কৃষ্ণা থেকে রমা অতঃপর সুচিত্রা

0
80
suchitra sen
সুচিত্রা সেন। ফাইল ছবি

suchitra_sen_1722802eতখনও ইংরেজরা বিদায় নেয়নি। স্বদেশি আন্দোলনে উত্তাল ভারতবর্ষ।বিশ্ব মন্দার চাপে ‘প্রভু’ রাষ্ট্রটির অবস্থাও নড়বড়।ভারতবর্ষের স্বাধীনতার সম্ভাবনার কথা শোনা যাচ্ছে এর ওর মুখে। যদিও শেষ পর্যন্ত স্বাধীনতা আসতে আরও দেড় দশক লেগে যায় কিন্তু সে সময়ও থেমে থাকেনি যমুনার জলের কুলকুল বয়ে যাওয়া। থেমে থাকেনি কোনো বাংলা মায়ের গর্ভে আগামি সম্ভাবনার উঁকিঝুঁকি।

যমুনা নদীর পাশের মহকুমা সিরাজগঞ্জ। ১৯৩১ সালের ৬ এপ্রিল ওই মহকুমার ভাঙ্গাবাড়ি গ্রামে ভূমিষ্ট হলো এক সম্ভাবনার।দেখতে মা-পিসিদের মতো গৌর হননি। শ্যামলা এক মেয়ে শিশু জন্ম নিয়েছে।শ্যামলা বলে নাম রাখা হয়েছে কৃষ্ণা।কৃষ্ণা দাসগুপ্ত।

রেওয়াজ অনুসারে মামা বাড়িতে জন্ম নেওয়া কৃষ্ণাকে বেশ কয়েক দিন পরে নিয়ে আসা হয় পাবনা শহরের গোপালপুরের পৈত্রিক বাড়িতে। কৃষ্ণার শৈশব-কৈশোর কেটেছে সেখানেই। সমবয়সীদের কাছে কৃষ্ণা এবং ছোটদের কৃষ্ণাদি।

বাবা করুণাময় দাশগুপ্ত পাবনা মিউনিসিপ্যালিটির স্যানিটারি ইন্সপেক্টর পদে চাকরি করতেন। মা ইন্দিরা দাশগুপ্ত ছিলেন গৃহিণী। দু’বোনের মধ্যে সুচিত্রা ছিলেন বড়। ছোট বোন হেনা দাশগুপ্ত। শহরের মহাকালী পাঠশালায় পড়ালেখা শেষে সুচিত্রা সেন পাবনা বালিকা বিদ্যালয়ে নবম শ্রেণী পর্যন্ত পড়ালেখা করেন। কেবল লেখাপড়া না গান, নাটক, অভিনয়েও ছিল আগ্রহ।পাবনা শহরের নানা অনুষ্ঠানে গান গাওয়া ও নাটক থিয়েটারে তিনি অভিনয়ে দক্ষতা দেখান। বাংলার গভর্নর জন এন্ডারসনের স্ত্রী পাবনা বালিকা বিদ্যালয়ে এলে তার সম্মানে কৃষ্ণার নেতৃত্বে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ‘ঋতুরঙ্গ’ মঞ্চস্থ হয়।

উচ্চমধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম নেওয়া কৃষ্ণার ওপর বাবা-মায়ের একটু বাড়তি আদর-সোহাগ ছিল। আবার বাড়তি শাসনও ছিল। ১৯৪৭-এর দেশ ভাগের ক’মাস আগে সুচিত্রার বাবা করুণাময় দাশগুপ্ত পাবনার বাড়িঘর, চাকরি সবকিছু ফেলে সপরিবারে ভারতে চলে যান। এর পর দাসগুপ্ত পরিবারের কেউই আর ফিরে আসেননি পাবনায়।Suchitra-sen6

কলকাতা যাওয়ার পর কৃষ্ণা দাসগুপ্ত হয়ে যান রমা দাসগুপ্ত।সেখানে বিয়ে করেন ঢাকা ত্যাগী আরেক বনেদি ব্যবসায়ী আদিনাথ সেনের ছেলে দিবানাথ সেনের সঙ্গে পাবনার মেয়ে রমা দাশগুপ্ত অর্থাৎ কৃষ্ণার বিয়ে হয়।

আর বিয়ের পর স্বামীর পদবিতে রমা দাশগুপ্ত হয়ে যান রমা সেন।পাবনার উচ্চ মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে রমা বনেদি পরিবারের বধূ হয়ে ঘর-সংসার করতেই সিনেমার অভিনয়ে জড়িয়ে পড়েন। বিয়ের আড়াই বছরের মাথায় ১৯৫২ সালে ‘শেষ কোথায়’ নামের একটি বাংলা ছবিতে তিনি প্রথম অভিনয় করেন। অজ্ঞাত কারণে ছবিটি মুক্তি পায়নি। এরপর ১৯৫৩ সালে নায়িকা হয়ে তাঁর অভিনীত প্রথম ছবি ‘সাত নম্বর কয়েদি’ ছবিটি মুক্তি পায়।

