খাতুনগঞ্জে তিন দশকে সাড়ে ১২’শ কোটি টাকার প্রতারণা

0
46

khatungonjদেশের ভোগ্যপণ্যের অন্যতম পাইকারি বাজার  খাতুনগঞ্জে গত তিন দশকে ব্যবসায়িক প্রতারণা ঘটনা ঘটেছে ৬২ টি। যার মাধ্যমে ব্যবসায়ীদের সাড়ে ১২’শ কোটি টাকা লোপাট করেছে প্রতারকরা। বাজারটির ব্যবসায়ীদের হিসেব মতে ১ হাজার ৮০ কোটি টাকার বেশি প্রতারণার ঘটনা ঘটেছে গত পাচঁ বছরে। অথচ এসব ঘটনায় মামলা হলেও  এখন পর্যন্ত বিচার হয়নি একটিরও ।

যুগ যুগ ধরে খাতুনগঞ্জের ব্যবসা-বাণিজ্যে পারষ্পারিক বিশ্বাস আর অগ্রিম তারিখ দেওয়া চেকের মাধ্যমে বাকিতে লেনদেন হওয়ায় এমন প্রতারণার রোধ করা যাচ্ছে না বলে জানান ব্যবসায়ীরা। আর আইনী ঝটিলতার কারণে দ্রুত বিচার না হওয়ায় অপরাধীরা পার পেয়ে যায় । তাই আইন পরিবর্তনসহ মামলার কর্যক্রম দ্রুত শেষ করার অনুরোধ জানান তারা।

ব্যবসায়-বাণিজ্যে সারাবিশ্বে প্রযুক্তির নিত্য নতুন উদ্ভাবন হলেও খাতুনগঞ্জের ব্যবসা টিকে আছে সনাতন পদ্ধতির পারষ্পারিক বিশ্বাসের আর বাকিতে লেনদেন । প্রতিদিন যে পণ্য বেচা-কেনা হয় তার দাম শোধ করা হয় এক সপ্তাহ কিংবা এক মাস পর। কখনওবা লেনদেন হয় অগ্রিম তারিখ দেওয়া চেকের মাধ্যমে। চেকে দেওয়া তারিখে ব্যাংকে গিয়ে বুঝতে পারে যে ব্যাংক হিসাবে তার পর্যাপ্ত টাকা না থাকায় চেক  ডিজঅনার হয়। এভাবে প্রতারণার শিকার  হয়ে বড় বড় ব্যবসায়ীরাও পথে বসার উপক্রম ।

ব্যবসায়ীদের দেওয়া তথ্যমতে, ২০১৩ সালের প্রথমদিকে ঘটেছে সবচেয়ে বড় ব্যবসায়ী প্রতারণার ঘটনাটি। ডিজঅনার চেক আর বাকির মাধমে বাজারের ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ৬৫০ কোটি টাকা নিয়ে গা ডাকা দেয়  ইয়াছির এন্টারপ্রাইজ প্রতিষ্ঠানের স্বত্ত্বাধিকারী মোজাহের হোসেন। একই বছর জগন্নাথ ট্রেডার্সের স্বত্তাধিকর জগন্নাথ চৌধুরী ৩০ কোটি ২০ লাখ ৫০ হাজারেরও বেশী টাকা লোপাট করে ভারতে পালিয়ে যায়।

চলতি বছরের শুরুর দিকেও খাতুনগঞ্জের চার ব্যবসায়ী ইয়াছির এন্টারপ্রাইজের স্বত্তাধিকারী মোজাহের হোসেনের কাছে ৩২ কোটি ৬২ হাজার টাকার চেক প্রতারণার শিকার হন। এছাড়া ২০০৮ সাল থেকে আরো ২২ টি প্রতারণার ঘটনায় ৩১৮ কোটি টাকার লোপাট করে ২২ টি প্রতিষ্ঠানের প্রতারকরা। তার মধ্যে ২০০৮ সালে মৌলবী আলম ট্রেডার্সের ৯০ কোটি, ২০১০ সালে মোহাম্মদ আলী টি. আর ট্রেডিং ৪৭ কোটি এবং ২০১১ সালে একই মালিকানাধীন চৌধুরী ট্রেডার্স ও চৌধুরী এন্টারপ্রাইজ  ব্যবসায়ীদের ১৪৮ কোটি টাকা লোপাটের ঘটনা উল্লেখযোগ্য।

