বাণিজ্য মেলা: প্রাপ্তির চেয়ে অপ্রাপ্তিই বেশি

0
47
Trade-Fair-15.01.13--5
পণ্যে এমন ছাড়ের ঘোষণাও টানতে পারে নি ক্রেতা। নানা কারণেই এবারকার বাণিজ্য মেলাটি জমে ওঠেনি

নানা অপূর্ণতা আর অপ্রাপ্তি নিয়ে শেষ হল ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলার ১৯তম আসর। রপ্তানি বাণিজ্যে গতি যোগানোর লক্ষ্যে এ মেলা শুরু হলেও লক্ষ্য অর্জন সামান্যই হচ্ছে এ মেলা থেকে। বিশেষ করে এবারের মেলা রপ্তানি বিবেচনায় অনেকটাই ব্যর্থ। আগের বছরের তুলনায় এবার রপ্তানি আয় অর্ধেকে নেমেছে। এছাড়া স্থানীয় বেচা-বিক্রিও কম হয়েছে বলে জানিয়েছেন মেলায় অংশ নেওয়া বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা।

বাণিজ্য মেলার আয়োজক রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য অনুসারে, গত বছর বাণিজ্য মেলায় ১৫৭ কোটি টাকার রপ্তানি আদেশ পাওয়া গিয়েছিল। কিন্ত এবার তা প্রায় অর্ধেকে নেমেছে। মেলা থেকে পাওয়া গেছে ৮০ কোটি ৪৪ লাখ টাকার রপ্তানি আদেশ।

এদিকে মেলায় বেশ কয়েকটি প্যাভিলিয়নে কথা বলে জানা যায়, বেচাবিক্রিতে প্রত্যাশা পূরণ করতে পেরেছে এমন দোকানির সংখ্যা হাতেগোণা কয়েকটি। এর মধ্যে যারা শুধু পণ্যের ব্র্যান্ডিং করতে এসেছে কেবল তাদেরই প্রত্যাশা পূরণ হয়েছে। আর যারা ব্র্যান্ডিং এর পাশাপাশি বিক্রির লক্ষ্য নিয়ে এসেছে তাদের অধিকাংশেরই প্রত্যাশা এবং প্রাপ্তির মধ্যে বেশ ফারাক রয়ে গেছে।

তবে যে সকল প্যাভিলিয়ন সন্তুষ্টির তালিকায় রয়েছে তারা একটি বিশেষ কারণে সন্তুষ্ট। মেলার গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট ও মাঝামাঝি স্থানে প্যাভিলিয়ন নেওয়ার কারণে বেচাবিক্রি বেশি হয়েছে এমন ঈঙ্গিত দেন তারা। আর এই জন্য তাদেরকে গেল বছরের চেয়ে অতিরিক্ত ভাড়া গুণতে হয়েছে।

এবার বিক্রি কম হওয়ার জন্য অধিকাংশ ব্যবসায়ী রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রভাবকে দায়ী করলেন।

বেঙ্গলের প্যাভিলিয়ন ইনচার্জ সানজিদ অর্থসূচককে বলেন, গতবারের তুলনায় এবার বেচাবিক্রি খুবই কম। এবার খরচ বেশি করেও প্রত্যাশার মাত্র ৭০ শতাংশ পূরণ হয়েছে। যেখানে গতবার খরচ কম ছিল এবং প্রত্যাশাও পূরণ হয়েছিল। তবে এবার ৭০ শতাংশ টার্গেট পূরণ হওয়ার পেছনে ভাল প্লেসে প্যাভিলিয়ন নিতে পারাটাকেই সাফল্য মনে করেন। আর এ জন্য অতিরিক্ত টাকা গুণতে হয়েছে বলে জানান তিনি।

এদিকে ইলেকট্রনিক্স পণ্যের নির্মাতা ও পরিবেশক প্রতিষ্ঠান সিঙ্গারের প্যাভিলিয়ন ইনচার্জ রকিবুল ইসলাম বলেন, আমরা শুধু ব্র্যান্ডিংয়ের জন্যই মেলায় এসেছি। বিক্রি নিয়ে আমাদের কোন টার্গেট নেই। তবে ব্র্যান্ডিংয়ের কাজটা মোটামুটি করতে পেরেছি।

