ধারণ ক্ষমতা ২০০, বন্দি ৬৩৯

0
46
Jhenaidah-Jail-Khana-

Jhenaidah-Jail-Khana-Pictureসকালে একটি পাতলা রুটির সঙ্গে এক আঙ্গুলে ওঠা কয়েক ফোটা গুড়, দুপুরে ডালের সঙ্গে গন্ধ চালের ভাত ও রাতে দুর্গন্ধযুক্ত সবজির পাশাপাশি নামমাত্র মাছ ও মাংসের তরকারি। এই হচ্ছে ৯৪ বছর আগে প্রতিষ্ঠিত ঝিনাইদহ জেলা কারাগারে বন্দিদের জন্য প্রতিদিনের খাবারের তালিকা।

ঝিনাইদহ জেলা কারাগারের অভ্যন্তরে খাবারে অনিয়ম, দুর্নীতি ও হাসপাতাল বেড নিয়ে অর্থ বাণিজ্য এবং বন্দিদের সঙ্গে দেখা করার নামে টাকা আদায়ের অভিযোগ নতুন নয়। কারাগার প্রতিষ্ঠার পর থেকেই কয়েদি হাজতিদের নিয়ে কারা প্রশাসন, ঠিকাদার ও কারাগারের মধ্যে মেট নামে মাস্তানদের দৌরাত্ম্য চলে আসলেও কোনো প্রতিকার নেই। বন্দিদের অভিযোগ, প্রতিবাদ করলেই মারধরের সঙ্গে ডাণ্ডাবেড়ী পরিয়ে সাজা ও বেশি বাড়াবাড়ি করলে যশোর জেল খানায় পাঠিয়ে হয়রানি করা হয়।

সরেজমিন দেখা গেছে, সরকারি নিয়ম না থাকলেও কারা কর্তৃপক্ষ দর্শনার্থী ফি হিসেবে ৫ টাকা আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে আরও বেশি নিচ্ছেন। এই টাকা সরকারি কোষাগারে জমা হয় না। পুরোটায় ভাগাভাগি করা হচ্ছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সব সময় সরকারি দলের প্রভাবশালী নেতার আত্মীয় স্বজনরা কারাগারের ঠিকাদারী পেয়ে থাকেন। দলীয় প্রভাব খাটিয়ে তারা নিম্নমানের তেল, কাঁচা বাজার, মাছ ও মাংস সরবরাহ করে থাকেন। বন্দিদের অভিযোগ মাংশের তরকারিতে মাংশ এবং মাছের তরকারিতে মাছ পাওয়া দুষ্কর। কারাকর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগসাজসে ঠিকাদারা বন্দিদের মাথাপ্রতি বরাদ্দ লোপাট করছেন নিম্নমানের খাবার দিয়ে।

ঝিনাইদহ জেলা কারাগারের সুপারেনটেনডেন্ট ইকবাল হোসেন জানান, ১৯১৮ সালে তৎকালীন ব্রিটিশ সরকার শহরের নবগঙ্গা নদীর তীরে ৫২ জন ধারণক্ষমতা সম্পন্ন ঝিনাইদহ উপ-কারাগারটি স্থাপন করেন। তিনি আরও জানান, ৯২ বছর একই স্থানে ৫২ জনের পরিবর্তে ৫/৬’শ বন্দি নিয়ে উপ-কারাগারটি দাঁড়িয়ে ছিল।

২০১০ সালে ঝিনাইদহের মথুরাপুর নামক স্থানে জেলা কারাগারটি নতুন আঙ্গিকে নির্মাণ শেষে চালু করা হয়। নতুনভাবে নির্মিত ঝিনাইদহ জেলা কারাগারে ধারণ ক্ষমতা দুই’শ হলেও বর্তমান ৬৩৯ জন বন্দি রয়েছে। করাগারে কোনো শিশু নেই, তবে রাজিব নামে এজন ভারতীয় হত্যা মামলায় বন্দি আছেন। তার শাস্তির মেয়াদ শেষ হলেও কারাগারে মধু থাকায় ইচ্ছে করেই রয়ে গেছেন। একজন বন্দি ব্রিটিশ সরকারের করা নিয়মে কারাগারে ৩৬ স্কয়ার ফিট স্থান পেয়ে থাকেন। জেল সুপার ইকবাল হোসেন জানান, করাগারে একজন বন্দি সারাদিনে মাত্র ৪০ টাকা সরকারিভাবে বরাদ্দ পাচ্ছেন। ব্রিটিশ সরকারের আমলে তৃতীয় শ্রেণির বন্দির জন্য এই বরাদ্দ এখনো রয়েছে, যা বর্তমান দ্রব্যমূল্য ও বাস্তবের চাহিদায় অপ্রতুল বলে তিনি মনে করেন।