এর পরই হারিয়ে যায় কৃষ্ণা, হারিয়ে যায় রমা।জন্ম হয় কিংবদন্তী সুচিত্রা সেনের।

অসাধারণ অভিনয়শৈলী আর সাবলীল অভিনয় উপহার দিয়ে বাংলা চলচ্চিত্রে একচেটিয়া সাফল্য পাওয়ার পাশাপাশি বলিউডেও মজবুত আসন গেড়েছিলেন সুচিত্রা সেন। ‘দেবদাস’, ‘আঁধি’ এবং ‘মমতা’র মতো ছবিতে সুচিত্রার অভিনয় প্রতিভা দেখে মুগ্ধ হয়েছেন অগণিত দর্শক।

তবে চলচ্চিত্র বোদ্ধাদের দাবি কলকাতার চলচ্চিত্রজগতে সুচিত্রা সেনের আত্মপ্রকাশকে বিচার করতে হবে উত্তর-স্বাধীনতা কালে ভারতের সমাজ ও সংস্কৃতির নিরিখে। সে সময় পূর্ব পাকিস্তান থেকে আগত অভিবাসি ও উদ্বাস্তুর তুমুল স্রোতে শহুরে ভদ্রলোক সমাজে পাশ্চাত্ব মনোভাব তেমন করে দানা বাঁধতে পারে নি; বাঙালীদের মধ্যবিত্ত মূল্যবোধ তখনও পুরুষ-দমিত গোষ্ঠীতন্ত্রের ঐতিহ্যকে আঁকড়ে ধরে রেখেছে। তবে সৌভাগ্যক্রমে সুচিত্রার পরিচালকেরা, যেমন অগ্রদূত (বিভূতি লাহা, ও সহযোগী), যাত্রিক, অজয় কর, নির্মল দে, প্রভৃতি এই আদর্শ নারীর চরিত্রেই সুচিত্রা সেনকে উপস্থাপন করলেন। যে ছবিটি সুচিত্রা সেনকে সাধারণের কাছে প্রসিদ্ধি আনলো, সেটা হল অগ্নিপরীক্ষা (১৯৫৪)। ছবিটি চিরাচরিত নারীবিদ্বেষী গল্পর উপর ভিত্তি করে – যেখানে স্বামীকে অর্পণ করা হল সবরকমের সুযোগ-সুবিধা; রামায়ণের রামের মত তাঁকে দেওয়া হল হারানো স্ত্রীকে নানান কঠিন পরীক্ষার মধ্যে দিয়ে নিয়ে যাবার অধিকার।suchitra-sen

এই ভাবেই শুরু হল সুচিত্রা সেনের ফিল্ম-ব্যক্তিত্ব, যেটি পরে বহুবার ব্যবহৃত হয়েছে। ১৯৫৬ সালে একটি রাত ছবিতে সুচিত্রা অভিনয় করলেন একটি সরলমতী ফ্লার্ট সান্ত্বনার ভূমিকায়। ভাগ্যচক্রে সান্ত্বনা তাঁর পূর্বপরিচিত সুশোভনের সঙ্গে গ্রামের এক পান্থনিবাসে রাত কাটাতে বাধ্য হলেন। সেখানে সান্ত্বনা মাঝেমধ্যে সুশোভনকে প্রেম-প্রেম ভাবভঙ্গী দেখালেও সুশোভন যখন ঘরের একটা মাত্র বিছানায় শোবার প্রস্তাব দিলেন, সান্ত্বনা সজোরে জানালেন ওটা অন্যায়, ‘এটা ওদেশ নয়, এটা বাংলাদেশ।’ বলাবাহুল্য

