শাহজিবাজার পাওয়ারের তদন্ত প্রতিবেদন চলতি সপ্তাহে

0
112
Shahjibajar_Power
শাহজিবাজার পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেড (এসপিসিএল) লোগো
Shahjibajar_Power
শাহজিবাজার পাওয়ার কোম্পানি

শাহজিবাজার পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেডের (এসপিসিএল) শেয়ারের ‘অস্বাভাবিক’ দর বৃদ্ধির কারণ অনুসন্ধানে গঠিত তদন্ত কমিটির মেয়াদ বাড়ছে না। বেঁধে দেওয়া সময়ের মধ্যেই কমিটি তাদের রিপোর্ট জমা দেবে। আর সেটি হবে চলতি সপ্তাহের শেষভাগে। বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

এ দিকে রিপোর্ট না পাওয়া পর্যন্ত স্পট মার্কেটেই এ শেয়ারের লেনদেন হবে। আগামী সপ্তাহে শেয়ারটির লেনদেন ব্যবস্থা সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেবে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি।

উল্লেখ, শেয়ারের দাম বৃদ্ধির পেছনে কোনো ধরনের কারসাজি আছে কি-না তা খতিয়ে দেখতে বিএসইসি গত ৯ নভেম্বর একটি কমিটি গঠন করে। কমিটিকে তাদের রিপোর্ট দেওয়ার জন্য ১৫ কার্যদিবস সময় বেঁধে দেওয়া হয়।ওই সময় চলতি সপ্তাহে শেষ হবে।

এদিকে কমিটি গঠনের পরও শেয়ারের দাম বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় গত ১৮ নভেম্বর এর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয় বিএসইসি। শেয়ারটিকে মার্জিন-ঋণ অযোগ্য ঘোষণা করা হয়। অর্থাৎ এই শেয়ার কেনার জন্য বিনিয়োগকারীকে মার্জিন ঋণ সুবিধা দিতে পারবে না কোনো ব্রোকারহাউজ এবং মার্চেন্ট ব্যাংক।

সাধারণ সময়ে সব ধরনের লেনদেন পাবলিক মার্কেটে নিষ্পন্ন হলেও শাহজিবাজার পাওয়ারের লেনদেন স্পট মার্কেটে নিয়ে আসা হয়। পাবলিক মার্কেটে কোনো শেয়ার বিক্রি করা হলে তার বিপরীতে জেড ক্যাটাগরির ছাড়া যে কোনো ক্যাটাগরির শেয়ার কেনা যায়। কিন্তু স্পট মার্কেটে এ ধরনের আর্থিক সমন্বয় নিষিদ্ধ। অন্যদিকে পাবলিক মার্কেটে নগদ টাকা জমা না দিয়েও চেকের বিপরীতে শেয়ার কেনা যায়। কিন্তু স্পট মার্কেটে শুধু নগদ টাকায় শেয়ার কিনতে হয়।

এছাড়া ব্রোকারহাউজগুলোকে নির্দেশ দেওয়া হয়, যেসব বিনিয়োগকারী শাহজিবাজার পাওয়ারের শেয়ার কিনবে তাদের তালিকা ঢাকা ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে জমা দিতে।

 একটি শেয়ারের বিরুদ্ধে এক সাথে এতোগুলো ব্যবস্থা নেওয়ায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে কিছুটা আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। কোনো কোনো বিনিয়োগকারীর আগ্রহ থাকলেও নিয়ন্ত্রক সংস্থার ‘রোষানলে’ পড়তে পারেন এমন আশংকায় ঝুঁকি নিচ্ছেন না তারা। ফলে শেয়ারটির লেনদেন তলানীতে নেমে আসে। গত ১৭ নভেম্বর ডিএসইতে শাহজিবাজার পাওয়ারের ১৭ লাখ ৭৮ হাজার শেয়ার লেনদেন হলেও পরের ৩ দিন তা ৫ হাজারই পেরোতে পারেনি।

উল্লেখ, গত ১৫ জুলাই সেকেন্ডারি মার্কেটে শাহজিবাজার পাওয়ারের শেয়ার লেনদেন চালু হয়। ওই দিন শেয়ারটি ৩৫ থেকে ৪০ টাকার মধ্যে কেনাবেচা হয়। তবে পরদিন থেকেই এর দাম তরতর করে বাড়তে থাকে। মাত্র দুই সপ্তাহের ব্যবধানে শেয়ারটির দাম প্রায় ৮০ শতাংশ বেড়ে যায়। এতো কম সময়ের ব্যবধানে শেয়ারটির দাম এতোটা বেড়ে যাওয়ায় তা নিয়ে নানামুখী আলোচনা শুরু হয়। শেয়ারের মূল্যবৃদ্ধির পেছনে কোনো কারসাজি থাকতে পারে এমন সন্দেহে ২ আগস্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে বিএসইসি।

