চট্টগ্রামে তীব্র গ্যাস সংকট, নিরসনে উদ্যোগ নেই

এমদাদুল সুমন

0
104
ছবি সংগৃহীত

বাণিজ্যিক নগরী চট্টগ্রামে দৈনিক ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের চাহিদার বিপরীতে কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (কেজিডিসিএল) সরবরাহ করছে মাত্র ২৬০ থেকে ২৯০ মিলিয়ন ঘনফুট। সম্প্রতি তা নেমে এসেছে ২৩০ থেকে ২৪০ মিলিয়ন ঘনফুটে। ফলে চট্টগ্রামের শিল্প ও বাণিজ্যিক গ্রাহকসহ মোট ৪ লাখ ৬৯ হাজার গ্রাহকের গ্যাস সংকট চরমে পৌছেছে। গত পাঁচ বছর ধরে চট্টগ্রামে গ্যাস সংকট বাড়লেও স্থায়ী কোনো পদক্ষেপ নেয়নি সরকার। সংকট নিরসনে সম্ভাব্য যে দুটি পরিকল্পনা রয়েছে তা বাস্তবায়ন করতে সময় লাগবে অন্তত ৫ থেকে ৮ বছর । যদিও এখন পর্যন্ত এসব পরিকল্পনায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না। তাই গ্যাস সংকট সমাধান কবে হবে সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষও কিছু বলতে পারছে না।

ছবি সংগৃহীত
ছবি সংগৃহীত

কেজিডিসিএল সূত্র জানায়, ২০১০ সাল পর্যন্ত চট্টগ্রামে গ্যাসের কোনো সংকট ছিল না। ২০০২ সাল থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত চট্টগ্রামের সাঙ্গু গ্যাসক্ষেত্র থেকে চাহিদার সিংহভাগ অর্থাৎ দৈনিক ১৮০ থেকে ২২০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উত্তোলন করা হতো। ২০১০ সাল থেকে গ্যাস উত্তোলন কমতে থাকায় ২০১৩ সালে স্থায়ীভাবে গ্যাস উত্তোলন স্থগিত করে কিজিডিসিএল। যদিও ২০১০ সালের দিকে আবার  নতুন সম্ভাবনা জাগিয়েছিলো খাগড়াছড়ির সেমুতাং । সেখান থেকে দৈনিক ২০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উত্তোলনের সম্ভাবতার কথা জানা যায়। কিন্তু প্রথম থেকেই সেখানে দৈনিক ১৩ মিলিয়ন ঘনফুটের বেশি গ্যাস উত্তোলন করা যায়নি; যা এখন কমে মাত্র ৫ মিলিয়ন ঘনফুটে চলে এসেছে; যা প্রয়োজনের তুলনায় অতি সামান্য।

অন্যদিকে, জাতীয় গ্রিডের সাথে ১৯৮০ সালের দিকে চট্টগ্রামের জন্য লাইন স্থাপন করা হয় তার সক্ষমতা  দৈনিক ২২০ মিলিয়ন ঘনফুট ।  দৈনিক ২২০ মিলিয়ন ঘনফুটের পাইপ লাইন দিয়ে ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুটের গ্যাসের চাহিদা পূরণ সম্ভব নয়। তাই ২০১৩ সালে সাঙ্গু থেকে পুরোপুরি গ্যাস উত্তোলন বন্ধ হয়ে আসায় আশুগঞ্জে কমপ্রেশার বসিয়ে আরো চট্টগ্রামের জন্য আরও ৪০ থেকে ৫০ মিলিয়ন ঘনফুট বেশি সরবরাহ করে আসছে কেজিডিসিএল।

কেজিডিসিএল সূত্রে জানা যায়, চট্টগ্রামে কেজিডিসিএল এর গ্রাহক সংখ্যা ৪ লাখ ৬৮ হাজার ৯১৮টি (গত বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত)। তার মধ্যে শিল্প ও বাণিজ্যিক গ্রাহক হচ্ছে তিন হাজার ৬৮৫টি। যার মোট চাহিদা দৈনিক প্রায় ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট । গত পাঁচ বছরে  প্রতিষ্ঠানটির সক্ষমতা ২২৭ মিলিয়ন ঘনফুট কমলেও নতুন গ্রহককে গ্যাস সংযোগ দিয়েছে ১ লাখ ৩ হাজার ৮৮৯টি। সেই সঙ্গে সম্প্রতি গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ায় এ সংকট আরও তীব্র হয়েছে ।

যে দু’টি পরিকল্পনার কথা ভাবছে সরকার:

কেজিডিসিএল এবং পেট্রোবাংলা সূত্রে জানায়, চট্টগ্রামের গ্যাস সংকট নিরসনে জাতীয় গ্রিডের সাথে নতুন লাইন সংযোজন  অথবা  বঙ্গোপসাগরে এলএনজি (তরলাকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) টার্মিনাল নির্মাণের কথা ভাবছে সরকার। নতুন লাইন সংযোজন করার পরিকল্পনাটি বাস্তবায়নে অন্তত ৮ বছর সময় লাগবে। ব্যয় হবে প্রচুর। তাছাড়া জাতীয় গ্রিডেও যে গ্যাস সংকট রয়েছে তাও বেড়ে যাবে। ফলে তা বাস্তবায়নে আগ্রহ নেই সরকারের।

