যেসব কারণে হারলেন কাজী জাফরউল্লাহ

0
329

jaforনৌকার ঘাঁটি হিসেবে খ্যাত ফরিদপুর-৪ আসনেই বিপুল ভোটের ব্যবধানে ভরাডুবি হলো নৌকা মার্কার প্রার্থীর। প্রধানমন্ত্রী ও দলীয় সভানেত্রীকে এনেও নিজের পরাজয় ঠেকাতে পারলেন না আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য কাজী জাফরউল্লাহ। এমনকি এ আসনের তিনটি উপজেলার মধ্যে ভাংগা এবং সদরপুরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কাজী জাফরউল্লাহ’র পক্ষে নির্বাচনী জনসভা করার পরও এ দুটি উপজেলায় হেরেছে নৌকা। অপরদিকে জনসভা না করলেও বিএনপির ঘাঁটি হিসেতে পটরিচিতি পাওয়া চরভদ্রাসনে জিতেছে নৌকা। কাজী জাফরউল্লাহ’র নিজ এলাকা ভাংগা উপজেলার মানুষ তাকে এবার প্রত্যাখ্যান করেছে। গত নির্বাচনে যেখানে তার স্ত্রী নিলুফা জাফরউল্লাহ বিপুল ভোটের ব্যবধানে জয়ী  হয়েছিলেন সেই উপজেলায়ই ৫ বছর পর কেন এমন হাল ‘কাজী পরিবারের’ এমন প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাচ্ছেননা অনেকেই।

নৌকার ঘাঁটি হিসাবে পরিচিত এ আসনে ‘কাজী পরিবার’ হটাতে ভোটারেরা এতটাই মরিয়া ছিল যে, অন্য জেলার প্রার্থী ও রাজনীতিতে একেবারেই নবাগত প্রার্থীকে ভোট ও সমর্থন দিতে দ্বিধা বোধ করেনি। মাদারীপুর জেলার শিবচর এলাকার মজিবুর রহমান নিক্সন চৌধুরী ফরিদপুর-৪ আসনে প্রথম লড়াইয়ে চমক দেখালেন। নিক্সন চৌধুরী এ আসনের ভোটার না হলেও কাজী পরিবারকে হটাতে বিপুল ভোটে তাকে জয়ী করে স্থানীয় জনগন বুঝিয়ে দিল ‘কাজী পরিবারের’ দিন শেষ। ১৮ দলীয় জোট ভোট বর্জন করলেও ফরিদপুর-৪ আসনের বেশীর ভাগ কেন্দ্রে বিএনপির কর্মী-সমর্থকেরা নিরবে স্বতন্ত্র প্রার্থীকে ভোট দিয়ে গেছেন। বিগত নির্বাচন গুলোতে বিএনপির প্রার্থীরা যেসব কেন্দ্রে বেশী ভোট পেয়েছিল, এসব কেন্দ্রে ভোট পড়েছে অনেক বেশী এবং তা স্বতন্ত্র প্রার্থীর পক্ষেই।

