কেমন আছেন হরিজন সম্প্রদায়ের মানুষেরা ?

0
296
রিজভী

horijon-pic-01দেশে ৫৫ লাখ দলিত জনগোষ্ঠীর মধ্যে হরিজন সম্প্রদায়ের মানুষ প্রায় ১৫ লাখ। দেশের শহর, বন্দর কিংবা গ্রাম-গঞ্জে যারা পেশা হিসেবে আবর্জনা পরিষ্কার ও মলমূত্র নিষ্কাশনের কাজে নিয়োজিত সেই সকল মেথর, ধাঙ্গড়, ভূঁইমালি বা ঝাড়ুদারকে হরিজন বলা হয়ে থাকে। অনগ্রসর দলিতদের একটি অংশ এই হরিজনরা শুধুমাত্র এই পেশা অবলম্বনের জন্য সামাজিকভাবে অবহেলিত ও বঞ্চিত।

প্রতিযোগিতামূলক আজকের পৃথিবীতে মানুষের নিরন্তর পথচলা দিগ্বিদিক। সব কিছু পেছনে ফেলে মানুষ শুধু সামনের দিকে ছুটছে।  ‘মানুষ’ পরিচয়টা সেখানে মুখ্য হয়ে আর সবকিছু গৌণ হয়ে পড়ছে। কিন্তু তার পরও কথা থেকে যায়। সেটা হচ্ছে হরিজনদের কথা। অস্পৃশ্য হিন্দু সম্প্রদায়কে দেওয়া গান্ধীজি প্রদত্ত নাম। সেই হরিজনদের কোনো পরিবর্তন নেই।

হরিজনরা দিনাতিপাত করছে অন্য এক জগতের বাসিন্দা হয়ে। অথচ ওদের ঝাড়ুর ছোঁয়ায় পুরো নোংরা শহর চকচকে হয়ে ওঠে প্রতিদিন। তার পরও ওই দুঃখী মানুষগুলোর খোঁজ রাখে না কেউ।

রাতের শেষ প্রহর, একটু একটু করে চারদিকে আঁধার কাটছে। কারো কারো ঘুম ভাঙছে, আবার অনেকেই গভীর ঘুমে অচেতন। এরই মধ্যে কিছু মানুষ ছোট ছোট দলে হাতে ঝাড়ু নিয়ে শহরের রাস্তায় নেমে পড়ে। রাস্তায় জমানো ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কার করে। এছাড়া শহর, বন্দর, গ্রামে-গঞ্জে আবর্জনা পরিষ্কার, মলমূত্র নিষ্কাশন, ড্রেনেজ-টয়লেট পরিষ্কার করাই ওদের কাজ। ঝিনাইদহ জেলার হরিজন সম্প্রদায়ের মানুষ রয়েছে নানা দুঃখ-কষ্ট ও বৈষম্যের মধ্যে।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, দেশ স্বাধীনের পর থেকে ঝিনাইদহ জেলা ও উপজেলা শহরের কয়েকটি স্থানে হরিজন সম্প্রদায় বসবাস শুরু করে। বর্তমানে জেলা শহরের চাকলা পাড়া, হামদহ, হাটখোলা, নগরবাথান, হলিধানি, ওয়াবদা কলোনি ও উপজেলার সড়কগুলোতে এ সম্প্রদায়ের লোকজন বসবাস করে। ৮ শতাধিক পরিবারে ৩,২০০ লোক বসবাস করে।

কলোনিগুলোতে অস্বাস্থ্যকর, নোংরা পরিবেশ, নেই বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা, ড্রেনেজ, কলোনিগুলোতে কাঁচা-আধাপাকা, টিনসেড ও কিছু পাকা ঘর আছে, এক একটি ঘরের মধ্যে বাবা-মা, ভাই-বোন, ছেলে-ছেলে বউ, মেয়ে-মেয়ে জামাইসহ ৭-৮ জন লোক বসবাস করে। ওদের নিজস্ব ধর্মীয় উপাসনালয় বা মন্দির নেই জেলার কোথাও।

