৭ম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ

মাইদুল ইসলাম

0
125
মঙ্গলবার একনেক সভার পর সপ্তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় পরামর্শ প্রধানমন্ত্রী। ছবি সংগৃহীত।

সপ্তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় কৃষি খাতকে গুরুত্ব দিতে পরিকল্পনা কমিশনকে পরামর্শ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেছেন, ফুড প্রসিসেং, কৃষি যান্ত্রিকরণ, কৃষিতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প বিকাশে করণীয় বিষয়টি যেন সুস্পষ্টভাবে পরিকল্পনায় থাকে, তা নিশ্চিত করতে হবে।

মঙ্গলবার একনেক সভার পর সপ্তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় পরামর্শ প্রধানমন্ত্রী। ছবি সংগৃহীত।
মঙ্গলবার একনেক সভার পর সপ্তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় পরামর্শ প্রধানমন্ত্রী। ছবি সংগৃহীত।

মঙ্গলবার রাজধানীর শেরে বাংলা নগরে এনইসি সম্মেলন কক্ষে সপ্তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার খসড়া উপস্থাপনকালে প্রধানমন্ত্রী এমন পরামর্শ দেন। সপ্তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার দায়িত্বপ্রাপ্ত পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য (সিনিয়র সচিব) মো. ড. শামসুল আলম প্রধানমন্ত্রীর কাছে এই খসড়া উপস্থাপন করেন।

বৈঠকে অংশ নেওয়া ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, কৃষি খাতকে অধিক গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, খাদ্য নিরাপত্তা বাড়াতে আমাদের কৃষিতে নজর দিতে হবে। খাদ্য ঘাটতি রাখা যাবে না।

স্যোশাল স্যাপ্টিনেট নিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘প্রতিবন্ধী ও বয়স্ক দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সংখ্যা কত তা আমি জানতে চাই। এটাকে ধরে নিয়ে কিছু কাজ করতে হবে। প্রতিবন্ধী ও বয়স্ক দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সংখ্যা যদি না জানি তাহলে অন্য সবার অবস্থার উন্নতি হবে, তাদের কোনো উন্নতি হবে না।

বৈঠকে পরিকল্পনা মন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেন, ‘মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৩৪ ভাগ হতে হবে ইনভেস্টমেন্ট। এজন্য প্রাইভেট সেক্টর যাতে এগিয়ে আসে সেই অনুযায়ী কর্ম পরিকল্পনা নিতে হবে। সেই সঙ্গে বৃহৎ অবকাঠামো খাতে সরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। বড় বড় রাস্তা-ঘাট-সেতু বেসরকারি খাত করবে না। এসব খাতে সরকারি বিনিয়োগ বাড়ালে বেসরকারি খাত এগিয়ে যাবে।’

কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী বলেন, ‘মাদ্রাসা শিক্ষায় যেন টেকনিক্যাল শিক্ষা ডুকিয়ে দেওয়া হয় তার ব্যবস্থা করতে হবে। প্রচলিত মাদ্রাসা শিক্ষায় টেকনিক্যাল শিক্ষাসহ আধুনিক বিষয়গুলো না থাকায় এসব শিক্ষার্থীরা ভালো কিছু করতে পারছে না।’

তিনি বলেন, ‘রেমিট্যান্স ঠিক থাকবে কি না- তার ওপর নজর দিতে হবে। কারণ এখন মধ্যপ্রাচ্যে বিশৃংখলা বিরাজ করছে।’

বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ বলেন, ‘সব কিছু নির্ভর করে জালানি সক্ষমতার উপর। কাজেই এ বিষয়টিকে সব সময় দেখতে হবে।’

এসময় আরও উপস্থিত ছিলেন অর্থমন্ত্রী আবুল  মাল আবদুল মুহিত, স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ারখন্দকার মোশাররফ হোসেন  নৌ পরিবহন মন্ত্রী শাজাহান খান, শিক্ষা মন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ প্রমুখ।

সপ্তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার দায়িত্বপ্রাপ্ত পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য (সিনিয়র সচিব) মো. ড. শামসুল আলম অর্থসূচককে বলেন, আজ আমরা সপ্তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার খসড়া উপস্থাপন করছি। প্রধানমন্ত্রী খসড় নিয়ে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন।  প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, আমরা নির্বাচনী ইশতেহারের যে বিষয়গুলো গুরুত্ব দিয়েছি এই পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার খসড়া তা রয়েছে। এজন্য পরিকল্পনা কমিশন বিশেষ করে ড. শামসুল আলমকে ধন্যবাদ।

তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী সপ্তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার খসড়ায় সন্তুষ্টি প্রকাশ করে তা অনুমোদন জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (এনইসি) সভায় উত্থাপন করতে বলেছেন। আমরা আশা করছি ২০ অক্টোবরের দিকে এনইসি সভায় উত্থাপন করা হবে বলে জানান ড. শামসুল আলম।

এর আগে ১ কোটি ৩২ লাখ কর্মসংস্থানের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে সপ্তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার (২০১৬-২০) খসড়া চূড়ান্ত করেছে পরিকল্পনা কমিশন।

পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, আগামী ২০২১ সালের মধ্যে মধ্যম আয়ে পৌঁছানোর জন্য অর্থনৈতিক ও সামাজিক খাতে কিছু মানদণ্ড স্থির করা হয়েছে। সেই মোতাবেক তৈরি করা হয়েছে সপ্তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা। এরই মধ্যে দেশের অর্থনীতির সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সম্পৃক্ত সব পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে খসড়া তৈরি হয়েছে।

জানা গেছে, মধ্যম আয়ের দেশে পৌঁছানোর জন্য মধ্যমেয়াদী ও দীর্ঘমেয়াদী দুই ধরনের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন পরিস্থিতি বিশেষ করে এলডিসি থেকে উত্তরণের জন্য বিভিন্ন অর্থনৈতিক ও সামাজিক নির্দেশকের যে অগ্রগতি দরকার, তাই করা হয়েছে।

সূত্র জানায়, আগামী ৫ বছরে (২০১৬-২০) নতুন ১ কোটি ৩২ লাখ কর্মসংস্থানের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হচ্ছে সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায়। দেশি ও বিদেশি মিলে এ কর্মসংস্থান হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এ ছাড়া আগামী ৫ বছরে দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ধরা হচ্ছে ৮ ভাগ।

অর্থবছরভিত্তিক ২০১৬ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য হচ্ছে ৬ দশমিক ৬ ভাগ, ২০১৭ অর্থবছরে ৬ দশমিক ৮ ভাগ, ২০১৮ অর্থবছরে ৭ দশমিক ২, ২০১৯ অর্থবছরে ৭ দশমিক ৬ ভাগ এবং পরিকল্পনার শেষ অর্থবছরে (২০২০ সালে) প্রবৃদ্ধি দাঁড়াবে ৮ ভাগে। এছাড়া ৫ বছরে দেশের মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হচ্ছে ৬ দশমিক ২ ভাগ। অর্থবছরভিত্তিক এ লক্ষ্য হচ্ছে ২০১৬ অর্থবছরে ৬ ভাগ, ২০১৭ অর্থবছরে ৬ ভাগ, ২০১৮ অর্থবছরে ৬ ভাগ, ২০১৯ অর্থবছরে ৬ দশমিক ২ এবং ২০২০ অর্থবছরে ৬ দশমিক ২ ভাগ।

খসড়া থেকে জানা গেছে, পরিকল্পনাতে অন্যতম প্রধান লক্ষ্যের মধ্যে রয়েছে দারিদ্র্য প্রায় ১০ শতাংশ কমিয়ে আনা; প্রাথমিক শিক্ষার হার শতভাগ এবং দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত শিক্ষার হার ৬০ শতাংশে উন্নীত করা; ৫ বছরের নিচে শিশু মৃত্যুর হার প্রতি হাজারে ৫০ জনে নামিয়ে আনা; জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ২ শতাংশে নামিয়ে আনা; বিদ্যুৎ সরবরাহ ২৪ হাজার মেগাওয়াটে উন্নীত করা; গবেষণা ও উন্নয়নে সরকারি ব্যয় জিডিপির ১ শতাংশে উন্নীত করা এবং মাধ্যমিক শিক্ষায় তথ্য-প্রযুক্তি (আইসিটি) বাধ্যতামূলক করা।

এ বিষয়ে ড. মো. শামসুল আলম বলেন, সপ্তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় ৬টি বিষয়কে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। কারিগরি ও প্রযুক্তি জ্ঞানসম্পন্ন মানবসম্পদ গঠন, বিদ্যুৎ উন্নয়ন, জ্বালানি ও যোগাযোগ খাতে অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা দূরীকরণ, কৃষিভিত্তিক শিল্পসহ ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতের উন্নয়ন কৌশল নির্ধারণ, আইসিটি-স্বাস্থ্য-শিক্ষা সংক্রান্ত সেবা রফতানিতে সুনির্দিষ্ট নীতিকৌশল প্রণয়ন, সরকারি-বেসরকারি বিনিয়োগে গতিশীলতা আনয়ন ও রফতানির গতিশীলতা বৃদ্ধিতে পণ্যের বৈচিত্রায়নে গুরুত্ব দেওয়া হবে নতুন পরিকল্পনায়।

এমআই/