বিজয় বাংলা সফটওয়্যারের রজত জয়ন্তী
সোমবার, ২১শে সেপ্টেম্বর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ
today-news
brac-epl
প্রচ্ছদ » টেক

বিজয় বাংলা সফটওয়্যারের রজত জয়ন্তী

Bijoyচলতি বছরের ১৫ ডিসেম্বর বিজয় বাংলা সফটওয়্যার ২৫ বছর পূরণ করছে। ১৯৮৮ সালের ১৬ ডিসেম্বর এই সফটওয়্যারটির জন্ম হয়েছিল। বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তি জগতের কিংবদন্তীতুল্য মানুষ মোস্তাফা জব্বার এই সফটওয়্যারটি প্রস্তুত করে বাজারজাত করেন। ৮৮ সালে শুধুমাত্র মেকিন্টোস কম্পিউটারের জন্য প্রচলিত এই সফটওয়্যার ও কি-বোর্ড গত ২৫ বছর ধরে বাংলাদেশ, পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, ত্রিপুরাসহ বিশ্বের বাংলা ভাষাভাষী মানুষদের কম্পিউটারে বাংলা  লেখার সর্বাধিক জনপ্রিয় সফটওয়্যার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

এখন এই সফটওয়্যারটি মেকিন্টোস, উইন্ডোজ, লিনাক্স ও এন্ড্রয়েড অপারেটিং সিস্টেমের জন্য পাওয়া যায়। বর্তমানে বিজয়-এর তিনটি সংস্করণ; লিনাক্স, এন্ড্রয়েড এবং উইন্ডোজের বিজয় ইন্টারনেট বিনামূল্যে বিতরণ করা হয়। এর বাইরে মেকিন্টোসের জন্য বিজয় একাত্তর, উইন্ডোজের জন্য বিজয় বায়ান্ন রজত জয়ন্তী সংস্করণ এবং বিজয় একাত্তর নামক সংস্করণসমূহ বাজারজাত হয়ে থাকে। এর বাইরেও উইন্ডোজের জন্য প্রণীত বিজয় একুশে সরকারি অফিস-আদালত ও কর্পোরেট হাউসে ব্যবহারের জন্য বাল্ক লাইসেন্স প্রদান করা হয়।

কম্পিউটারে বাংলা লেখার জন্য বিজয়-এর আগে ও পরে  অনেক বাংলা সফটওয়্যার প্রচলিত হলেও এবং বাজারে বেশ কিছু বাংলা সফটওয়্যার প্রচলিত থাকার পরও বিজয় তার নিজস্ব মহিমায় উদ্ভাসিত হয়ে আছে। এখনও পেশাদারী কাজে শুদ্ধভাবে বাংলা লেখার জন্য বিজয় সেরা বাংলা সফটওয়্যার হিসেবে সার্বজনীনভাবে স্বীকৃত। অন্য সকল বাংলা লেখার সফটওয়্যারের চাইতে বিজয়-এর আলাদা বৈশিষ্ট্য আছে।  এটি কেবল একটি কি-বোর্ড বা সফটওয়্যার নয়, এটি একটি নতুন ধারণা, একটি উদ্ভাবন।

প্রথমত, বিজয় বাংলা ভাষা ও বঙ্গলিপি সংশ্লিষ্ট বলে এর সাথে বাঙালির আবেগের সম্পর্কটা গভীর। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশের আর কোনো সফটওয়্যার এতো মানুষ ব্যবহার করে না।  এটি বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠতম ডিজিটাল প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন। এখন পর্যন্ত এটিই একমাত্র সফটওয়্যার প্যাটেন্ট।

বিজয় ডিজিটাল যন্ত্রে বাংলা ভাষা ও লিপি ব্যবহারের জন্য একটি প্লাটফরম তৈরি করেছে। এটি এমন নয় যে, আর কোনো সফটওয়্যার বা অন্য কারও প্রচেষ্টা এখানে ছিল না। তবে বিজয় ডিজিটাল যন্ত্রে বাংলা হরফকে অবিকৃত রেখে এর পরিপূর্ণ প্রয়োগ নিশ্চিত করেছে।