তিনি খাবার নিয়ে বন্দিদের অভিযোগ প্রসঙ্গে বলেন, সরকারিভাবে গুদাম থেকে যে চাল ও গম বরাদ্দ দেওয়া হয়, তাই বন্দিদের খাওয়ানো হয়। চাল ও গমের মান ভালো নয় বলে তিনিও মনে করেন। রুটির সঙ্গে দেওয়া গুড়, সবজির তরকারি ও মাছ মাংসের পরিমাণ নিয়ে বন্দিদের ক্ষোভ প্রসঙ্গে সুপার ইকবাল হোসেন জানান ৪০ টাকার বরাদ্দে এর চেয়ে কি বেশি দেওয়া সম্ভব হয়?

সদ্য জামিন পাওয়া ব্যক্তিরা জানান, কারাগারের মধ্যে মৌসুমে ডাটা, পালং, মুলা ও বেগুন চাষ করে প্রতি ওয়াক্ত ওই সব তরকারি বন্দিদের খাওয়ানো হয়। তিনি আরও জানান, বর্তমান জেলার ও জেল সুপার আসার পর থেকে বন্দিরা ভালো আছেন এবং তাদের ওপর কোনো নির্যাতন করা হয় না। তবে জেলা থেকে মুক্তি পাওয়া ও বন্দি থাকা ব্যক্তিদের বক্তব্যের মধ্যে বেশ অমিল পাওয়া যায়।

বন্দি থাকাবস্থায় অনেকেই জেলার ও সুপারের বিপক্ষে বলতে নারাজ। কিন্তু জামিনে বের হলে তারা নানা অভিযোগ করেন। জেল থেকে ছাড়া পাওয়া ব্যক্তিরা অভিযোগ করেন, কারাগারে অনিয়ম, দুর্নীতির পাশাপাশি কিছু মেট নামে মস্তানদের দৌরাত্ম্যে বন্দিরা অসহায়। এছাড়া টাকা দিলে সুস্থ মানুষকে অসুস্থ বানিয়ে হাসপাতালে রাখা হচ্ছে। তাদের ভাষ্য মতে করাগারেরর ক্যান্টিনে উচ্চমুল্যে পণ্য বিক্রি করে জেল সুপার ও জেলার বাণিজ্য করে থাকেন। এ ছাড়া খাওয়ার মানও নিম্নমুখী। হাসপাতালের সিট বাণিজ্য করে কারা চিকিৎসক ডা. সাজ্জাদ রহিম।

হত্যা মামলায় আটক এক ব্যক্তি জানান, জেল খানায় যারা আছেন তাদের মধ্যে ৮৫ ভাগ ভালো মানুষ। সামাজিক দ্বন্দ্ব ও দালালির কারণে বেশিরভাগ মামলা হচ্ছে। জামিন হওয়া ব্যক্তিরা মনে করেন, বর্তমান বিএনপি ও জামায়াতের ৫০০ নেতাকর্মী কারাগারে আটক আছেন। বাকিরা অন্য মামলার আসামি। কারাগারের জেলার দিদারুল আলম কারাগারের ভিতরে বাইরে ঘটা এ সব অভিযোগ অস্বীকার করে জানান, আগে কি হয়েছে তা আমি বলতে পারি না।

তবে এখন কারাগারের হাজতি ও কয়েদিরা ভালো সুযোগ সুবিধা পাচ্ছেন। তিনি জানান আরও, বন্দিদের জন্য ঘরে ঘরে ফ্যান, টেলিভিশন এবং সেলাই মেশিন রয়েছে। সরকারিভাবেই এ সব উপকরণ দেওয়া হয়েছে। কোনো এনজিও বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের অনুদান করাগারে নেই বা প্রয়োজন হয় না।