স্ট্যান্ডার্ডে আগুন: পোশাকখাতে এই নাশকতার শেষ কোথায়

0
45
: ফাইল ছবি
পুড়ে যাওয়া ট্যান্ডার্ড কারখানা: ফাইল ছবি

standard_fire“কি অপরাধে আমার এই কারখানাকে পুড়িয়ে দেওয়া হলো। আমি সম্পূর্ণরুপে নি:স্ব হয়ে গেছি। আমার আর কিছু নেই। আগুনে পুড়ে সব শেষ হয়েছে আমার। কার কাছে আমি এর নালিশ করবো। কথাগুলো বলার পরে আর কিছু বলতে পারেনি”। শুধু চোখ দিয়ে পানি পড়ল গাজীপুরের কোনাবাড়িতে আগুনে পুড়ে যাওয়া স্ট্যান্ডার্ড গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের।

৮০ দশকে অপরিকল্পিতভাবে পোশাক কারখানা আজ বড় শিল্প প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। শুরুর দিকে নামমাত্র পোশাক রপ্তানি হলেও এখন বিশ্ববাজারে বড় স্থান দখল করে নিয়েছে তারা। ১২ হাজার ডলারের হাতেখড়ি যেই শিল্পের তা এখন ২০ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি করে।

তবে দূর্ভাগ্য যেন পিছু ছাড়ছে না পোশাক শিল্পের। দেশের প্রধান রপ্তানিমুখী এখাত একটার পর একটা বিপদ লেগেই আছে। ২০০৫ সালে স্পেক্টট্রাম ভবন ধসে ৬৪ জনের প্রাণহানি, ২০১২ সালে তাজরিন ফ্যাশনে আগুন লেগে ১১২ জনের মর্মান্তিক মৃত্যু, চলতি বছরের এপ্রিলে সাভারের রানা প্লাজা ধসে ১ হাজার ১৩৪ জনের মৃত্যুর ধকল কাটিয়ে না উঠতেই আবার ধ্বংসস্তূপে পরিণত হলো স্ট্যান্ডার্ড গ্রুপের পোশাক কারখানা।

পুড়িয়ে ফেলা হলো গ্রুপের একটি ৯ ও ৬ তলা ভবন। যার আয়তন প্রায় সাড়ে নয় লাখ বর্গফুট। স্থাপনার মেশিনপত্র মূলধনী যন্ত্রপাতি, তৈরি পোশাক, আমদানি করা কাঁচামাল, ফেব্রিক্স, ২২টি কাভার্ডভ্যান, মাইক্রোবাসসহ অন্যান্য সামগ্রী।

আগুনের ঘটনা:

৩০ নভেম্বর স্ট্যান্ডার্ড গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন পোশাক ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন (বিজিএমইএ)র মিলনায়তনে কান্না জড়িত কণ্ঠে সংবাদ সম্মেলন করেন। সেখানে তিনি বলেন, ২৮ নভেম্বর রাত ৮টার কারখানায় কাজ করা ১৯ হাজার শ্রমিকদেরকে ছুটি প্রদান করা হয়। শুধুমাত্র ওয়াশিং ইউনিটে ২০০ থেকে ২৫০ শ্রমিক কর্মরত ছিলো। রাত সাড়ে ১০টার দিকে বহিরাগত ৭০ থেকে ৮০ জন সন্ত্রাসী যুবক কারখানার প্রধান ফটকে আঘাত করে। সে সময় তারা জোর করে কারখানার মধ্যে প্রবেশ করতে চায়। কারখানার অভ্যন্তরে নিরাপত্তার থাকা ২৫ থেকে ৩০ জন শিল্পাঞ্চল থানার পুলিশ প্রধান ফটকে হামলাকারীদের ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা করে। এক পর্যায়ে পুলিশ লাঠিচার্জ ও রাবাট বুলেট ছুড়ে তখনকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।

তারপর কে বা কারা পোশাক কারখানাটির পাশে অবস্থিত মসজিদের মাইক দিয়ে গুজব ছড়ালো যে পুলিশের গুলিতে ২ জন শ্রমিক নিহত হয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে সবাইকে অনুরোধ করা হলো যে যার যা কিছু আছে তা নিয়ে রাস্থায় নামতে। একপর্যায়ে কারখানার অভ্যন্তরে বিপুল সংখ্যক মানুষ প্রবেশ করে।

