শুরু হলো ভাষা ও তারুণ্যের মাস

0
63
21 february

শুরু হলো ভাষা ও তারুণ্যের মাসশুরু হলো শোক, শক্তি আর গর্বের মাস ফেব্রুয়ারি। দাবি আদায়ের অনবদ্য নজির স্থাপনের মাস। ১৯৫২ সালের এই মাসের একুশ তারিখ বাংলা ভাষায় কথা বলার দাবি আদায় করতে অকাতরে বুকের রক্ত ঢেলে দেয় বাংলার কতিপয় দামাল ছেলে। যার স্পর্শে বাঙ্গালীর চেতনা শানিত ও বিকশিত হয়ে জাতি আজ স্বাধীকারে স্বাদ লাভ করেছে।

সেই সাথে স্বাধীনতার মর্জাদা রক্ষায় যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কার্যকর করার দাবিতে তরুণ প্রজন্মের জেগে ওঠার মাস। ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারির মাসের ৫ তারিখে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ১৯৭১ সালে মানবতা বিরোধী অপরাধের দায়ে জামায়াতের নেতা আব্দুল কাদের মোল্লার যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন আদালত। কিন্তু তরুণ প্রাণের দাবির মুখে ওই রায় আবার দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। কাদের মোল্লার ফাঁসিও কার্যকর হয়।

তাই একদিকে ভাষা আরেক দিকে তারুণ্যের জয় ফ্রেব্রুয়ারিকে করেছে মহিমান্বিত।

১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি মায়ের মুখের ভাষার জন্য এদেশের দামাল ছেলেরা বুকের রক্তে রাজপথ রঞ্জিত করেছিলেন। পশ্চিম পাকিস্তানী শাসক গোষ্টি রাষ্ট্রভাষা হিসাবে উর্দুকে সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙ্গালির উপর চাপিয়ে দিতে চাইলে এদিন রফিক, সালাম, বরকত আর শফিক নিজেদের জীবন দিয়ে মাতৃভাষা বাংলার সম্মান রক্ষা করেন।

১৯৪৮ সাল। ২৩ ফেব্রুয়ারি। করাচিতে গণপরিষদের প্রথম অধিবেশনে বিরোধী দল দুটি সংশোধনী প্রস্তাব উত্থাপন করে। প্রথম প্রস্তাবটিতে বছরে অন্তত একবার ঢাকায় পাকিস্তান গণপরিষদের অধিবেশন অনুষ্ঠানের দাবি জানানো হয়। দ্বিতীয় প্রস্তাবটি ছিল ভাষা সংক্রান্ত। দ্বিতীয় সংশোধনীটি ছিল খসড়া নিয়ন্ত্রণ প্রণালির ২৯ নাম্বার ধারা সম্পর্কে। এই ধারায় বলা হয়েছিল- পরিষদের প্রত্যেক সদস্যকে উর্দু বা ইংরেজিতে বক্তৃতা করতে হবে। প্রস্তাবটির উপস্থাপক পূর্ববাংলার কংগ্রেস দলের প্রতিনিধি শ্রী ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত ইংরেজির সঙ্গে বাংলাকেও পরিষদের সরকারি ভাষা করার প্রস্তাব করেন। ২৫ ফেব্রুয়ারি এই প্রস্তাব সম্পর্কে আলোচনা হয়। পাকিস্তানের প্রথম প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান, পূর্ববাংলার প্রথম প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমউদ্দীন ও গণপরিষদের সহ-সভাপতি মৌলভী তমিজুদ্দীন খানের তীব্র ভাষায় বিতর্কের পর বাংলা ভাষা গণপরিষদের অন্যতম ভাষার দাবির প্রস্তাব অগ্রাহ্য হয়।’
ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত পরিষদে উত্থাপিত তার প্রস্তাবে উল্লেখ করেন- ‘প্রাদেশিকতার মনোভাব নিয়ে তিনি এ প্রস্তাব করেননি। পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনসাধারণের ভাষা বাংলা। তাই বাংলা পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হওয়া উচিত।’ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের বিরোধিতা করে পরিষদের নেতা পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান বলেন, ‘… পাকিস্তান মুসলিম রাষ্ট্র, তাই পাকিস্তানের ভাষা মুসলিম রাষ্ট্রের ভাষাই হওয়া উচিত।’ বিরোধিতায় আরো এক কাঠি উপরে ছিলেন পূর্ব পাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দীন। তার ভাষ্য, ‘উর্দুই পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হতে পারে বলে পূর্ববঙ্গের অধিকাংশ মানুষের অভিমত।’
লিয়াকত আলী ও খাজা নাজিমুদ্দীনের বক্তব্য যে কত বিভ্রান্তিকর আর অসত্য তার প্রমাণ পেতে বেশি দিন অপেক্ষা করতে হয়নি। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি-পরবর্তী ঘটনাবলী তার জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত।

সেদিনের সেই আত্মত্যাগ বৃথা যায়নি। আজ বাঙ্গালীর এই বীরত্ব গাঁথার ইতিহাস ছড়িয়ে গেছে বিশ্বময়। বাঙ্গলীর একুশে ফেব্রুয়ারি এখন আন্তজার্তিক মাতৃভাষা দিবস নামে পালিত হয় পৃথিবীর অনেক দেশে। সারা পৃথিবীর মানুষ জানে বাঙ্গালীর সেদিনের সেই আত্মত্যাগের কথা ।

আজ থেকে সারা দেশে ধ্বনিত হবে কালজয়ী সেই গান ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি?’। থাকবে মাসব্যাপী একুশের বই মেলাসহ নানা অনুষ্ঠান। ভাষার মাসে দেশের সব স্থান মুখরিত থাকবে বৈচিত্রময় সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডে। সৃজনশীল ও উদ্দীপনামূলক আমেজ বিরাজ করবে সবখানে।