পূর্বাঞ্চলে বন্ধ অর্ধেক রেল স্টেশন, রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার

ছবি সংগৃহীত

রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলে গত এক দশকে নতুন নিয়োগ না হওয়ায় লোকবল সংকটে বন্ধ হয়ে গেছে অর্ধেকের বেশি স্টেশন। ২০০৬ সালে পূর্বাঞ্চলের ২০৯ টি স্টেশন সচল থাকলেও বর্তমানে সচল আছে মাত্র ১০৩টি স্টেশন। বাকি ১০৬টি স্টেশনে কোনো স্টেশন মাস্টার কিংবা বুকিং সহকারি না থাকায় স্থায়ীভাবে ৮৯ ও অস্থায়ীভাবে ১৭টি স্টেশন বন্ধ ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। এতে জনদুর্ভোগ বাড়ার পাশাপাশি সরকার রাজস্ব হারাচ্ছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

ছবি সংগৃহীত
ছবি সংগৃহীত

পূর্বাঞ্চল রেলসূত্রে জানা যায়, নিয়োগ বাণিজ্য আর অনিয়মের অভিযোগে ২০০৬ সাল থেকে একাধিকবার নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দিয়েও নিয়োগ দিতে পারিনি বাংলাদেশ রেলওয়ে। ফলে গেল এক দশকে পূর্বাঞ্চল বি শ্রেণীর ১৫৯টি স্টেশনের মধ্যে ৫৬ স্টেশন বন্ধ হয়ে গেছে। বি শ্রেণি ক্যাটাগরিতে প্রতিটি স্টেশনে একজন স্টেশন মাস্টার এবং একজন বুকিং সহকারি থাকার কথা। কিন্তু ৫৬ টি স্টেশনে ১১২টি স্টেশন মাস্টার এবং বুকিং সহকারি অবসরে যাওয়ায় এসব স্টেশনকে স্থায়ী এবং অস্থায়ীভাবে বন্ধ ঘোষণা করে রেলওয়ে।

এছাড়া, ডি শ্রেণি ৫০ স্টেশনের মধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে সবকটিই। নিয়ম অনুযায়ী এসব স্টেশনে একজন বুকিং সহকারি থাকার কথা। কিন্তু ডি শ্রেণি ৫০টি স্টেশনের সবকটিতেই বুকিং সহকারির চাকরির মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় এবং নতুন নিয়োগ না হওয়ায় এসব স্টেশন বন্ধ করে ঘোষণা করা হয়।

অর্থাৎ গেল এক দশকে লোকবল সংকটে পূর্বাঞ্চলে মোট ১০৬টি স্টেশন বন্ধ করে দিয়েছে বাংলাদেশ রেলওয়ে; যার মধ্যে শুধু ২০১৪ সাল থেকে ২০১৫ সালের মে মাস পর্যন্ত ১৭ মাসে বন্ধ হয়েছে অর্ধেকের বেশি স্টেশন।

অন্যদিকে এসব স্টেশনে ট্রেন থামার কোনো বাধ্যবাধকতা না থাকায় দুর্ভোগ পোহাতে হয় এসব স্টেশনের যাত্রীদের। আবার ট্রেন থামলেও স্টেশন মাস্টার কিংবা বুকিং সহকারি না থাকায় যাত্রীদের কাছ থেকে ভাড়া পায় না সরকার।

অর্ধেকের বেশি স্টেশন বন্ধ হয়ে যাওয়া প্রসঙ্গে জানতে চাইলে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যাবস্থাপক মোজাম্মেল হক বলেন, আইনি জটিলতার কারণে ২০০৬ সাল থেকে রেলওয়ে নতুন লোকবল নিয়োগ দিতে না পারায় এ সংকট দেখা দিয়েছে। লোকবল নিয়োগ হলে এসব স্টেশন আবারও চালু করা হবে।