ব্যবসায়ীদের দেওয়া তথ্যমতে, খাতুনগঞ্জ বাজারের যুগ যুগ ধরে ব্যবসায়ীদের পারষ্পারিক বিশ্বাস উপর চলে আসা লেনদেনের সুযোগ কাজে লাগিয়ে প্রথম প্রতারণার  করেন ১৯৮৬ সালে বিভুতি এন্টার প্রাইজ। তখন  ৬ কোটির বেশি টাকা লোপাট করে পালিয়ে যান তিনি। তার পর থেকে প্রায় প্রতিবছরই ঘটতে এমন প্রতারণার ঘটনা। তবে দিন যত যাচ্ছে প্রতারণার সংখ্যা বাড়ার পাশাপাশি বাড়ছে টাকার পরিমানও ।

যেখানে ১৯৮৬ সাল থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত ২০ বছরে ৩৭ টি ব্যবসায়ীক প্রতারণার ঘটনায় ১৭০ কোটি টাকা লোপাট হয়েছে । সেখানে গেল পাঁচ বছরে ২৫ টি প্রতারণার ঘটনায় ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে লোপাট করা হয়েছে ১ হাজার ৮০ কোটি টাকা।

খাতুনগঞ্জ ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি সৈয়দ ছগির আহমদ জানান,  ব্যবসায়ীরা প্রতারিত হওয়ার পর মামলার দীর্ঘ সূত্রিতার কারণে প্রতারক ব্যবসায়ীরা পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ পায়। এখন পর্যন্ত প্রতারণার মামলায় শতাধিক মামলা করা হলেও রায় আসেনি একটিরও । তাই মামলা করে দীর্ঘ সময় পেড়িয়ে গেলেও রায় না আসায় মামলা করতে আগ্রহ দেখায় না ব্যবসায়ীরা। অনেক ব্যবসায়ী প্রতারিত হয়ে সর্বস্ব হারিয়ে পথে বসে গেছে এমন ঘটনাও ঘঠছে প্রতিবছর । তাই তাদের দাবি মামলায় কার্যক্রম দ্রুত শেষ করার প্রতি প্রশাসনকেই উদ্যোগ নিতে হবে।

তিনি আরো বলেন, ব্যাংকগুলোতে একাউন্ট খোলার সময় যাচায় বাছায় না করায় ভূয়া ব্যবসায়ীরা প্রতারণা করার সুযোগ পায়। তাই ব্যাংকে একাউন্ট খোলার আগে তা যাচায়-বাছায় করা দরকার ।

আইনজীবী অ্যাডভোকেট কামাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, বাংলাদেশ সংবিধানে ৪২০ ধারায় প্রতারণার সর্বোচ্চ শাস্তি হচ্ছে সাত বছরের জেল ও অর্থদণ্ডের কথা রয়েছে। তবে টাকার পরিমাণ বেশি হলেও শাস্তি একই ।

তবে আসামীরা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই পার পেয়ে যাচ্ছেন বিভিন্ন থানার অসহযোগিতার কারণে। ব্যবসায়িদের মতে,   আসামী পলাতক বা স্থান পরিবর্তন করলে তাকে গ্রেপ্তার করার জন্য সংশ্লিষ্ট থানা আগ্রহ না দেখানোর ফলে আসামীর বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা  নেওয়া সম্ভব হয় না।

এসব প্রতারণা বন্ধে ব্যাংক একাউন্ট খোলা ও লোন দেওয়ার ব্যাংকগুলোকে আরো বেশি যাচায়-বাছায় করা ও আসামীদের দ্রুত গ্রেপ্তার কারার জন্য পুলিশের সহায়তা দরকার বলে ব্যবসায়ীরা মনে করেন।