চট্টগ্রামের গ্যাস সংকট দ্রুত নিরসন সম্ভব নয়

0
132

চট্টগ্রামের গ্যাস সংকট নিরসনে জাতীয় গ্রিডের সঙ্গে নতুন লাইন সংযোজন অথবা বঙ্গোপসাগরে এলএনজি (তরলাকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) টার্মিনাল নির্মাণের কথা ভাবছে সরকার। এর যেকোন ১টি বাস্তবায়ন করতে ন্যূনতম ৬ বছর সময় লাগবে। সেই হিসেবে, ২০২০ সালের আগে এর সমাধান সম্ভব নয়।Gas

কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (কেজিডিসিএল) অধীনে চট্টগ্রামের আসাবন ও শিল্প-কারখানায় দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট। এর বিপরীতে, জাতীয় গ্রিডের সঙ্গে চট্টগ্রামের সংযোগ গ্যাস লাইনের সক্ষমতা দৈনিক ২২০ মিলিয়ন ঘনফুট। খাগড়াছড়ির সেমুতাং গ্যাস ক্ষেত্র থেকে ৬ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস যোগ করা হয়। তবু চাহিদার অর্ধেকও পূরণ হয় না।

চলমান সংকট নিরসনে এখনও কোনো পদক্ষেপ নেয়নি কেজিডিসিএল। ২টি প্রকল্প বিবিচনায় থাকলেও এর বাস্তবায়নে সময় লাগবে নূন্যতম ৬ বছর। সংকট নিরসনে স্বল্পমেয়াদী উদ্যোগে স্থায়ী সমাধান হবে না বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

কেজিডিসিএলের জেনারেল ম্যানেজার (এডমিন) খন্দকার মতিউর রহমান অর্থসূচককে বলেন, চট্টগ্রামের চাহিদার অর্ধেকের বেশি গ্যাস সরবরাহ করতো সাঙ্গু গ্যাসক্ষেত্র। সেটি ২০১০ সালে বন্ধ হয়ে যায়। বিকল্প কোনো উৎস না পাওয়ায় সংকট সৃষ্টি হয়েছে। সংকট নিরসনে জাতীয় গ্রিডের সঙ্গে নতুন লাইন সংযোজন অথবা এলএনজি আমদানির বিকল্প নেই। এর বাস্তবায়ন সময় ও অর্থ সাপেক্ষ।

তিনি বলেন, ১৯৮০ সালের দিকে জাতীয় গ্রিডের সঙ্গে চট্টগ্রামের গ্যাস লাইন স্থাপন করা হয়েছিল। দৈনিক ২২০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহে সক্ষম এ লাইন স্থাপনে সময় লেগেছে ৪ বছর। দৈনিক ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহে সক্ষম লাইন নতুন স্থাপনে প্রচুর অর্থ ব্যয় হবে। পুরাতন লাইন তুলে নতুন লাইন স্থাপনে সময় লাগবে নূন্যতম ৮ বছর। ইতোপূর্বে নতুন লাইন স্থাপনে সরকারের উচ্চ মহলে আলোচনা হলেও তা বাস্তবায়নে সময় ও অর্থ বিবেচনায় আটকে আছে।

খন্দকার মতিউর রহমান বলেন, নতুন লাইন স্থাপনের বিকল্প এলএনজি গ্যাস আমদানিতে গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। এর জন্য বঙ্গোপসাগরে এলএনজি টার্মিনাল তৈরি করতে হবে। টার্মিনাল নির্মাণ সামগ্রী ক্রয়ের বিষয়টি ক্রয় সংক্রান্ত কমিটিতে উপস্থাপনের অপেক্ষায় রয়েছে। ২০১৬ সালে নির্মাণ কাজ শুরু হলে ২০২০ সালে এর বাস্তবায়ন সম্ভব।

