বেসামাল ছাত্রলীগ, বিব্রত আওয়ামী লীগের দায় এড়ানোর চেষ্টা

0
88

ru-pi02_1ছাত্রলীগের বেপরোয়া কর্মকাণ্ডে আবারো বিপাকে পড়েছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকার। সংগঠনটির একের পর এক অস্ত্রবাজি, চাঁদাবাজি আর সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে বিব্রত আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা। তবে দলটির কেউকেউ আবার ছাত্রলীগের সাথে দলের সম্পর্ককে নানা ভাবে উল্লেখ করে দায় এড়ানোর চেষ্টাও করছেন।

সম্প্রতি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালেয় সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর ছাত্রলীগের হামলার নিন্দায় মুখর এখন সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ওই ঘটনার প্রতিবাদে চলছে নানা কর্মসূচি। রাজধানীতে ওই হামলার প্রতিবাদে গতকাল মশাল মিছিল করেছে গণজাগরণ মঞ্চের অন্যতম সহযোগী ভার্চুয়াল সংগঠন ব্লগার অনলাইন এক্টিভিস্ট ফোরাম। ছাত্রলীগকে জড়িয়ে সামাজিক যোগাযোগের সাইটগুলোতেও চলছে আওয়ামী লীগের সমালোচনা। রাবিতে ছাত্রলীগের অস্ত্রবাজির ওই ঘটনায় মামলা না হওয়ায় সরকারের সমালোচনায় যোগ হয়েছে নতুন মাত্রা।

ফেসবুকে অনেকে ছাত্রলীগকে নাৎসি বাহিনীর সাথেও তুলনাও করেছেন। আর তাদের  প্রশ্রয় দেওয়া জন্য সরকারেরও করা হয়েছে কড়া সমালোচনা।

জালাল সুমন নামের এক ব্যক্তি তার ফেসবুকে লিখেছেন, ‘নাৎসি বাহিনীকে হার মানিয়েছে বাংলাদেশের ছাত্রলীগ ও পুলিশলীগ। তাদেরকে আফগানিস্তান থেকে তালেবানী প্রশিক্ষণ দেওয়া খুবই প্রয়োজন। পৃথিবীর ইতিহাসে কোন ছাত্র সংগঠন ছাত্রদের ওপর এভাবে নৃসংস হামলা করতে পারে তা আমার জানা নেই ।’

বিগত পাঁচ বছর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকাকালে সংগঠনটির বেপরোয়া কর্মকাণ্ডে একাধিকবার নিজের বিরক্তি প্রকাশ করেছেন আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনাও। তবে ছাত্র সংগঠনটির বিরুদ্ধে ওঠা বেশির ভাগ অভিযোগেরই সঠিক তদন্ত ও বিচার না হওয়ার কারণে সংগঠনটি আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। চলতি বছর আওয়ামী লীগ নতুন করে সরকার গঠনের পর সংগঠনটির অপকর্মে নতুন গতি এসেছে।

আর সংগঠনটি তারই প্রকাশ দেখালো রাজশাহী বিশ্ববিদ্যিালয়ে। সেখানে বর্ধিত বেতন ফি ও সান্ধ্যকালীন কোর্স বন্ধের দাবিতে আন্দোলনে নামা সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর চালিয়েছে পাশবিক হামলা। আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে নির্বিচারে চালিয়েছে গুলি। অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি। তবে বরাবরের মতোই  হামলার দায় ঠেকাতে উদোর পিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে চাপিয়েছেন সরকারের একাধিক মন্ত্রী।

আর গরু মেরে জুতা দান করা হয়েছে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির পক্ষ থেকে। হামলার ঘটনায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক নাসিম আহম্মেদ সেতু ও সাংগঠনিক সম্পাদক শামসুজ্জামান ইমনকে সংগঠন থেকে বহিষ্কার করেছে ছাত্রলীগ।

এর আগে ২০১০ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্যের প্রত্যক্ষ ইন্ধনে ছাত্রলীগের দুপক্ষের সংঘর্ষে ছাত্রলীগের সাংগঠনিক নেত্রীর পদ থেকে সরে দাঁড়ান শেখ হাসিনা।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনায়ও আওয়ামী লীগের বেশ কয়েকজন মন্ত্রী প্রকাশ্যেই ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছেন শিক্ষামন্ত্রী। রাজশাহীর ওই ঘটনায় তিনি যে বিব্রত তাও জানান তিনি সংবাদ মাধ্যমকে।

