাউ ও আপেলকুলের বাম্পার ফলন

0
225
Jhenidah-Bau-Kul-pic

Jhenidah-Bau-Kul-picঝিনাইদহ জেলায় এবারও সুস্বাদু বাউ ও আপেল কুলের বাম্পার ফলন হয়েছে। তবে দাম কমে যাওয়ায় হতাশ কৃষকরা।
পাইকারি বাজারে প্রতি কেজি কুল বিক্রি হচ্ছে ২৫ থেকে ৩০ টাকায়। অনাবাদি জমি, বসতবাড়ির আশপাশসহ বিভিন্ন মাঠে শুধু কুলের গাছ। জেলার বেকার ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মানুষ এবং প্রান্তিক চাষিরা উচ্চ ফলনশীল এ কুলের আবাদ করে অল্প সময়ে অধিক লাভের আশায় ব্যাপকহারে এ চাষ করেছেন।

ঝিনাইদহ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অফিস সূত্রে জানা গেছে, গত মৌসুমে জেলায় ২১৫ হেক্টর জমিতে ২১৮টি বাউ এবং আপেল কুলের বাগান করা হয়েছিল। উৎপাদন হয় হেক্টর প্রতি ১৮ মে.টন কুল আর গাছের পরিমাণ ছিল ১১ ল ৪৬ হাজার। এবার জেলার ৬টি উপজেলাতেই গত বছরের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ পরিমাণ কুলের আবাদ হয়েছে বলে কৃষি অফিস জানিয়েছে।

কৃষি অফিসের সূত্র মতে, গত মৌসুমে ঝিনাইদহ সদরে ১৬ দশমিক ৮ হেক্টর জমিতে আপেল কুলের ১২ হাজার ৬৪০টি গাছের ১৩৪টি বাগান ছিল। উৎপাদন হয় ৭ দশমিক ৫ মে.টন। আর ২২ হেক্টর জমিতে বাউ ও থাই কুলের ২৯ হাজার ৪শ গাছে ১৮৯টি বাগানে ৯ মে. টন কুল উৎপাদন হয়। কালীগঞ্জ উপজেলায় ২.৫ হেক্টর আপেল কুলের ১২ হাজার ৮৩০টি গাছের ১৫টি বাগান ছিল, উৎপাদন হয় ৫ মে.টন। আর বাউ ও থাই কুলের ১৬ হাজার ১২০টি গাছের ৮৫টি বাগান ছিল, ২২ হেক্টর জমিতে চাষ হয়। আর উৎপাদন হয় ৮ মে.টন। কোটচাঁদপুর উপজেলায় ৩.৮৩ হেক্টর জমিতে ২ হাজার ৫৯৫টি গাছের ২৮টি আপেল কুলের বাগান ছিল, ফলন হয় ৭ মে. টন। এছাড়া বাউ ও থাই কুলের ২০ দশমিক ৩৯ হেক্টর জমিতে ১৫ হাজার ৯৯১ টি গাছের ১৩৯টি বাগান ছিল, উৎপাদন হয় ১১ মে.টন কুল।

জেলার মহেশপুর উপজেলায় গত মৌসুমে ৪০ হেক্টর জমিতে ৫৪ হাজার গাছের ৯০টি আপেল কুলের বাগান ছিল। ফলন হয় ৭ দশমিক ৫ মে.টন। এছাড়া বাউ ও থাই কুলের চাষ হয় ৪৫ হেক্টর জমিতে। ৬০ হাজার ৭৫০টি গাছের ১০৫টি বাগানে ফলন হয় ৮ দশমিক ৫ মে.টন। শৈলকূপা উপজেলায় ৪ দশমিক ২৪ হেক্টর জমিতে ১ হাজার ৮১০টি গাছের ১৪টি আপেল কুলের বাগানে ফলন হয় ৫ দশমিক ১ মে. টন। থাই ও বাউ কুলের চাষ হয় ১৯ দশমিক ১৭ হেক্টর জমিতে, ১০ হাজার ৪৬৪টি গাছের বিপরীতে ৮৬টি বাগানে উৎপাদন হয় ১০ দশমিক ৯ মে. টন কুল এবং হরিণাকুণ্ডু উপজেলাতে ১৬ দশমিক ৫৮ হেক্টর জমিতে ৪৩টি বাগানে ৯ হাজার ৮৪০টি গাছে ৮ দশমিক ৫ মে.টন আপেল কুলের ফলন হয়। বাউ ও থাই কুলের চাষ হয় ২ দশমিক ৯৬ হেক্টর জমিতে, ৩ হাজার ১৭৭টি গাছের বিপরীতে ১৪টি বাগানে উৎপাদন হয় ১৫ মে.টন কুল।