তিনি বলেন, গ্যাস সংকট নিয়ন্ত্রণে রাখতে নগরীর শিল্প কারখানায় সপ্তাহে ২ দিন গ্যাস সরবরাহ বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছে। গত ২৭ নভেম্বর থেকে সরকারি ছুটির সঙ্গে আরও ১ দিন যোগ করে এ সিদ্ধান্তের বাস্তবায়ন হচ্ছে। এছাড়া কোনো বিকল্প ছিল না। দৈনিক চাহিদা প্রায় ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট, শুধু শিল্প কারখানার চাহিদা ৩৬৮ মিলিয়ন ঘনফুট।

কেজিডিসিএলের এই জেনারেল ম্যানেজার বলেন, সরকারি সিদ্ধান্তে দীর্ঘ দিন পর আবারও কাফকো ও সিইউএফএল সার কারখানায় গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। চাহিদা অনুযায়ী, ২টি কারখানায় দৈনিক ৮৪ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস দিতে রাউজান ও শিকলবাহা বিদ্যুৎ কেন্দ্রে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করা হয়েছে। আবাসিক গ্রাহকরাও দৈনিক ৬-৮ ঘণ্টা গ্যাসবিচ্ছিন্ন থাকছেন।

সপ্তাহে ২ দিন শিল্প কারখানা বন্ধ রাখায় ব্যবসায়ীদের মাঝে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। গ্যাস সংকটের সমাধানে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি না দেখায় হতাশ তারা। সাঙ্গুর গ্যাস নিঃশেষ এবং সেমুতাংয়ের গ্যাস কমে যাওয়ায় গ্যাসের চাহিদা পূরণে বর্তমানে জাতীয় গ্রিডের উপর নির্ভলশীল চট্টগ্রাম। সেখান থেকেও চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে না বলে বিপাকে আছে ব্যবসায়ীরা।

চিটাগাং চেম্বারের সভাপতি এম. মাহবুব আলম বলেন, সপ্তাহে ২ দিন গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকলে উৎপাদনও বন্ধ থাকে। এতে ব্যাংক ঋণের সুদ ও কর্মচারীদের বেতন পরিশোধ এবং সময়মতো পণ্য জাহাজীকরণে ব্যর্থ হচ্ছে ব্যবসায়ীরা। এভাবে প্রতিযোগিতামূলক বাজারে টিকে থাকা সম্ভব না।

এই সিদ্ধান্ত দ্রুত প্রত্যাহারে ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে লিখিত অনুরোধ জানানোর কথা বলেন তিনি।

কেজিডিসিএল সূত্রে জানা গেছে, ৩ হাজার ৬৮৫টি শিল্প ও বাণিজ্যিক গ্রাহকসহ চট্টগ্রামে তাদের মোট গ্রাহক ৪ লাখ ৬৮ হাজার ৯১৮। সব মিলিয়ে দৈনিক চাহিদা প্রায় ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট। গত ৪ বছরে প্রতিষ্ঠানটির সক্ষমতা ২২৭ মিলিয়ন ঘনফুট কমেছে। তবে নতুন সংযোগ দেওয়া হয়েছে ১ লাখ ৩ হাজার ৮৮৯টি।

প্রসঙ্গত, ২০১০ সাল পর্যন্ত চট্টগ্রামে গ্যাসের চাহিদার অধিকাংশই যোগান দিত সাঙ্গু গ্যাস ক্ষেত্র। সেখান থেকে ২০০২ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত দৈনিক ২২০ মিলিয়ন ঘনফুট এবং ২০০৫ থেকে ২০১০ পর্যন্ত দৈনিক ১৮০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হতো। এর উত্তোলন ২০১৩ সালে স্থগিত ঘোষণা করে কেজিডিসিএল। যোগান কমে যাওয়ায় গ্যাস সংকটে আছে চট্টগ্রাম।

২০১০ সালে খাগড়াছড়ির সেমুতাং গ্যাস ক্ষেত্র থেকে দৈনিক ২০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উত্তোলনের সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছিল। তবে প্রথম দিকে দৈনিক ১৩ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উত্তোলন হলেও তা এখন ৬ মিলিয়ন ঘনফুটে নেমে এসেছে।

এমই/