ফরিদপুর-৪ আসনের সাধারণ মানুষ ও ভোটারদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, স্থানীয় রাজনীতিতে কাজী জাফরউল্লাহ তেমন কোন ফ্যাক্টর না হলেও তার বেশকিছু ‘সহযোগী’র কারনে তাকে এবার নাজেহাল হতে হয়েছে। স্বাধীনতার পরবর্তী সময় গুলোতে কাজী পরিবার ক্ষমতার আশপাশে থাকলেও এলাকার উন্নয়নে কিছুই করেনি। রাস্তা-ঘাট, ব্রিজ-কালভার্ট, বিদ্যুৎ, স্কুল-কলেজ, মসজিদ-মাদ্রাসা, সরকারী প্রতিষ্ঠান কোন কিছুরই উন্নয়ন হয়নি। দীর্ঘদিন ধরে ভাংগা পৌরসভা হলেও কোন উন্নয়নের ছোঁয়া লাগেনি। পৌরসভার ভেতরেই রাস্তা গুলোর বেহালদশা। বিদ্যুৎ নেই পৌরসভার অনেক এলাকায়। স্থানীয় জনগন পৌর মেয়রের সাথে কথাই বলতে পারেন না। পৌর মেয়র প্রধানমন্ত্রীর আত্বীয় পরিচয় দিয়ে তার স্বার্থ হাসিল করেছেন এমন অভিযোগও রয়েছে। পৌর মেয়রের নানা বিতর্কিত কর্মকান্ডের কারনে পৌরবাসী ছিল প্রচন্ড ক্ষুব্ধ। থবে অনেকেই বলছেন, ভাংগা উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি, সাধারণ সম্পাদকসহ কতিপয় নেতার কারনে কাজী পরিবারের প্রতি মুখ ফিরিয়ে নেন সাধারণ ভোটারেরা। শুধু তাই নয়, আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের একটি অংশের নেতারাও ছিল ক্ষুব্ধ। ভাংগা থানার ওসি দাদন ফকিরের সহযোগীতায় আওয়ামী লীগের সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক নিরিহ মানুষকে হয়রানী করেছে সকল ক্ষেত্রে। মামলার পর মামলা দিয়ে সর্বশান্ত করেছে বেশকিছু পরিবারকে। আর এসব করে রাতারাতি কোটি কোটি টাকার মালিক বনেছেন তারা। যদিও নেতা-কর্মীদের দিকে নজর দেবার সময় ছিলনা তাদের। কয়েকজন ব্যক্তি ছাড়া কর্মীদের অবমূল্যায়ন ছিল সব সময় কাজী জাফরউল্লাহ’র কাছে। সভাপতি কাজী হেদায়েতউল্লাহ সাকলায়েন, সাধারণ সম্পাদক ফায়জুর রহমানের বিরুদ্ধে অভিযোগের শেষ নেই স্থানীয় জনগনের। জায়গা-জমি দখল আর ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে হামলা-মামলা করারকারণে সকলেই ছিল অতিষ্ঠ। ফলে এবারই প্রথম ভাংগা উপজেলার ৯০টি কেন্দ্রের মধ্যে বেশীর ভাগ কেন্দ্রেই কাজী জাফরউল্লাহ পরাজিত হয়েছেন। ভাংগার ৯০টি কেন্দ্রে নৌকা প্রতিক নিয়ে কাজী জাফরউল্লাহ পেয়েছে ৪৫ হাজার ৩শ ৫৭ ভোট। আর স্বতন্ত্র প্রার্থী নিক্সন চৌধুরী পান ৬২ হাজার ৪শ ৩২ ভোট। এ উপজেলাই ১৬ হাজারের ভোট বেশী পায় নিক্সন চৌধুরী।

সদরপুর উপজেলা নৌকার ঘাঁটি হলেও এখানেও পরাজিত হয় নৌকার প্রার্থী কাজী জাফরউল্লাহ। বিগত দিনে ক্ষমতায় থাকার সময় এ এলাকার উন্নয়ন তেমন একটা ছিলনা। নেতা-কর্মীদের অবমূল্যায়ন ছাড়াও তার বিরুদ্ধে গেলেই হামলা-মামলা তো ছিলই। এ এলাকার জনপ্রিয় নেতা, সংরক্ষিত মহিলা আসনের এমপি বেগম সালেহা মোশাররফকে কোনঠাসা করে রাখা, সদরপুর থানার ওসি মোহাম্মদ আলীকে দিয়ে নানা ব্যক্তিকে হয়রানীর কারনে এ উপজেলায়ও কাজী জাফরউল্লাহকে ভোটারদের পছন্দ হয়নি। এ উপজেলার বেশ কয়েকটি কারনে জাফরউল্লাহ পরাজিত হয়েছেন বলে স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা গেছে। আটরশী এবং চন্দ্রপাড়া পীরের অনুসারীরা এবার ভোট দিয়েছে স্বতন্ত্র প্রার্থীকে। জামায়াত নেতা কাদের মোল্লাকে ফাঁসি দেওয়ার পর স্থানীয় জামায়াত নেতারা ও এলাকাবাসী ছিল প্রচন্ড ক্ষুব্ধ। তারা নৌকার বিপরীতে ভোট দিয়ে ‘প্রতীকি প্রতিবাদ’ জানিয়েছে। সব নির্বাচন গুলোতে নৌকা জয়ী হলেও এবার ব্যতিক্রম হয়েছে। এ উপজেলার ৫৪টি কেন্দ্রে নৌকা পেয়েছে ১৮ হাজার ৪শ ৯৮ ভোট। আর আনারস পেয়েছে ২৮ হাজার ১শ ১১ ভোট। এ উপজেলায় প্রায় ১০ হাজার ভোটের ব্যবধানে জয়ী হয়েছে নিক্সন চৌধুরী।

