কালো টাকায় টইটম্বুর টুকু পরিবার

0
168

tukuপাঁচ বছর আগেও সম্পদের দিক থেকে অতি সাধারণ মানুষ ছিলেন বটতলার উকিল শামসুল হক টুকু। কিন্তু মন্ত্রিত্বের আশ্চর্য চেরাগের স্পর্শে দারুণ বদলে গেছে তার ভাগ্য। মাত্র ৭৫ লাখ টাকা সম্পদের মালিক টুকুর পরিবার এখন  দেড়শ কোটি টাকার মালিক। অর্থবিত্ত উপচে পড়ছে কালো টাকায় টইটম্বুর টুকু পরিবারের।

সম্প্রতি টুকুর পরিবারের সম্পদের বিবরণ দিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) অভিযোগ দায়ের করেছে তার নির্বাচনী এলাকার কিছু মানুষ। অভিযোগপত্রের সঙ্গে দেওয়া হয়েছে বিভিন্ন সম্পদের মালিকানার সমর্থনে প্রয়োজনীয় দলিলাদি। দুদক সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে। অভিযোগের বিষয়ে কথা বলার জন্য তার মোবাইল ফোনে কল করা হলেও তিনি তা রিসিভ করেন নি।

নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে নির্বাচন কমিশনে (ইসি) দেওয়া হলফনামা ৭৫ লাখ টাকা মূল্যের সম্পদের পরিমাণ দেখান টুকু। আর এবার দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় দেওয়া হলফনামায়  স্ত্রী, ছেলে, ছেলের বউ ও নিজের  ১৫ কোটি টাকার সম্পদ দেখানো হয়। এ হিসেবে পাঁচ বছরে প্রদর্শিত সম্পদই বেড়েছে প্রায় ১৪ কোটি টাকা বা ২০ গুণ। কিন্তু অপ্রদর্শিত সম্পদের পরিমাণ ১৫০ গুণেরও বেশি।

নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা যায়,২ ০১৪ সালের জাতীয় নির্বাচনে কমিশনে দেওয়া হলফ নামার সম্পদ বিবরনীতে ২০০৮ তুলনায় ২০ গুণ বেশি সম্পদ দেখিযেছেন সাবেক বিদ্যুত ও পরে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করা শামসুল হক টুকু। কিন্তু কমিশনে দেওয়া সম্পদ বিবরণীর বাইরে নিজ ও পরিবারের অন্য সদস্যদের নামে করেছেন ভিওআইপিসহ বেশ কিছু ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, জমি ও ফ্লট। টুকু নির্বাচন কমিশনে নিজের নামে দেওয়া সম্পদ বিররণীতে জানান, তিনি নিজে ২ কোটি ৪০ লাখ ৪৯ হাজার ৫১০ টাকার মালিক। কিন্তু বাস্তব চিত্র অন্ধকারে। তার ভোগ করা ও মালিকানাধীন বিভিন্ন ব্যব্সা প্রতিষ্ঠান,জমি ও ফ্লটের মূল্য পর্যালোচনা করে দেখা যায় তিনি দেড়শ কোটিরও বেশি টাকার মালিক।

হলফনামার তথ্য অনুযায়ী, শামসুল হক টুকুর কৃষি খাত থেকে আয় ৮০ হাজার টাকা, বাড়ী অ্যাপার্টমেন্ট ভাড়া বাবদ ২ লাখ ৮৩ হাজার ৫০০ টাকা, শেয়ার ও সঞ্চয়পত্র ৫ লাখ ৩৯ হাজার ১২১ টাকা, মন্ত্রী হিসেবে প্রাপ্য ভাতা (পারকুইজিট ও ভাতা) ৬ লাখ ১৬ হাজার ৬২০ টাকা, নগদ টাকা ৩ হাজার ৫০০ টাকা, ব্যাংকে জমা ১৬ লাখ ৬ হাজার ৮০ টাকা, ডিপিএস ১ লাখ ৭৮ হাজার ৯৬০ টাকা, এফডিআর ৪৫ লাখ ৪১ হাজার ৫৪৬ টাকা, বাস ট্রাক ৭১ লাখ ৩৯ হাজার ৯৮৫ টাকা, স্বর্ণ ১০ হাজার টাকা,ইলেকট্রনিক্স সামগ্রী ৪০ হাজার টাকা, আসবাবপত্র ৫০ হাজার টাকা, পিস্তল ৮৬ হাজার ৯০০ টাকা, অকৃষি জমি (৫ কাঠা) মূল্যে ৪৯ লাখ ৭৭ হাজার ২৯৮ টাকা, দালান ১০ লাখ ৫০ হাজার টাকা, পৈত্রিক বসত ভিটা ২৫ লাখ টাকা। এ দিকে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ব্যাংক ও হাউস বিল্ডিং ফাইনান্স কর্পোরেশনের কাছে দেনা আছেন ৬৫ লাখ ৪৭ হাজার ৪০৯ টাকা।

