ঘুরে আসি পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহার

0
817

Somapura_Mahavihara,_Bangladeshপ্রাচীন বৌদ্ধবিহার পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহার। এটি সোমপুর বিহার বা সোমপুর মহাবিহার নামেও পরিচিত। পালবংশের দ্বিতীয় রাজা ধর্মপাল অষ্টম শতকের শেষের দিকে বা নবম শতকে এই বিহার তৈরি করেছিলেন। স্যার কানিংহাম এই বিশাল কীর্তি আবিষ্কার করেন ১৮৭৯ সালে।

ইউনেস্কো ১৯৮৫ সালে এটিকে বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থানের মর্যাদা দেয়।

বর্তমানে এটি রাজশাহী বিভাগের নওগাঁ জেলার বাদলগাছি উপজেলার পাহাড়পুর গ্রামে অবস্থিত। আবিষ্কৃত হওয়ার সময়ে এর অবস্থান ছিল পুন্ড্রবর্ধনের রাজধানী পুন্ড্রনগর (বর্তমান মহাস্থানগড়)এবং অপর শহর কোটিবর্ষ (বর্তমান বানগড়)এর মাঝামাঝিতে।

যেভাবে যাবেন:

এটি দেখার জন্য সড়কপথে বাসে বদলগাছি হয়ে পাহাড়পুর আসুন। সময লাগবে ৪০ মিনিট। বৌদ্ধবিহার ঘুরেফিরে দেখতে প্রায় ৩ ঘন্টা সময় লাগবে। ইচ্ছে করলে সারাটা দিন বৌদ্ধবিহার কম্পাউন্ডে কাটাতে পারেন। এখানে প্রবেশমূল্য দুই টাকা।

অপর দিকে জয়পুরহাট জেলার জামালগঞ্জ রেলস্টেশন থেকে এর দূরত্ব পশ্চিমদিকে মাত্র ৫ কিলোমিটার। এখান থেকে অটোরিক্সা করে যাওয়া যায়।

কেন আবিষ্কার করা হয়েছিল:

ভারতীয় উপমহাদেশে ইংরেজদের আগমনের পর তারা সকল স্থানে জরিপ কাজ চালানো শুরু করে। পূর্ব ভারতে জরিপ কাজ পরিচালনা করেন বুকানন হ্যামিল্টন যিনি ১৮০৭  থেকে ১৮১২ সালের মধ্যে কোন এক সময়ে পাহাড়পুর পরিদর্শন করেন। এটিই ছিল পাহাড়পুরে প্রথম প্রত্নতাত্ত্বিক পরিদর্শন। এরপর এই প্রত্নস্থল পরিদর্শনে আসেন ওয়েস্টম্যাকট। এঁরা দেশে ফিরে তাঁদের অভিজ্ঞতা সম্বলিত বিবরণ পত্র-পত্রিকায় প্রকাশ করেন। এ সূত্র ধরেই ১৮৭৯ সালে স্যার আলেকজান্ডার কানিংহাম এই ঐতিহাসিক স্থানটি পরিদর্শন করেন। পরিদর্শনের পর এই জমিটি ব্যাপক ভাবে খনন করার প্রতি তিনি আগ্রহ দেখান। কিন্তু জমির মালিক বলিহারের তদানীন্তন জমিদার তাকে এই কাজে বাঁধা দেন। তাই তিনি বিহার এলাকার সামান্য অংশে এবং পুরাকীর্তির কেন্দ্রীয় ঢিবির শীর্ষভাগের সামান্য অংশে খনন কাজ চালিয়েই অব্যাহতি দেন। এই খননকার্যের সময় কেন্দ্রীয় ঢিবির অংশে চারপাশে উদ্‌গত অংশ বিশিষ্ট একটি বর্গাকার ইমারত আবিষ্কার করেন যার দৈর্ঘ্য ছিল ২২ ফুট। অবশেষে ১৯০৪ সালের প্রত্নতাত্ত্বিক আইনের আওতায় এ স্থান ১৯১৯ সালে সংরক্ষিত পুরাকীর্তি হিসাবে ঘোষিত হয়।