এশিয়ান টেক্সাটাইলে কর্মরত ইনচার্জকে কোনো কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই তিনি বললেন, ইপিবির প্রতি আমাদের কোনো অভিযোগ নাই। বেচা বিক্রি কেমন জানতে চাইলে তিনি বলেন, এক কোটি টাকার উপরে বিনিয়োগ করা হয়েছে। এবারের মেলার যে অবস্থা তাতে কত টাকা বিক্রি হতে পারে তা আপনার ভাল জানেন।

প্রাণের সহকারী ম্যানেজার জুয়েল হোসেন বলেন, শেষ পর্যন্ত আমাদের টার্গেট পূরণ হয়নি। তবে এবারের কেনাবেচা গতবারের তুলনায় ভালো না। কারণ হিসেবে একই কথা বললেন।

তবে এমন হতাশা শুধু দেশী ব্যবসায়ীদের মধ্যে নয়। বিদেশী ব্যবসায়ীদের মুখেও এরকম হতাশার বাণী শোনা গেছে।

কোরিয়ান জুয়েলারির দোকানের ইনচার্জ মি. তাং বলেন, বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট মেলার শুরুর দিকে একটু খারাপ ছিল। শেষ পর্যন্ত বেশ ভালোই হলো তবে প্রত্যাশা পুরোপুরি পূরণ হয়ে উঠেনি।

হংকংয়ের গহণা বিক্রেতা মি. ইয়োলা অর্থসূচককে বলেন, গতবছর বেশ ভাল কাটতি হয়েছে। এবার কেন যেন তা কম।

কেন কম এমন প্রশ্ন করলে তিনি হেসে হেসে বললেন এটা বাংলাদেশের মানুষেরাই ভাল জানে। ওকে বাই।

এদিকে মেলা সম্পর্কে চাপা ক্ষোভ নিয়ে বিদায় নিল পাকিস্তানী ব্যবসায়ীরা। তাদের ক্ষোভ বাংলাদেশের ভিসা পেতে তাদের অনেক বেগ পেতে হয়েছে।

ইউসুপ নামে পাকিস্তানী এক শাল বিক্রেতা বলেন, বাংলাদেশে আসতে ৬শ রুপির ভিসা সংগ্রহ করতে তাদের দুই হাজার রুপি গুণতে হয়েছে। এছাড়া ভিসা সংক্রান্ত বিষয়ে সেদেশে নিযুক্ত বাংলাদেশী হাই কমিশনে তারা অনেক হয়রানির শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ তুলেন।

বাণিজ্য মেলা কতটুকু সফল হয়েছে এ ব্যপারে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাষ্ট্রির সভাপতি মোহাম্মদ শাহজাহান খানের কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, মেলা নিয়ে আমরা বেশ সন্তুষ্ট।

ব্যবসায়ীদের মধ্যে অনেকেই বলছে তাদের টার্গেট পূরণ হয়নি এ ব্যপারে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, এর কারণ হিসেবে আসলে মেলা শুরুর দিকের রাজনৈতিক অস্থিরতা একটু প্রভাব ফেলতে পারে।

ব্যবসায়ীদের থেকে এত হতাশা আর অপ্রাপ্তির বাক্য শুনা গেলেও ইপিবি বলছে ভিন্ন কথা। তারা মেলা নিয়ে বেশ সন্তুষ্ট।

এ ব্যাপারে মেলায় দায়িত্বপ্রাপ্ত ইপিবির ভাইস চেয়ারম্যান শুভাশিষ বসু ও সদস্য সচিব ড. বিকর্ন কুমার একই বাক্য প্রকাশ করেন।

তারা বরাবরই অর্থসূচককে বলেন, রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে এক ধরণের অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে মেলা শুরু হলেও শেষ পর্যন্ত তা কেটে গেছে। ক্রেতা দর্শনার্থীরা বেশ সাড়া দিয়েছে। ব্যবসায়ীরাও সন্তোষ প্রকাশ করেছে। সবকিছু মিলিয়ে আয়োজক হিসেবে আমরা সন্তুষ্ট।

তবে প্রাপ্তি হিসেবে মেলায় পণ্যের বিক্রি নয়, পণ্যের পরিচিতিকেই মনে করেন ব্যবসায়ীরা। তাই এক মাসে প্রতিষ্ঠানের পণ্যের যেটুকু পরিচিতি হয়েছে ভবিষ্যতে রাজনৈতিক অস্থিরতা না থাকলে বছরজুড়ে ব্যবসা বাণিজ্যের ধারা ইতিবাচক থাকবে এমন আশাতেই মেলার সমাপ্তি টানল তারা।