‘বিচ্ছিন্ন এক দ্বীপ’ নয়া পল্টন

নয়া পল্টন

নয়া পল্টন‘বাচ্চাটা আমার ক্লাস সিক্সে পড়ে। তার প্রাইভেট টিউটর তিনজন। গতকাল বিকেলে সে কাঁধে ব্যাগ নিয়ে প্রাইভেট টিউটরের কাছে যাচ্ছিলো। নাইটিঙ্গেল মোড়ে পুলিশ তাকে থামিয়ে তার ব্যাগ তল্লাশি করে এবং তার আইডি দেখাতে বলে। তল্লাশি শেষে পুলিশ তাকে যাওয়ার অনুমতি দিলেও সে আর টিউটরের কাছে যায়নি, কাঁদতে কাঁদতে বাসায় চলে আসে। সে তার মাকে জানায়, সে আর পড়াশুনা করবে না।’

এভাবেই পুলিশী দুর্ভোগের কথাগুলো জানান নয়া-পল্টনের বাসিন্দা জামিল মুনতাসির। তিনি একটি প্রাইভেট কোম্পানিতে জেনারেল ম্যানেজার হিসেবে কর্মরত আছেন।

ছাপান্ন হাজার বর্গ মাইলের এই দেশে নাইটিঙ্গেল মোড় থেকে ফকিরাপুল মোড় পর্যন্ত ০.৫ বর্গ মাইলের নয়াপল্টন ভিআইপি রোডটি কার্যত বিচ্ছিন্ন ছিটমহলে পরিণত হয়েছে। বিরোধপূর্ণ ছিটমহলের মতো এখন এখানে প্রবেশ বা প্রস্থানে ভিসা (অনুমতিপত্র) লাগে। অনুমতিপত্র দেখে ভিসা-কর্মকর্তারা (পুলিশ) সন্তুষ্ট হলেই এই অবরুদ্ধ এলাকায় প্রবেশ করা যায় বা এখান থেকে বের হওয়ার সুযোগ পাওয়া যায়। ফলে এখানকার প্রায় পঞ্চাশ হাজার মানুষের দৈনন্দিন জীবন চরম দুর্ভোগ-বৈরিতার মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হচ্ছে। স্কুল-কলেজ, অফিস-আদালতে যাওয়া দূরে থাক, জরুরি প্রয়োজনে যেমন চিকিৎসা বা খাবারের জন্য ঘর থেকে বের হলেই নানা বাধা-বিপত্তি, তল্লাশী-হুমকির মুখোমুখী হতে হচ্ছে এখানকার বাসিন্দাদের।

বিএনপি চেয়ারপারসনের ‘মার্চ ফর ডেমোক্রেসি’ ঘোষণার পর হতে এই এলাকা ক্ষমতাসীন সরকারের  কাছে আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখের মত আতংকের উৎসমূল হিসাবে বিবেচিত হয়ে আসছে। ফলে ২৭ ডিসেম্বর রাত থেকে এখানে পুলিশ তিনস্তরের নিরাপত্তা দূর্গ গড়ে তোলে।

সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, নয়া-পল্টন এলাকার রাস্তা-ঘাট, অলি-গলি এখন প্রায় জন-মানুষ শুন্য। রাজধানীর অন্য দশটা এলাকার মতো এখানে স্বাভাবিক কর্ম-চাঞ্চল্য নেই। পলওয়েল মার্কেট, বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতি, লাইফ ডায়াগনিস্টিক সেন্টার, হোটেল ভিক্টরি, লা-লুনা রেস্টুরেন্ট, কড়াই-গোশত রেস্টুরেন্ট, মা-মনি গার্মেন্টসসহ চার শতাধিক দোকান-পাটে বড় বড় তালা ঝোলানো। পয়েন্টে পয়েন্টে পুলিশের দেখা পাওয়া গেলেও অনান্য দিনের মতো এই ব্যস্ত পাড়াতে  ছিলো না পথচারীদের ব্যাপক আনাগোনা। যাদের দেখা পাওয়া গেছে স্বাভাবিক স্বস্তিতে আছেন বলে মনে হয়নি তাদের। চোখে-মুখে চরম উৎকণ্ঠা নিয়ে উর্দ্বশাসে ছুটে চলা এসব মানুষ কারও সাথে কথা বলা বা ফিরে তাকানোর অবস্থায় নেই।

দুবার চেষ্টা করে কথা হয় বাজার ফেরত চল্লিশোর্ধ্ব সাইফুর রহমানের সাথে। তিনি একটি পোশাক কারখানায় কাজ করেন। তিনি জানান, ‘বাসায় বাজার করার অনেকে থাকলেও তল্লাশির ভয়ে আজ কেউ বাজারে যেতে চাইছিলো না। আমার পরিচয়পত্র থাকায় বাজারে যেতে তল্লাশি ছাড়া আমাকে তেমন কোনও সমস্যায় পড়তে হয়নি।’

নয়া পল্টনে কর্তব্যরত পুলিশের উপপরিদর্শক মিজানুর রহমানকে এতো তল্লাশি কেন চালানো হচ্ছে এমন প্রশ্ন করা হলে তিনি জানান, তারা কেবল দায়িত্ব পালন করছেন। তাদের প্রতি যে নির্দেশ আসছে তাই তারা পালন করছেন।

চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতার এই মুহুর্তে দেশের সর্বত্রই উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে। এর মধ্যে নয়া-পল্টনের বাসিন্দাদের উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা পরিস্থিতি তুলনার উর্ধ্বে।

বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া মেহজাবিন বলেন, ‘নয়া-পল্টনে কোনও খাবার ও মুদি দোকান খোলা নেই। ভয়ানক দুর্ভোগে পড়েছে আমার পরিবার।’

তার ভাষায় গত দুই দিন ধরে নয়া-পল্টন এক ‘বিচ্ছিন্ন দ্বীপ’ হয়ে আছে।