স্থাপত্য নিদর্শন

বৌদ্ধ বিহারটির ভূমি-পরিকল্পনা চতুষ্কোনাকার। উত্তর ও দক্ষিণ বাহুদ্বয় প্রতিটি ২৭৩.৭ মি এবং পূর্ব ও পশ্চিম বাহুদ্বয় ২৭৪.১৫ মি। এর চারদিক চওড়া সীমানা দেয়াল দিয়ে ঘেরা ছিল। সীমানা দেয়াল বরাবর অভ্যন্তর ভাগে সারিবদ্ধ ছোট ছোট কক্ষ ছিল। উত্তর দিকের বাহুতে ৪৫টি এবং অন্য তিন দিকের বাহুতে রয়েছে ৪৪টি করে কক্ষ। এই কক্ষগুলোর তিনটি মেঝে আবিষ্কৃত হয়েছে। প্রতিটি মেঝে বিছানো ইঁটের ওপর পুরু সুরকী দিয়ে অত্যন্ত মজবুত ভাবে তৈরি করা হয়েছিলো। সর্বশেষ যুগে ৯২টি কক্ষে মেঝের ওপর বিভিন্ন আকারের বেদী নির্মাণ করা হয়। এ থেকে অনুমান করা যায় যে, প্রথম যুগে সবগুলো কক্ষই ভিক্ষুদের আবাসকক্ষ হিসেবে ব্যবহৃত হলেও পরবর্তীকালে কিছু কক্ষ প্রার্থনাকক্ষে রুপান্তর করা হয়েছিলো।7 Paharpur.jpg-2010-06-08-

কক্ষগুলোর প্রতিটিতে দরজা আছে। এই দরজাগুলো ভেতরের দিকে প্রশস্ত কিন্তু বাইরের দিকে সরু হয়ে গেছে। কোন কোন কক্ষে কুলুঙ্গি পাওয়া যায়। কুলুঙ্গি সম্বলিত কক্ষগুলোর মেঝেতে দৈনন্দিন ব্যবহারযোগ্য বেশ কিছু দ্রব্যাদি পাওয়া যায়। ভেতরের দিকে কক্ষগুলোর দৈর্ঘ্য ৪.২৬ মি এবং প্রস্থ ৪.১১ মি। কক্ষের পেছনের দিকের দেয়াল অর্থাৎ সীমানা দেয়াল ৪.৮৭মি এবং সামনের দেয়াল ২.৪৪মি চওড়া। কক্ষগুলোর সামনে ২.৫মি প্রশস্ত টানা বারান্দা আছে। ভেতরের দিকের উন্মুক্ত চত্বরের সাথে প্রতিটি বাহু সিঁড়ি দিয়ে যুক্ত।

বিহারের উত্তর বাহুর মাঝ বরাবর রয়েছে প্রধান ফটক। এর বাইরের ও ভেতরের দিকে একটি করে স্তম্ভ সম্বলিত হলঘর এবং পাশে ছোট ছোট কুঠুরি আছে। এই কুঠুরিগুলো বিভিন্ন উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হত। প্রধান ফটক এবং বিহারের উত্তর-পূর্ব কোনের মাঝামাঝি অবস্থানে আরও একটি ছোট প্রবেশ পথ ছিলো। এখান থেকে ভেতরের উন্মুক্ত চত্বরে প্রবেশের জন্য যে সিঁড়ি ব্যবহৃত হত তা আজও বিদ্যমান। উত্তর, দক্ষিণ ও পশ্চিম বাহুতেও অনুরুপ সিঁড়ির ব্যবস্থা ছিলো। এদের মাঝে কেবল পশ্চিম বাহুর সিঁড়ির চিহ্ন আছে। উত্তর বাহুর প্রবেশ পথের সামনে ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত একটি পুকুর ছিল। ১৯৮৪-৮৫ সালের খননে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী প্রথম নির্মাণ যুগের পরবর্তী আমলে এ পুকুর খনন করা হয় এবং এসময় এ অংশের সিঁড়িটি ধ্বংস করে দেয়া হয়। পরবর্তীকালে পুকুরটি ভরাট করে দেয়া হয়।

এর এক পাশে রয়েছে জাদুঘর। যেখানে রয়েছে বিভিন্ন ধাতু নির্মিত মূর্তি এবং আসবাবপত্র। এখানে রয়েছে হেলিকাপ্টার নামার বিশেষ স্থান হেলিপ্যাড।