এছাড়াও বিচ্ছিন্ন ভাবে রাস্তার পাশে, পুকুরধারসহ বিভিন্ন স্থানে সৌখিন ব্যক্তিবর্গ বাউ কুলের আবাদ করে। কৃষকেরা জানান, রোপণের ৬ মাসের মধ্যে এ দুটি জাতের শাখায় শাখায় বাহারী ফুল ফলে ভরে যায়। বীজ ছোট হওয়ায় শাসের পরিমাণ ৮০ থেকে ৯০ ভাগ। এর বোটা শক্ত তাই ঝড় বাতাসেও ঝরে পড়ার কোনো ভয় থাকে না। পূর্ণ বয়স্ক একটি গাছ থেকে ১৫০ থেকে ২০০ কেজি পর্যন্ত কুল পাওয়া সম্ভব। বাজারে এসব কুল ৫০ থেকে ৬০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়। আগাম উঠলে এর দাম আরও বেশি পাওয়া যায়। উচ্চফলনশীল এবং রসালো বাউ কুলের আকার বেশ বড়। ১২-১৪টি কুলেই কেজি হয়। অপর দিকে বাজারে আপেল কুলের জনপ্রিয়তা বাউ কুলের থেকে বেশি। মাঝারি আকারের আপেলকুল কেজিতে ৫০ থেকে ৬০টি হয়। এটিও সুস্বাদু এবং সুমিষ্ট। সংরণ মতা অন্য যে কোনো কুলের তুলনায় বেশি বলে রফতানিও করা যায়। ঝিনাইদহ সদর উপজেলা কৃষি অফিস সুত্র জানায়, প্রতি একর জমিতে ৩শ’টি গাছ রোপণ করা যায়। নিয়মিত সার ঔষুধ প্রয়োগের পাশাপাশি নিবিড় পরিচর্যা ও জৈব সার প্রয়োগ করে যে কোনো অঞ্চলে বাউ ও আপেল কুলের চাষ করা যায়। গাছ লাগানোর প্রথম বছর থেকেই ফল ধরতে শুরু করে এবং প্রতিবছরই ফল হয়।

সরেজমিনে ঝিনাইদহের বিভিন্ন মাঠ ঘুরে দেখা গেছে, সবজি বা অন্যান্য ফসল ও ফলমুলের পাশাপাশি বাউ ও আপেল কুলের বাগান করেছে কৃষকেরা। গত বছরের গাছের পাশাপাশি নতুন নতুন বাগানও করা হয়েছে। এসব বাগানে ছোট ছোট শাখা প্রশাখায় ব্যাপকভাবে ফুল ও ফল ধরেছে। বাগান গুলোতে আগাম কুল বড় হয়ে উঠেছে। জেলার কালীগঞ্জ উপজেলার নিয়ামত ইউনিয়নের নরেন্দ্রপুর ঘোষনগর, মোস্তবাপুর, আড়–য়াশুলা, পৌর এলাকার ইশ্ব^রবা, চাঁচড়া, ঝিনাইদহ সদরের হাটগোপালপুর, গান্না, মধুহাটি ইউনিয়নের বেড়াশুলা, শৈলকূপার গাড়াগঞ্জ, ভাটই, বারইপাড়া ও ঝাউদিয়াসহ বিভিন্ন গ্রামে বাউ ও আপেল কুলের ব্যাপক বাগান রয়েছে। বিচ্ছিন্ন ভাবেও সুস্বাদু এসব ফলের চাষ শুরু হয়েছে। বাজারে আঙুর আপেলের দোকানের অনেকটা স্থানই দখল করে নিয়েছে বাহারী বাউ ও আপেলকুল।