কিন্তু বাস্তবতা বলছে,  ১০ লাখ ৫০ হাজার টাকা মূল্য দেখানো পাবনা শহরে ২ তলা বাড়িটি আসলে ৫ তলা। আর এর বর্তমান মূল্য আড়াই কোটি টাকা। এখানে তিনি ২ কোটি ৩৯ লাখ ৫০ হাজার টাকা অপ্রদর্শিত রেখেছেন বলে দুদকে দেওয়া অভিযোগে জানানো হয়। গ্রামের বাড়ি বৃশালিখায় নির্মিত ২৫ লাখ টাকার বসত বাড়ির বিপরীতে রয়েছে ৩ হাজার ৯২৪ বর্গফুটের প্রাসাদ। যার নির্মান ব্যয় ২ কোটি টাকার বেশি। এখানে তিনি পৌনে দু’কোটি টাকা অপ্রদর্শিত রেখেছেন। ব্যাংকে জমা দেখানো ১৬ লাখ ৬ হাজার টাকার বিপরীতে জনতা ব্যাংক ও মার্কেন্টাইল ব্যাংকে তার রয়েছে কোটি টাকার বেশি। অভিযোগ পত্রে বলা হয় কোটি টাকার বেশি মূল্যের আসবাব পত্র,ইলেকট্রনিক্স সামগ্রী ও স্বর্ণালাকারের দাম দেখিয়েছেন মাত্র ১ লাখ ১০ হাজার টাকা। অকৃষি জমি ৪৫ কাঠার পরিবর্তে মাত্র ৫ কাঠা দেখিয়ে এখানে তিনি প্রায় ২ কোটি টাকা অপ্রদর্শিত রেখেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।এছাড়া কমিশনে দেওয়া সবগুলো খাতেই তিনি মোটা অংকের টাকা অপ্রদর্শিত রেখেছেন বলে অভিযোগ আনা হয়েছে।

শামছুল হক বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অভিযোগ হলো তার ছেলে এস এম আসিফ শামছের ১৪৬ কোটি টাকার ভিওআই ব্যবসার মূলধন দেখানো হয়েছে মাত্র দেড় কোটি টাকা।অভিযোগ পত্রে প্রমান সাপেক্ষে বলা হয় আসিফ শামছ ভিশন টেল নামে প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান। যা ভিওআইপি ব্যবসার সাথে জড়িত। যার নিকট প্রতিষ্ঠান লাইসেন্স বাবদ বিটিআরসি ১৫ কোটি এবং পরবর্তী ৩ বছরে গড়ে ৭ কোটি করে মোট ২১ কোটিসহ মোট ৩৬ কোটি টাকা পাওনা রয়েছে। আর জাতীয় রাজস্ব বোর্ড পাওনা রয়েছে ১ কোটি ৪৬ লাখ টাকা। স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী তার ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে এসব সম্পদ অপ্রদর্শিত রেখেছেন বলে অভিযোগ পত্রে উল্লেখ করা হয়।

অভিযোগে আরও বলা হয়, আসিফ শামছের নামে ৪০ বিঘা জমি (৪ লাখ ৮০ হাজার বিঘা প্রতি দামে) ৩ কোটি ৫৫ লাখ টাকার জমির মূল্য দেখানো হয়েছে ৮৫ লাখ টাকা।

হলফ নামায় দেওয়া বিবরণ অনুসারে টুকুর স্ত্রী অধ্যাপিকা লুৎফুনেচ্ছা বেগমের সম্পদের পরিমাণ ১ কোটি ৯৫ লাখ ৬৫ হাজার ৮০ টাকা। এখানেও লুকানো হয়েছে বিরাট অংকের টাকা। অভিযোগ পত্রে বলা হয়,তার নামে রাজধানীর উত্তরার ১৩নং সেক্টরে ১৪/০৮ নং একটি, ৩ নং সেক্টরে ৮/৩ নংয়ে একটিসহ মোট তিনটি ফ্ল্যাট রয়েছে।যা্র মূল্য ৩ কোটি টাকার বেশি।কিন্তু দেখানো হয়েছে মাত্র ৪৪ লাখ টাকা।পাবনা সদরে ১ কোটি টাকার বাড়ি দেখানো হয়েছে মাত্র ১০ লাখ ৪৫ হাজার টাকা।সব মিলিয়ে স্ত্রীর নামে সম্পদ থেকে গোপন করা হয়েছে পৌনে ৩ কোটি টাকা।

এছাড়া তার বড় ছেলে এস এম আসিফ শামছের স্ত্রী মুসলিমা খাতুনের নামে ১ কোটি ১৫ লাখ টাকা মূলধনের এস এম এন্টারপ্রাইজের মালিকানা দেখানো হয়েছে। তবে দেখানো হয়নি এ প্রতিষ্ঠানের মূলধনের উৎস এবং রাজস্ব বোর্ডের কর প্রদানের প্রমাণপত্র।

স্থানীয় অভিযোগকারীদের দাবি শামছুল টুকু স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী থাকার সুবাদে ক্ষমতার অপব্যবহার করে নিজের ও আত্মীয়-স্বজনের নামে বিপুল সম্পদ গড়েছেন।ছেলেকে ভিওআইপি ব্যবসার মাধ্যমে শত  শত কোটি টাকার মালিক হতে সহায়তা করেছেন। তাছাড়া নাম ভাঙিয়ে ভাই-ভাতিজারা জমি,বাজার দখল ও চাঁদা বাজির মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার মালিক হয়েছেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।