উত্তম কুমার যে সময়ে মহানায়ক হন, সে সময়ে তাঁর প্রতি জনসাধারণের আকর্ষণের বড় কারণ ছিলো লোকের চোখে তিনি আদর্শ শহুরে ভদ্রলোক । যেসব ছবিতে উনি নায়কের ভূমিকায় অভিনয় করতেন, চিত্রনাট্যকার আর পরিচালকদের প্রসাদে সেই চরিত্রগুলি ছিলো আদর্শবান পুরুষের, যারা নারীর আকর্ষণে বিচলিত হন না, কিন্তু নায়িকাদের উপর শিশুর মত নির্ভরশীল। অগ্নিপরীক্ষা ( ১৯৫৪), শাপমোচন (১৯৫৫), সাগরিকা (১৯৫৬), পথে হোল দেরি (১৯৫৭), হারানো সুর (১৯৫৭) রাজলক্ষ্মী ও শ্রীকান্ত (১৯৫৮), সপ্তপদী (১৯৬১), বিপাশা ৯১৯৬২), গৃহদাহ (১৯৬৭), হার মানা হার (১৯৭১), নবরাগ (১৯৭১), আলো আমার আলো (১৯৭২) এবং প্রিয় বান্ধবী (১৯৭৫) ছবিগুলিতে উত্তমকুমারের রোম্যাণ্টিক আবেদনের মূলে রয়েছ একটি অবিবাহিত রক্ষণশীল পুরুষ যিনি যৌন ব্যাপারে উদাসীন।  এই ধরণের চরিত্রের যেটা প্রয়োজন, সেটা হল তাকে দেখভাল করা, অসুস্থ হলে সেবা দিয়ে সুস্থ করা, এবং পরিশেষে ধীরে ধীরে সূক্ষ্মভাবে প্রিয়ার নজরে আনা। উত্তমের এই চরিত্রের সঙ্গে সুচিত্রা সেনের মুখের মর্মস্পর্শী ভাব, নিখুঁত সৌন্দর্যের ডালা এবং ভুবনমোহিনী হাসি দিয়ে সৃষ্টি হল রোম্যাণ্টিক জুটির ম্যাজিক-মশলা যা উদ্বেল করল সেই সময়ের  বাংলা তথা ভারতীয় হৃদয়কে।suctrita-now

সুচিত্রা সেনের বিপরীতে অভিনয় করে যে অসামান্য সাফল্য উত্তম পেয়েছিলেন, সেইরকম সাফল্য অন্য কোনও নায়িকার সঙ্গে পান নি। অন্য সুন্দরী ও প্রতিভাময়ী অভিনেত্রী, যেমন, সুপ্রিয়া চৌধুরী বা অপর্ণা সেনের বিপরীত রোলও তাকে তেমন সাফল্য দিতে পারে নি। সুচিত্রা সেনই উত্তমকে ম্যাটিনি আইডল করে তুলেছিলেন। সুচিত্রা না থাকলেও উত্তম কুমার নিশ্চয় সুদক্ষ অভিনেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতেন তবে বাংলার সোনার ছেলে হয়ে ওঠার সুযোগহতো না।

উত্তমের মৃত্যুর পর আকস্মিকভাবেই চলচ্চিত্র জগৎ থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেন সুচিত্রা সেন। তিনি নিজেকে বাড়ির চার দেয়ালে বন্দী করে ফেলেন। সুচিত্রা সেন মৃত্যুর আগমুহূর্ত পর্যন্ত লোকচক্ষুর অন্তরালেই ছিলেন।

ব্যক্তিজীবনে স্বাধীনচেতা সত্তার পরিচয় দিয়েছেন সুচিত্রা সেন। দৃঢ় মনোবলের অধিকারী নারী হিসেবেও চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন তিনি। তাঁর মেয়ে মুনমুন সেন এবং দুই নাতনি রাইমা ও রিয়া সেনও অভিনয়জগতে সাফল্য পেয়েছেন।

সুচিত্রা দীর্ঘ অভিনয় জীবনে তিনি মোট ৬২ টি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন। সুচিত্রার উল্লেখ যোগ্য চলচ্চিত্র:

  • সাড়ে চুয়াত্তর (১৯৫৩)
  • ওরা থাকে ওধারে (১৯৫৪)
  • অগ্নিপরীক্ষা (১৯৫৪)
  • শাপমোচন (১৯৫৫)
  • সবার উপরে (১৯৫৫)
  • সাগরিকা (১৯৫৬)
  • পথে হল দেরি (১৯৫৭)
  • হারানো সুর (১৯৫৭)
  • দীপ জ্বেলে যাই (১৯৫৯)
  • সপ্তপদী (১৯৬১)
  • বিপাশা (১৯৬২)
  • চাওয়া-পাওয়া
  • সাত-পাকে বাঁধা (১৯৬৩), এজন্য মস্কো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে তিনি শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীর পুরস্কার পেয়েছেন
  • হসপিটাল
  • শিল্পী (১৯৬৫)
  • ইন্দ্রাণী (১৯৫৮)
  • রাজলক্ষী ও শ্রীকান্ত (১৯৫৮)
  • সূর্য তোরণ (১৯৫৮)
  • উত্তর ফাল্গুনি (১৯৬৩)
  • গৃহদাহ (১৯৬৭)
  • ফরিয়াদ
  • দেবী চৌধুরানী (১৯৭৪)
  • দত্তা (১৯৭৬)
  • প্রণয় পাশা
  • প্রিয় বান্ধবী