হরিজন সম্প্রদায়ের শিশুরা মেথরের ছেলে মেয়ে হিসেবে অবহেলিত, সুবিধাবঞ্চিত। পড়ালেখার জীবনে প্রবেশ করতে পারে না। ফলে কচি বয়সেই বড়দের মতো ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কারের কাজে লেগে যায়। সামাজিক দৃষ্টিতে হরিজনরা খুবই নীচু হওয়াতে মানুষের জীবনের মৌলিক অধিকারগুলো কখনোই এরা কল্পনা করতে পারে না। ন্যূনতম সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় সুযোগ সুবিধা পায় না। অনেকে বিনা চিকিৎসায় মারা যায়। কিন্তু তাদের খবর কেউ রাখে না। অথচ তাদের ভোটাধিকার আছে। আছে সরকারি সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার অধিকার।

ঝিনাইদহ পৌরসভার মোট ৯টি ওয়ার্ডে ৯১ জন সুইপার কাজ করে। এছাড়া পাবলিক-প্রাইভেট সেক্টরে পরিচ্ছন্নতা কর্মী হিসেবে অনেকে নিয়োজিত।  আবর্জনা, ড্রেনেজ পরিষ্কারসহ ৩-৪ ধরনের কাজ করেন নারী-পুরুষ। কিন্ত এদের বেতন কাঠামো খুবই হাস্যকর, মাসিক ৫০০ থেকে মাত্র ৮০০ টাকা। কোনো কোনো স্থানে ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা।

তাদের চাকরি স্থায়ী নয়, মাস্টার রোলে কাজ করতে হয়। মেডিক্যাল ভাতা, মাতৃত্বকালীন ছুটি, উৎসব ভাতাসহ অন্যান্য সুযোগ সুবিধাও নেই। দিনে দিনে ঝিনাইদহ জেলাসহ উপজেলা শহরের পরিধি বাড়লেও নতুন করে লোক নিয়োগ হয় না। হরিজন সম্প্রদায়ে বাড়ছে বেকারত্বের সংখ্যা।

ঐতিহাসিকভাবে হরিজনরা সমাজ থেকে বিচ্ছিন্নভাবে জীবন যাপন করলেও তাদের পেশা ছিল নিশ্চিত। কিন্তু বর্তমানে অসচেতনতা, অবহেলাসহ নানা কারণে হরিজনদের পেশায় অন্য সম্প্রদায়ের প্রবেশে তারা পেশার নিশ্চয়তা হারাচ্ছে। হাসপাতাল, পৌরসভা, উপজেলা, থানা, স্কুল-কলেজসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ঝাড়ুদার, কিনার, সুইপার পদে হরিজনদের চাকরির অগ্রাধিকার থাকলেও অন্য সম্প্রদায়ের লোকজন সেই সুযোগ সুবিধা ভোগ করছে বলে অভিযোগ।

ঝিনাইদহ ওয়াপদা কলোনির মানিক হরিজন জানান, কাজ নেই বেকার বসে আছি। দোকান-পাটে গেলে চা নাস্তা সহ  অন্যান্য খাবার দেওয়া হয় না।

সুরেষ হরিজন জানান, চাকরি নেই তাদের সুযোগ সুবিধা অন্যকে দেওয়া হয়।

শৈলকূপা পৌরসভার মিঠু লাল হরিজন জানান, হাটের দিনে বাজার থেকে কাজের বিনিময়ে তরিতরকারি অন্যান্য সামগ্রী উঠালে ইজারাদাররা জোরপূর্বক খাজনা আদায় করে।

ফেয়ার নামে একটি বেসরকারি সংস্থার গবেষণা অনুযায়ী একজন হরিজন সকাল থেকে রাতে ঘুমাতে যাওয়া পর্যন্ত ৭২টি সমস্যার সম্মুখীন হয়। সেলুনে চুল কাটতে পারে না, বাসা ভাড়া নিয়ে থাকতে চাইলে কেউ বাসাভাড়া দেয় না। কেউ তাদের কাছে জমি বিক্রি করে না। ডেকোরেটর থেকে জিনিস পত্র ভাড়া পায় না, ব্যবসা করলে কেউ জিনিস কিনতে চায় না। এ রকম শত সমস্যা প্রতিনিয়ত ওদেরকে তাড়িয়ে ফেরে।

কেএফ