রেলওয়ের ২০০৬ সাল থেকে ২০১৫ সালের মে মাস পর্যন্ত তথ্য অনুযায়ী, পূর্বাঞ্চলের ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে স্থায়ীভাবে ১৪ এবং অস্থায়ীভাবে বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে ৩টি স্টেশন। এর মধ্যে রয়েছে ভাটিয়ারী, বাড়বকুন্ড, বারৈয়াঢালা, মিরসরাই, মাস্তাননগর, হাসানপুর, মুহুরীগঞ্জ, কালীদহ, শর্শদী, নাওটি,আলীশহর, ময়নামতি, রাজাপুর খানাবাড়ী, শ্রীনিধি, তালশহর ও ঘোড়াশাল স্টেশন। যার মধ্যে গেল তিন বছরেই বন্ধ হয়েছে ৯ টি স্টেশন।

চট্টগ্রাম নাজিরহাট রুটে স্থায়ীভাবেই বন্ধ রয়েছে ঝাউতলা এবং সরকারহাট স্টেশন।

আখাউড়া-সিলেট-ছাতকবাজার রুটে রুটে ইটাখোলা, সাতগাঁও, লস্করপুর, টিলাগাঁও এবং ভাটেরাবাজার, আফজালাবাদ এবং ছাতকবাজারসহ স্থায়ীভাবে ৭টি এবং অস্থায়ীভাবে ২টি স্টেশন বন্ধ রয়েছে।

লাকসাম-নোয়াখালী রুটে দৌলতপুর, খিলা এবং বজরা স্টেশন স্থায়ীভাবে বন্ধ রয়েছে।

লাকসাম-চাঁদপুর রুটে বন্ধ রয়েছে শাহাতলী, চিতোষীরোড এবং মেহের স্টেশন।

ভৈরববাজার-ময়মনসিংহ রুটে বন্ধ রয়েছে কালিকাপ্রসাদ, নীলগঞ্জ, বিষকা, সোহাগী এবং আঠারোবাড়ি স্টেশন। ময়মনসিংহ-ঝারিয়াঝাঞ্জইল ও মোহনগঞ্জ রুটে বন্ধ রয়েছে বারহাট্টা এবং ঠাকুরাকোনা স্টেশন।

ঢাকা-দেওয়ানগঞ্জ বাজার রুটে ইজ্জতপুর, উমেদনগর, নন্দিনা, মোশাররফগঞ্জ, ধনা, পিয়ারপুরসহ স্থায়ীভাবে ৫ টি এবং অস্থায়ীভাবে আরো ৫ টি স্টেশন রয়েছে। যার সবকটি বন্ধ হয়েছে ২০১০ সাল থেকে ২০১৪ সালের মধ্যে।

জামালপুর কোট-বঙ্গবন্ধু সেতু (পূর্ব) রুটে বন্ধ রয়েছে কেন্দুয়া বাজার, বাউসি, হেমনগর, শহীদনগর বারৈপটল এবং দুরমুট স্টেশন।

রেলওয়ে মাস্টার এবং কর্মচারী সমিতির সভাপতি মুখলেছুর রহমান বলেন, লোকবল সংকট থাকার কারণে যাত্রীরা যেমন হয়রানির শিকার হচ্ছেন তেমনি সরকার রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। চাকরির মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়া এবং ২০০৬ সাল থেকে নতুন নিয়োগ না হওয়ায় এ সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে। এ সমস্যা থেকে উত্তরণের জন্য দ্রুতই আইনি ঝটিলতা নিরসনের মাধ্যমে নতুন নিয়োগ দিতে হবে। তা না হলে আগামী দুই-তিন বছরের মধ্যে রেলের যেসব কর্মকর্তা এবং কর্মচারীর চাকরি মেয়াদ শেষ হবে যাবে তার সংখ্যা প্রায় ৩০ শতাংশের বেশিতে পৌঁছাবে। সে হিসাবে পূর্বাঞ্চলের আরও ৩০ থেকে ৪০টি স্টেশন বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশংকা রয়েছে।