তারপরও দাম বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় ১১ আগস্ট বিএসইসির নির্দেশে দুই স্টক এক্সচেঞ্জ শেয়ারটির লেনদেন স্থগিত করে। এক মাসেরও বেশী সময় বন্ধ রাখার পর গত ২০ অক্টোবর শেয়ারটির লেনদেন চালু করা হয়। কিন্তু ফের আগের মতোই শেয়ারটির দামের বড় উল্লম্ফন চলতে থাকে। ১৯ নভেম্বর এর দাম বেড়ে ৩৩৮ টাকায় উন্নীত হয়। অবশ্য কোম্পানিটির প্রথম প্রান্তিকের আর্থিক প্রতিবেদনও এতে ভূমিকা রাখে। গত ১৬ নভেম্বর ওই প্রতিবেদন প্রকাশ করে শাহজিবাজার। প্রতিবেদন অনুসারে আলোচিত প্রান্তিকে কোম্পানিটির শেয়ার প্রতি আয় বা ইপিএস হয় ২ টাকা ৩৬ পয়সা, যা গত বছরের একই সময়ের চেয়ে প্রায় ৩৬৩ শতাংশ বেশী। গত বছর প্রথম প্রান্তিকে কোম্পানির ইপিএস ছিল ৫১ পয়সা।

১৯ নভেম্বর বিএসইসির কমিশন বৈঠকে শেয়ারটিকে স্পট মার্কেটে নিয়ে আসা ও তাকে নন-মার্জিনেবল ঘোষণা করা হয়। পরদিন থেকে শেয়ারটির দাম ব্যাপকভাবে কমতে থাকে। সোমবার শেয়ারটির দাম কমে দাঁড়ায় ২৩৫ টাকা। মাত্র ৪ দিনের ব্যবধানে শেয়ারটির দাম কমে প্রায় ৩০ শতাংশ।

এদিকে শাহজিবাজার পাওয়ার কোম্পানিকে স্পট মার্কেটে নিয়ে আসায় ক্ষুব্ধ অনেক বিনিয়োগকারী। বিশেষ করে যারা উচ্চ মূল্যে শেয়ার কিনে এখন লোকসানে পড়েছেন। তাদের অভিযোগ, সম্প্রতি বাজারে অনেক দূর্বল মৌলভিত্তির কোম্পানির শেয়ারের দামও বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে। এমনকি জেড ক্যাটাগরির একটি কোম্পানির শেয়ারের দাম বেড়েছে প্রায় তিনগুণ। কিন্তু নিয়ন্ত্রক সংস্থা তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।

বিনিয়োগকারীদের দাবি, তারা কোম্পানিটির সম্ভাবনা বিবেচনায় নিয়ে এর শেয়ার কিনেছেন। কোম্পানিটির সহযোগী প্রতিষ্ঠান পেট্রোম্যাক্স একটি অত্যাধুনিক রিফাইনারি। এটি বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু করায় আগামী দিনে শাহজিবাজার পাওয়ার কোম্পানির আয় বাড়বে।

অন্যদিকে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন মার্চেন্ট ব্যাংকার দু’পক্ষেরই সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেছেন, শাহজিবাজার ইস্যুতে বিনিয়োগকারী এবং রেগুলেটর (বিএসইসি)- কেউই দায়িত্বশীল আচরণ করেনি।

তিনি বলেন, কোনো একটি কোম্পানির সম্ভাবনা থাকতে পারে। আর ওই সম্ভাবনার কারণে তার শেয়ারের দামও বাড়তে পারে। কিন্তু শাহজিবাজারের ক্ষেত্রে দাম বৃদ্ধির মাত্রা এবং লেনদেনের ধরনটি ছিল অস্বাভাবিক।

তিনি আরও বলেন, একটি কোম্পানির সম্ভাবনার বিষয়টি কলাম্বাসের আমেরিকা আবিস্কারের মতো নয়, যে হঠাৎ একদিনে সবাই তা জেনে গেল। আর সে কারণে সবাইকে হুমড়ি খেয়ে পড়তে হবে। একটি শেয়ার প্রতিদিনই হল্টেড হবে, তার কোনো বিক্রেতা থাকবে না তা কোনো সুস্থ স্বাভাবিক বাজারে হতে পারে না। তাই এর পেছনে কিছু অসাধু বিনিয়োগকারীর কারসাজি থাকতে পারে এমনটি মনে করার যথেষ্ট কারণ আছে। বাজার শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সংরক্ষণে অবশ্যই তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। কেউ দোষী হয়ে থাকলে তার উপযুক্ত শাস্তি হওয়াও দরকার।