ঝিনাইদহ-কুষ্টিয়া সড়কের ভাটই এলাকায় বাউকুলের বাগান ঘুরে দেখা গেছে, প্রতিটি গাছে বিরাট আকৃতির সব বাউকুল ধরেছে। কুলের ভারে গাছ নুয়ে পড়ছে। বাগান মালিক সাইফুল ইসলাম জানান, দুই বিঘা জমিতে গত বৈশাখ মাসে ২০০টি বাউকুলের চারা রোপণ করেন। ফল ধরা পর্যন্ত এতে খরচ হয় ৬০ হাজার টাকা। এসব চারার প্রতিটিতে ২০ থেকে ৩০ কেজি ফল ধরেছে। এরই মধ্যে তিনি ২০ মণ বাউকুল বিক্রি করেছেন। ধারণা করছেন, দুই বিঘা জমিতে ১৪০ মণ বাউকুল ফলবে। সাইফুল বললেন, তীব্র শীতের কারণে বাউকুল পাকেনি। এখন সব বাগানের কুল একসঙ্গে পেকে গেছে। এ ছাড়া ঢাকা, বরিশাল, টেকেরহাটসহ অন্য জেলার পাইকাররা কুল কিনতে ঝিনাইদহে আসছেন না। যে কারণে কুলের দাম কমে গেছে। তিনি আরো বলেন, রোববার আমি দুই মণ কুল বিক্রি করেছি প্রতি কেজি ২৮ টাকায়। গত বছর এই কুলের দাম ছিল ৩০ থেকে ৩৫ টাকা। দাম কমে যাওয়ার কারণে এবার লাভ কম হবে। তারপরও ধারণা করা হচ্ছে, দুই বিঘা জমিতে বাউকুল বিক্রি করে লাভ দাঁড়াবে ৭০ থেকে ৮০ হাজার টাকা। তিনি দাবি করেন, বাউকুল বিদেশে রফতানি করে সম্ভাবনাময় এ ফসলটির অস্তিত্ব্ টিকিয়ে রাখার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপরে এগিয়ে আসা উচিত। এ ছাড়া বাউকুল নিয়ে আরো বেশি গবেষণা করারও প্রয়োজন।

সদর উপজেলার মধুহাটি ইউনিয়নের বেড়াশুলা গ্রামের কালু ও রুনু মিয়া এবার বাউ কুলের বাগান করেছেন। তারা জানান, শীতের এই ফল আগাম বিক্রি করতে পারবেন। ইতোমধ্যেই কুল গুলো বড় হয়ে উঠেছে, ধরেছেও ব্যাপক। শৈলকূপা উপজেলার বারইপাড়া গ্রামের বাউকুল চাষি আতিকুর রহমানের ২ একর জমির বাউকুল গাছে এবার দ্বিতীয় দফা কুল ধরছে। তিনি জানান, গত বছর প্রায় ২ লাখ টাকা খরচ করে ৬ লাধিক টাকার বাউকুল বিক্রি করেছিলেন। এবারো শাখা প্রশাখায় প্রচুর ফল ধরেছে। বাজার ভালো হলে এবারো লাভ করতে পারেবেন বলে আশা করছেন। ঝিনাইদহের অন্যতম নার্সারি ব্যবসায়ী অঙ্কুর নার্সারির মালিক সিতাব উদ্দিন জানান, গত বছর বাজারে বাউ ও আপেল কুলের দাম কিছুটা কম হওয়ায় এবার চারা বিক্রিও হয়েছে কম। বাজার ভালো হলে এই ফলের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে বলে তিনি জানান। ঝিনাইদহ সদরের উপ-সহকারি কৃষি কর্মকর্তা গোলাম কিবরিয়া জানান, ঝিনাইদহের ৩টি উপজেলা- শৈলকূপা, কোটচাঁদপুর ও সদর উপজেলায় গতবছর থেকে এনএটিপি প্রকল্পের অধীনে বাউকুলের চাষ চলছে। প্রদশর্নী প্লট করে মাঠ দিবসসহ কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করণে নানা পদপে নেওয়া হচ্ছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর ঝিনাইদহের উপপরিচারক কেএম আলতাফ হোসেন বাউ ও আপেল কুলের চাষ প্রসঙ্গে বলেন, এখানকার জমি, আবহাওয়া কুল চাষের জন্য ব্যাপক উপযোগী। গত মৌসুমের তুলনায় এবার আরো বেশি বাউ ও আপেলকুলের চাষ হয়েছে বলে তিনি জানান। তবে কি পরিমাণ জমিতে এই চাষ হয়েছে তা মৌসুম শেষের পরিসংখ্যানে জানা যাবে বলে উল্লেখ করেন।