তবে আজ মঙ্গলবার পর্যন্ত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনায় পাঁচটি মামলা হলেও ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে মামলা হয়নি একটিও। উল্টো সংগঠনটি হামলার অভিযোগে মামলা করেছে ইসলামী ছাত্র শিবিরের বিরুদ্ধে।

এভাবে বেশির ভাগ ঘটনায় কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার মৌখিক আশ্বাস দেওয়া হলেও বাস্তবায়ন হয়নি একটিও। মূল দলের নেতারা বহিষ্কার কিংবা সতর্ক করে দিয়ে দায় সারছেন। যথারীতি দোষ এড়াতে আন্দোলনে শিবির ও জঙ্গিগোষ্ঠীকে ঢুকিয়ে দিয়েছেন আওয়ামী লীগের ব্যাখ্যাদাতা নেতারা।

বিশ্বজিৎ হত্যার সাথে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগ সরাসরি জড়িত থাকলেও তাদেরকে অনুপ্রবেশকারী বলে ছাত্রলীগের কলঙ্ক মোচনের চেষ্টা করেছেন আওয়ামী লীগের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক হাছান মাহমুদ।

সোমবার দলীয় সভানেত্রীর রাজনৈতিক কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, “রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে জামায়াত-শিবির জঙ্গিগোষ্ঠীর অনুপ্রবেশ ঘটায় পুলিশ ব্যবস্থা গ্রহন করেছে”।
একই দিন সংবাদ কর্মীদের সাথে আলাপচারিতায় শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদও সুর মেলালেন হাসান মাহমুদের সাথে। হামলার সাথে জড়িতরা এবং আন্দোলনের মধ্যেও জামায়াত-শিবিরের ক্যাডাররা অবস্থান নিয়েছিল বলে দাবি করেন তিনি।

তবে দোষীদের বিচারের কথা বলে আবারও আশার ফুলঝুড়ি ছড়িয়েছেন ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি ও সরকারের যোগাযোগ মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের ।

সোমবার সিলেটে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে তিনি বলেন, “সরকার সন্ত্রাসী, জঙ্গিবাদ ও নাশকতার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। সন্ত্রাসীরা যে দলেরই হোক তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে”।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্ধিত ফি বাতিল ও সান্ধ্য কোর্স বন্ধের দাবিতে সাধারণ শিক্ষার্থীদের সমাবেশে গত রোববার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে বিনা উসকানিতে হামলা চালায় বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগ। রাবি ছাত্রলীগের সভাপতি মিজানুর রহমান রানা নিজেই শিক্ষার্থীদের লক্ষ্য করে গুলি ছোঁড়েন। বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে সংগঠনটির আরও কয়েক জন নেতাকর্মীর অস্ত্র হাতে আ্যাকশনের ছবি।

শুধুমাত্র রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় নয় ছাত্রলীগের অপকর্মের উত্তাপ ছড়িয়ে আছে গোটা শিক্ষাঙ্গন জুড়ে। ফেসবুকের স্ট্যাটাস নিয়ে সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘটে গেছে অপ্রীতিকর ঘটনা। হয়েছে মারামারি-ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা। ঘটনার পর ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সংসদের এক জরুরি সভায় লিটন মাহমুদকে সাময়িক বহিষ্কার করা হয়। এছাড়া রনিকে ১৫ দিনের জন্য বহিষ্কার করে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়।

এর রেশ কাটতে না কাটতেই ২৯ জানুয়ারি গভীর রাতে শাহবাগের পিকক বারের বারটেন্ডার ও কর্মচারীদের সাথে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন সলিমুল্লাহ মুসলিম হল শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি।

নির্বাচনের আগে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে ঢাকা কলেজ ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক গ্রুপের সংঘর্ষের মধ্যে পড়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন মেধাবী ছাত্র ফারুক। সংঘর্ষ চলাকালে ছাত্রলীগ আগ্নেয়াস্ত্র এবং দেশীয় ও ধারালো অস্ত্র নিয়ে মহড়া দেয়। সংঘর্ষের পর ঢাকা কলেজ ছাত্রলীগের কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করে কেন্দ্রীয় নির্বাহী সংসদ।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি এইচ এম বদিউজ্জামান সোহাগ বলেন, “রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের মিছিলে শিবির ককটেল হামলা চালিয়েছে। এ জন্য সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে”।