স্ট্যান্ডার্ড গ্রুপের প্রধান ভবনের ৯ তলা থেকে প্রতিটি তলায় সুপরিকল্পিতভাবে আগুন লাগিয়ে দেয়। যা করে কারখানার ভিতরে প্রতিটা তলাতে আগুন পৌঁছাতে পারে। এরপর দমকল বাহিনীর  প্রায় ১৭ ঘন্টা চেষ্টার পর আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। এতো ঘণ্টা আগুনে পুড়ে কারখানা ভবনটি যেন কঙ্কালে পরিণত হয়েছে।

প্রতিটি ফ্লোরে সকল প্রকার মেশিনপত্র, বিপুল পরিমাণ কাপড়ের স্তুপ, কম্পিউটার, কাগজপত্রসহ মালামাল পুড়ে ছাই হয়ে যায়। ভস্মীভূত এসব জিনিসপত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে বিভিন্ন স্থানে। আগুনে ভবনের সব ফ্লোরের ছাদে ফাঁটল দেখা দেওয়ায় ভবনটি মারাত্মক ঝূঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে।

দোষীদের বিচার দাবি:

সংবাদ সম্মেলন ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন কান্না জড়িত কণ্ঠে দোষীদের বিচারের দাবি করেন। রাতের আঁধারে কে বা কারা কারখানার মূল ফটকে আঘাত হানলো, Garments_Workerকারা মসজিদের মাইকে ঘোষণা দিল, কারা পরিকল্পিতভাবে প্রতিটা ফ্লোরে আগুন দিলো। রাস্তায় গাছের গুঁড়ি ফেলে ফায়ার সার্ভিস, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে প্রবেশে কারা বাধা দিলো। সরকার আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী ও দেশের সাধারণ মানুষের কাছে এর বিচার দাবি করেন তিনি।

তিনি বলেন, এই আগুনের কারণে ব্যাংকের ফোর্স লোন, ব্যাংক লোন এল/সি, ব্যাক টু ব্যাক এল/সি এর দায় দেনা পরিশোধ করা কোনোভাবেই আমার পক্ষে সম্ভব নয়। আজ কে কারখানার এল/সির বিপরীতে সংগৃহীত ৪০০ কোটি টাকার দায়িত্ব নিবে’।

তিনি বলেন, আগুনে আমার দুইটি ভবনে প্রায় সাড়ে আট লাখ বর্গফুট স্থাপনা, স্থাপনার মেশিনপত্র, মূলধনি যন্ত্রপাতি, তৈরি পোশাক, আমদানি করা কাঁচামাল, ফেব্রিক্স, ২২টি কাভার্ডভ্যান, মাইক্রোবাসসহ অন্যান্য সামগ্রী মিলে আনুমানিক মূল্য প্রায় ১২০০ কোটি টাকা।

জানা যায়, অন্যান্য পোশাক শিল্পের মতোই বিশ্ববাজারে দাপটের সাথে প্রতিনিধিত্ব করে আসছিলো স্ট্যান্ডার্ড গ্রুপ। মার্কিন ক্রেতা প্রতিষ্ঠান গ্যাপ, সিয়ার্স, টমি হিলফিগার, জিমবোরি কর্পোরেশন, আমেরিকান ঈগল আউটফিটার্স, অ্যাবার ক্রোমবি অ্যান্ড ফিচ, কোহলস কর্পরেশন, স্প্যানিশ ক্রেতা প্রতিষ্ঠান জারার মতো খ্যাতনামা কোম্পানিগুলোর সঙ্গে ব্যবসায়িক লেনদেন করে দেশের অর্থনীতি সচল করে ছিল স্ট্যান্ডার্ড গ্রুপ।

তবে ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, জাপানসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশেগুলোতে পোশাকসহ অ্যান্যান্য পণ্য রপ্তানি করা প্রতিষ্ঠানটির মতোই আবারও বড় ধরণের ধাক্কা খেল দেশের পোশাক খাত।

বিজিএমইএর পদক্ষেপ:

ঘটনার একদিন পর স্ট্যান্ডার্ড গ্রুপের আগুনে পোড়া কারখানা নিয়ে জরুরী সংবাদ সম্মেলন করে করে বিজিএমইএ। সম্মেলনে সংগঠনটির সভাপতি আতিকুল ইসলাম বলেন, ‘শ্রমিক হত্যার ধোঁয়া তুলে পোশাক কারখানার রোল মডেল, সর্বাধনিক কম্প্লায়েন্স কারখানাকে জ্বালিয়ে দেওয়া হলো।