গত নির্বাচনে ফরিদপুর-৪ আসনের সাথে সংযুক্ত হওয়া চরভদ্রাসন উপজেলাটি বরাবরই বিএনপির ঘাঁটি। এ উপজেলাটি জেলার মধ্যে সব চেয়ে অনুন্নত। নদী ভাংগনের কবলে পড়ে চরভদ্রাসনের চারটি ইউনিয়নের মধ্যে বেশকিছু গ্রাম এখন বিলিন। দীর্ঘদিন ধরে উন্নয়ন বঞ্চিত রয়েছে এখানকার মানুষ। গত ৫ বছরে ক্ষমতায় থেকে আওয়ামী লীগ এ উপজেলার জন্য উন্নয়নের কিছুই করেনি। এলাকাবাসীর প্রধান দাবী ছিল পদ্মা নদীর ভাঙ্গন রোধে ব্যবস্থা নেয়া, সেটাই হয়নি। ফলে কাজী জাফরউল্লাহ’র প্রতি তীব্র ক্ষোভ ছিল এখানকার ভোটারদের। কিন্তু তার পরও এখানে নৌকা প্রতিক জিতেছে। যার কৃতিত্ব একে আজাদের। এফবিসিসিআই এর সাবেক এ সভাপতি একে আজাদ শেষ মুহুর্তে নৌকার জন্য মাঠে নামেন। চরভদ্রাসনের বিভিন্ন ইউনিয়নে গিয়ে নানা প্রতিশ্রুতি দেন। তাছাড়া একে আজাদের নিজ এলাকা চরভদ্রাসনের কয়েক হাজার ব্যক্তি কাজ করে তার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে। ফলে স্বভাবতই সে পরিবারের ভোট গুলো পড়েছে নৌকায়। একে আজাদের কারণে বিএনপির ঘাঁটিতে বিজয়ী হন নৌকা। এ উপজেলার ৪টি ইউনিয়নের ২২ কেন্দ্রে নৌকা প্রতিক পায় ৮ হাজার ৩শ ৯৩ ভোট। আর আনারস প্রতিক পায় ৭ হাজার ৭শ ৩৮ ভোট। কেবলমাত্র এ উপজেলায়ই নৌকা প্রতিক জিতেছে।

ফরিদপুর-৪ আসনে আওয়ামী লীগের হেভিওয়েট প্রার্থী, প্রেসিডিয়াম সদস্য কাজী জাফরউল্লাহ নানা কারণে হারলেও হারের প্রধান কারন তিনি নিজে বলেই সাধারণ ভোটারদের অভিমত। নিজেকে বড় মাপের নেতা ভেবে সাধারণ জনতাকে পাত্তা না দেওয়ায় এবার সাধারণ জনগন ভোটের মাধ্যমে তাকে প্রত্যাখ্যান করেছে বলে ভোটারদের দাবী।

সাকি/