কিন্তু কারসাজিকারীদের ধরার নামে লেনদেন বন্ধ রাখা, স্পট মার্কেটে নিয়ে আসা ইত্যাদি ব্যবস্থা খুব বেশী যৌক্তিক নয়। বিশেষ করে শেয়ারটির ক্রেতাদের তালিকা স্টক এক্সচেঞ্জে জমা দেওয়ার নির্দেশ এক ধরনের বাড়াবাড়ি। এতে মনে হয়, কারসাজিকারীদের নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে পড়েছে বিএসইসি। তারা যে কোনো মূল্যে শেয়ারটির দাম কমাতে চাইছে। কিন্তু নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাজ শেয়ারের মূল্য নিয়ন্ত্রণ নয়, বরং যে কোনো ধরনের  ‘ফাউল প্লে’ বন্ধ করে লেনদেনের জন্য স্বচ্ছ, জবাবদিহীমূলক ও সবার জন্য সমান ক্ষেত্র তৈরি করা।

তিনি বলেন, বর্তমানে বিএসইসির কাছে অত্যাধুনিক সার্ভিল্যান্স সফটওয়্যার আছে। ওই সফটওয়্যারের মাধ্যমে যে কোনো অস্বাভাবিক লেনদেন চিহ্নিত করা যায়। তাই সামগ্রিকভাবে সব ক্রেতার তালিকা না চেয়ে, সন্দেহজনক লেনদেনে যুক্ত ব্যক্তিদের তথ্য সংগ্রহ করলে বাজারে কোনো রকম ভীতি না ছড়িয়েও কারসাজি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।

ওই বিশ্লেষক আরও বলেন, শেয়ারের দামের বড় উল্লম্ফন বন্ধ করতে আরও দুটি বিষয়ে নজর দেওয়া প্রয়োজন। এ দুটি বিষয় হচ্ছে-সব ধরনের অস্বাভাবিক লেনদেনের বিরুদ্ধে একইরকম কঠোর অবস্থান নেওয়া এবং  ছোট আকারের আইপিও অনুমোদন না দেওয়া।

তিনি বলেন, দূর্বল মৌলের কোম্পানি সিভিও পেট্রো কেমিক্যালের শেয়ারের দাম অস্বাভাবিক হারে বেড়ে বর্তমান অবস্থানে এলেও তার বিরুদ্ধে কঠোর কোনো ব্যবস্থা নেয়নি বিএসইসি। অনেক বিনিয়োগকারী সিভিওর সঙ্গে শাহজিবাজারের সাবসিডিয়ারি পেট্রোম্যাক্সের তুলনা করে উচ্চ মূল্যে শেয়ার কিনেছেন। তাদের দাবি, রিফাইনারি হিসেবে পেট্রোম্যাক্স সিভিওর চেয়ে অনেক বেশি উন্নত, আধুনিক। এর উৎপাদন ক্ষমতাও অনেক বেশী। তাই এর দাম সিভিওর চেয়ে কম থাকতে পারে না। কারসাজিকারীরা সাধারণ বিনিয়োগকারীদের এ মনস্তত্ত্বকে কৌশলে কাজে লাগিয়েছে। সিভিওর শেয়ারের দাম এত বেশি না থাকলে তা শাহজিবাজারের মূল্যকে এমনভাবে প্রভাবিত করতে পারতো না।

অন্যদিকে শাহজিবাজারের ফ্লোটিং শেয়ারের সংখ্যা এতো কম না থাকলেও এটি নিয়ে কারসাজি করা বেশ কঠিন হতো। শেয়ার সংখ্যা কম থাকায় কিছু বড় বিনিয়োগকারী বাজার থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ শেয়ার কিনে নিয়ে সহজেই এর কৃত্রিম সংকট তৈরি করতে পেরেছেন। চাহিদা ও যোগানের ভারসাম্যহীনতার কারণেই শেয়ারটির দাম এতোটা বেড়েছে। তাই আগামী দিনে কোনো ছোট আইপিও অনুমোদন দেওয়া থেকে বিরত থাকলে বাজারের জন্য মঙ্গলজনক হবে।