বিস্ময়কর মনে হতে পারে যে, গত ২০০৮ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৮ নভেম্বর ২০১৩ পর্যন্ত প্রতিমাসে গড়ে ৩২,১৮৮টি বিজয় লেআউট মুদ্রিত কি-বোর্ড বাংলাদেশে বৈধভাবে আমদানী হয়েছে।  এই সময়ে শুধুমাত্র বৈধভাবে বিজয় কি-বোর্ড লেআউট মুদ্রিত কি-বোর্ড আমদানি হয়েছে ২২,৬৩,৭০৮টি। ১৯৯৮ সাল  থেকে ২০০৮ পর্যন্ত সময়কালের কোনো হিসাব কোথাও নেই। সেই সময়েও আরও অন্তত ৩০-৫০ লাখ বিজয় বাংলা কি-বোর্ড লেআউট মুদ্রিত কি-বোর্ড আমদানি হয়ে থাকতে পারে। এছাড়াও বিগত পাচ বছরে এমনকি অনুমতি ছাড়া আমদানী করা কি-বোর্ডের হিসাবও পাওয়া যাবে না। দেশের কোনো মেধাজাত পণ্য এখন পর্যন্ত এমন একটি রেকর্ড তৈরি করতে পারেনি। অন্যদিকে গত ২৫ বছরে কী পরিমাণ কম্পিউটারে বিজয় ইন্সটল হয়েছে তা হয়তো আন্দাজ করা যাবে না।

তবে এটি নিশ্চিত করেই বলা যাবে যে, সেই সংখ্যা দেশের কম্পিউটার ব্যবহারের সংখ্যার প্রায় কাছাকাছি। হয়তো শতকরা ৯৫ ভাগ কম্পিউটারে এই সফটওয়্যারটি ইনস্টল হয়েছে। এই সফটওয়্যারটির সম পরিমাণ পাইরেসি দেশের আর কোন সফটওয়্যার নিয়ে হয়নি।  কেবলমাত্র মাইক্রোসফট উইন্ডোজ বা অফিস বিজয় এর কাতারে রয়েছে। এর বাইরেও দুনিয়ার যেখানেই বাংলা ভাষাভাষী আছে সেখানেই এই সফটওয়্যারটি বিরাজ করছে।  ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, আসাম ও ত্রিপুরায় এই সফটওয়্যারটি এখনও অন্য যে কোন বাংলা সফটওয়্যারের চাইতে অধিক প্রচলিত। এই সফটওয়্যারটি নিয়ে যতোটা বিতর্ক হয়েছে সম্ভবত তেমনটিও আর কোনো সফটওয়্যার নিয়ে হয়নি।

আমরা যদি গত ২৫ বছরে বাংলাদেশে বাংলা লেখার কি-বোর্ড ও সফটওয়্যারের বিবর্তন দেখি তবে এটি একেবারেই স্পষ্ট করে বলা যাবে যে, এই জগতের কেন্দ্রেই ছিল বিজয়। সরকার প্রমিত কি-বোর্ড করার সময় বিজয়কে ভিত্তি হিসেবে নিয়েছে। জাতীয় কি-বোর্ডটি বস্তুত বিজয় কি-বোর্ডের নকল। গত ২৫ বছরে দেশে এমন কোনো বাংলা সফটওয়্যার প্রচলিত হয়নি যাতে বিজয় কি-বোর্ড বা বিজয় সফটওয়্যারের ফন্ট বা প্রযুক্তি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।

বিজয় নামাকরণ: বিজয় হচ্ছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা এবং জনগণের বিজয়। ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর  বিকেল ৪-৩১ মিনিটে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে মুক্তি পায় বাংলার মানুষ, সেটিই বিজয়। বিজয় বাংলা লিপিকে সেই মুক্তি দিযেছে বলে এর বিজয় নামাকরণ করা হয়েছে। মোস্তাফা জব্বার তার ছোট মেয়ে সুনন্দা শারমিন তন্বীর পাঁচ বছর বয়সে দেয়া নাম বিজয় তার সফটওয়্যার ও কি-বোর্ডের জন্য গ্রহণ করেছেন।