অপরদিকে, বঙ্গোপসাগরের মহেশখালীতে এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ করাকে গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। এতে মিয়ানমার থেকে গ্যাস আমদানি অথবা বঙ্গোপসাগরের ভবিষ্যতে গ্যাস উত্তোলন হলে তাও যোগ করা যাবে এলএনজি টার্মিনালে। যার বাস্তবায়ন মেয়াদ ধরা হয়েছে ৫ বছর। তবে এ পরিকল্পনাটি সরকারের পরিকল্পনা পর্ষদের অনুমতি পেলেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি নেই। যেদিন থেকে এলএনজি টার্মিনাল বাস্তবায়নের কাজ শুরু হবে তার পর থেকে অন্তত ৫ বছর অপেক্ষা করতে হবে। সেই হিসাবে ২০২১ সালের আগে এ সংকট নিরসনের সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।

কেজিডিসিএলের জেনারেল ম্যানেজার (অ্যাডমিন ) খন্দকার মতিউর রহমান অর্থসূচককে বলেন, চট্টগ্রামের গ্যাসের চাহিদার অর্ধেকের বেশি উত্তোলন করা হতো সাঙ্গু গ্যাসক্ষেত্র থেকে। সেটি ২০১০ সালে বন্ধ হয়ে গেলে বিকল্প কোনো উৎস না পাওয়ায় এ সংকট সৃষ্টি হয়। গ্যাস সংকট নিরসনে জাতীয় গ্রিডের সাথে নতুন লাইন সংযোজন  অথবা  এলএনজি (তরলাকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) আমদানি  ছাড়া কোন বিকল্প নেই। এ দুটি প্রকল্পই বাস্তবায়ন বেশ সময় ও অর্থ সাপেক্ষ বিষয় বলে জানান তিনি।

নতুন লাইন স্থাপন ও এলএনজি আমদানি  প্রসঙ্গে মতিউর রহমান বলেন, ‘‘জাতীয় গ্রিডের সাথে ১৯৮০ সালের দিকে চট্টগ্রামের জন্য দৈনিক ২২০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করতে সক্ষম একটি লাইন স্থাপন করা হয়। এ লাইনটি স্থাপন করতে সময় লেগেছে চার বছর। এখন চাহিদা অনুসারে দৈনিক ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহে সক্ষম এমন লাইন নতুন করে স্থাপন অনেক অর্থ ব্যয় হবে। তাছাড়া পুরাতন লাইন তুলে নতুন লাইন স্থাপণ করতেও সময় লাগবে নূন্যতম ৮ বছর।  ইতোপূর্বে নতুন লাইন স্থাপণের বিষয়ে সরকারি উচ্চ মহলে কয়েকবার  আলোচনা হলেও  তা বাস্তবায়নে সময় ও অর্থ বিবেচনায় আটকে আছে।

তাছাড়া, নতুন লাইন স্থাপনের বিকল্প হিসাবে সম্প্রতি বিদেশ থেকে এলএনজি গ্যাস আমদানির বিষয়ে গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার । এলএনজি আমদানি করার পূর্বে  বঙ্গোপসাগরে এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ করতে হবে। এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ প্রকল্পটির বাস্তবায়ন মেয়াদ ধরা হয়েছে ২০২১ সাল। যদি তা ২০১৬ সালের মধ্যে নির্মাণ কার্যক্রম শুরু করতে না পারে এবং প্রকল্পের কাজ শুরু করতে দেরি হয় তবে তা বাস্তবায়নও দেরি হবে।

তিনি আরো জানান, সম্প্রতি গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ায় শিকলবাহা বিদ্যুৎ কেন্দ্র বন্ধ রয়েছে। রাউজানের একটি ইউনিট বন্ধ  রয়েছে এবং অন্যটি কোনো রকমে চলছে। গ্যাস সংকটের বিষয়ে লিখিতভাবে পেট্রোবাংলাকে জানানো হয়েছে বলে জানান তিনি।

চিটাগং চেম্বারের সভাপতি এম মাহবুব আলম বলেন, চট্টগ্রামে শিল্প কারখানার চাহিদা দৈনিক ৩৬৮ মিলিয়ন ঘনফুট। অথচ আমরা চাহিদার অর্ধেকও পাচ্ছি না। মাঝে মাঝে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকলে উৎপাদনও বন্ধ থাকলে। ফলে ব্যবসায়ীরা ব্যাংক ঋণের সুদ, কর্মচারীদের বেতন ও সময়মতো পণ্য জাহাজীকরণ করতে ব্যর্থ হচ্ছে। এমন চলতে থাকলে বিশ্বের প্রতিযোগিতামূলক বাজারে আমরা টিকতে পারবো না। গ্যাস সংকট সমাধানে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়সহ সরকারের বিভিন্ন সংস্থার কাছে চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে বহুবার লিখিত অনুরোধ জানিয়েছেন বলেও জানান তিনি।

এদিকে, সাঙ্গু থেকে গ্যাস নিঃশেষ হয়ে যাওয়া, সেমুতাং থেকে গ্যাস কমতে থাকায় ক্রমেই চট্টগ্রামের গ্যাসের চাহিদা এককভাবে জাতীয় গ্রিডের উপর নির্ভলশীল হয়ে পড়ছে। যা চট্টগ্রামের গ্যাসের চাহিদা পুরোপুরি যোগানে সামর্থ নেই। তাই দ্রুত বিকল্প ব্যবস্থা না নিলে বাণিজিক নগরী খ্যাত চট্টগ্রাম ব্যবসায়ে স্থবিরতা দেখা দিবে এমন আশংকা করছেন সংশ্লিষ্টরা।