কারখানাটি বছরে প্রায় ৩০০ মিলিয়ন ডলার পণ্য রপ্তানি করতো। এখন এটি পথে বসে গেল। আমরা এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানাই। তাছাড়া জড়িতদের অবিলম্বে আইনের আওতায় এনে তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থাগ্রহণের জন্য সরকারের প্রতি জোর দাবি জানাচ্ছি। যা পরবর্তীতে আর এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটে’।

তিনি বলেন, শিল্পকে টিকিয়ে রাখার জন্য যখন আমরা নিরন্তর চেষ্টা করে যাচ্ছি, তখন বিভিন্ন ইস্যু তুলে, মিথ্যা গুজব সৃষ্টি করে বারবার এই খাতকে অস্থির করে তোলা হচ্ছে। বিশেষ করে শান্ত শ্রমিক গোষ্ঠীকে উস্কানি দিয়ে অশান্ত করা হচ্ছে। শিল্পকে ক্রমান্বয়ে অগ্নিগর্ভ অবস্থার দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। যার জলন্ত প্রমাণ স্ট্যান্ডার্ড কারখানায় পরিকল্পিতভাবে আগুন দেওয়ার ঘটনা।

কারখানাটি পুনরায় চালু করার জন্য সরকারসহ সংশ্লিষ্ট ব্যাংক ও বীমা কোম্পানিগুলোকে সহায়তা করার জন্য এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।

৩ ডিসেম্বর সোমবার সন্ধ্যায় পোশাক কারখানার সাম্প্রতিক পরিস্থিতি, নিরাপত্তা ও গাজীপুরের স্ট্যান্ডার্ড সোয়েটার কারখানার আগুনে কোম্পানিটির ক্ষতিপূরণ, দেশের চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতা থেকে পোশাক শিল্পকে রক্ষার দাবী নিয়ে প্রধানমন্ত্রীও বিরোধী দলের নেতার কাছে স্মারকলিপি জমা দেন। এসময় প্রধানমন্ত্রী সঙ্গে গণভবনে সাক্ষাৎ করেন ব্যবসায়ী নেতারা।

এসময় হরতাল, অবরোধসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচিতে পোশাক কারখানার নিরাপত্তা এবং কারখানায় সহিংস ঘটনায় দায়ী ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন তিনি। এছাড়া তিনি কারখানাটি পরিদর্শন করবেন বলে মালিকদেরকে জানান। এরই প্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রী গাজিপুর কোনাবাড়ি স্ট্যান্ডার্ড গ্রুপের কারখানা পরিদর্শন করেন।

Standard_primeministerjpgপরিদর্শনে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, পোশাক কারখানা ও বাসে আগুন দিয়ে যারা মানুষ মারছে তাদের ছাড় দেওয়া হবে না। তাছাড়া দোষীদের ধরতে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীকে নির্দেশ দিয়েছেন বলে জানান তিনি। আগুন লাগার পরে সংশ্লিষ্টদের এভাবে চতুরমুখী তৎপরতায় সন্দেহভাজন ৪৫ গ্রেপ্তার করা হয়।

আর বাংলাদেশ ব্যাংক স্ট্যান্ডার্ড কারখানাকে সহজ শর্তে ৪০০ কোটি টাকা ঋণ প্রদানের উদ্যোগ নেয়। যা শুধুমাত্র স্ট্যান্ডার্ড গ্রুপের ক্ষতিগ্রস্ত কোনাবাড়ির কারখানাটির জন্য নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত প্রয়োজ্য হবে। অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের জন্য এগুলো প্রযোজ্য  নয় বলে জানানো হয়।

কারখানাটি কাজ করতো ১৯ হাজার শ্রমিক। তবে সংশ্লিষ্টদের মিলে এর সংখ্যা প্রায় ২৫ হাজার ছাড়িয়ে যাবে। কারখানাটি অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। তবে যথাসময়েই বেতন ভাতা প্রদান করা হবে বলেও জানা গেছে।

পোশাক খাতের এমন ঘটনাকে খতিয়ে দেখে নাশকতা হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে বারবার। তবে স্ট্যান্ডার্ড গুরুপের এই নাশকতার বিচার কি হবে? নাকি তাজরিন ও রানা প্লাজার বিচারের পথে হাটবে। এমন প্রশ্ন এখন সবার।