বিজয়-এর প্রযুক্তি ও জন্ম:  বিজয় কি-বোর্ড ও সফটওয়্যার প্রণয়নের সময় বাংলা হরফকে কি-বোর্ডে বিন্যস্ত করার একটি নতুন ধারণা কাজে লাগানো হয়েছে। বাংলা মূল বর্ণগুলোর মাঝে শুধুমাত্র ব্যঞ্জনবর্ণ ৩৯টি, দুটি স্বরবর্ণ, ৯টি স্বরচিহ্ন,  হসন্ত-দাড়ি ও তিনটি ফলাকে কি-বোর্ডে ঠাই দেওয়া হয়েছে। কি-বোর্ডের নর্মাল ও শিফট স্তর ছাড়া আর কোনো স্তর ব্যবহার করা হয়নি। যুক্তাক্ষর ও স্বরবর্ণ তৈরির জন্য হসন্তকে ব্যবহার করা হয়েছে। ফলে বাংলা যুক্তাক্ষর কি-বোর্ডে রাখার প্রয়োজন হয়নি। এতে বাংলা বর্ণকে যথাসম্ভব অল্পপ্রাণ-মহাপ্রাণ বা উচ্চারণের জোড় হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। বিজয়-এর প্রথম  কোডিং হয়েছে দিল্লীতে। দেবেন্দ্র জোশী নামক একজন ভারতীয় ১৯৮৮ সালের ডিসেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহে এই কাজটি করেন। এরপর বাংলাদেশে এর উন্নয়ন অব্যাহত থাকে।  ২৫ বছরে শত শত বাঙালি তরুণ-তরুণী এতে কাজ করেছে।

বিজয়’ লেআউট মুদ্রিত কি-বোর্ড: ১৯৮৮ সালে বিজয় কি-বোর্ড লেআউট মুদ্রিত কি-বোর্ড বাজারে আসে। ২০০৪ সালে বিজয় কি-বোর্ড লেআউট প্যাটেন্টকৃত হয় এবং ২০০৮ সাল থেকে এর লাইসেন্সিং চালু হয়। প্রচলিত আইন অনুসারে ২০২০ সাল পর্যন্ত বিজয় কি-বোর্ডের প্যাটেন্টের মেয়াদ বলবৎ থাকবে।

বিজয় এর অর্জন: গত ২৫ বছরে বিজয় দেশ-বিদেশে অর্জন করেছে অসাধারণ সফলতা। পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের সেরা সফটওয়্যারের পুরস্কার থেকে শুরু করে মোস্তাফা জব্বারকে এসোসিওর সম্মাননা পাইয়ে দেবার জন্য কৃতিত্ব বিজয়-এর। বেস্টওয়ে পুরস্কার বা পিআইবি সোহেল সামাদ পুরস্কার কিংবা নেত্রকোণার গুণীজন সম্মাননা সব কিছুর পেছনেই রয়েছে বিজয়-এর অবদান।

রজতজয়ন্তীতে নতুন বিজয়:  এবার রজত জয়ন্তীতে বিদ্যমান সংস্করণগুলোর সাথে নতুন যুক্ত হচ্ছে উইন্ডোজের জন্য বিজয় একাত্তর প্রো। এতে বিজয়, মুনির ও জাতীয় কীবোর্ড কাজ করে। এটি আস্কি, একাত্তর ও ইউনিকোড এনকোডিং-এ কাজ করে। এতে সকল ধরনের কনভার্টার রয়েছে। তবে এই সফটওয়্যারটি অন্য সকল সফটওয়্যারের চাইতে আলাদা এজন্য যে এটি কোয়ার্ক এক্সেপ্রেস নামক পেশাদারী পেজমেকআপ সফটওয়্যারের উচ্চতর সংস্করণগুলোতে (৬,৭,৮,৯,১০) কাজ করার পাশাপাশি উইন্ডোজ এক্সপি, উইন্ডোজ ভিস্তা, উইন্ডোজ সেভেন ও উইন্ডোজ এইটে কাজ করে। এটি আগের সকল সংস্করণের চাইতে অনেক দ্রুত কাজ করে। রজত জয়ন্তীতে বিজয়-এর গর্ব করার মতো আরও একটি বিষয় হচ্ছে যে, এতে এবার ১০০ ফন্ট পরিবার যুক্ত হলো। বাংলা লিপির এমন বৈচিত্র এর আগে আর কখনও দেখা যায়নি।

বিজয়-এর আগামি:  সামনের দিনগুলোতে বিজয় বাংলা সফটওয়্যারের সাথে বাংলা ব্যাকরণ, অভিধান, অপটিক্যাল ক্যারেক্টার রিডার ও নতুন নতুন ফন্ট  যোগ হবে। বিজয় স্মার্ট ফোন, ট্যাবলেট, পিসিসহ নতুন নতুন ডিজিটাল যন্ত্রের সকল ধরনের অপারেটিং সিস্টেমে প্রয়োগ করা হবে।

এই বিভাগের আরো সংবাদ