পেশা হিসেবে মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা

man Power

man Powerযদি আপনি মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনাকে নিজের ক্যারিয়ার হিসেবে গ্রহণ করতে চান তবে এটি অবশ্যই যুগোপযোগী সিদ্ধান্ত। এই পেশাটি বর্তমানে শুধু প্রাতিষ্ঠানিক সফলতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে না, প্রতিযোগিতামূলক বাজারে একজন ব্যক্তির ক্যারিয়ারকে গতিশীল করতে পেশাটির যথেষ্ট গুরুত্ব রয়েছে। বিভিন্ন পেশার উন্নয়নের গতি, মননশীলতা, ভিন্নতা ও আধুনিকতার ভিত্তিতে ২০০৭ সালে করা এক গবেষণায় বিশ্বের সেরা পেশাগুলির মধ্যে মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা উঠে এসেছে চতুর্থ স্থানে।

একনজরে মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনাঃ

মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা বলতে আমরা সাধারণত একটি প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নের লক্ষে ওই প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের সঠিক ব্যবস্থাপনাকে বুঝে থাকি। মানবসম্পদ কর্মকর্তারা তাদের নিজস্ব কর্মীদের সুযোগ সুবিধা(কম্পেনসেশন এন্ড বেনিফিট), প্রশিক্ষণ ও উন্নয়নে কাজ করে থাকেন। মানবসম্পদ চর্চায় কর্মকর্তারা কর্মীদের নির্বাচন করে থাকেন এবং কাজ ও গুণের বিচারে প্রতিষ্ঠানের সাথে উপযুক্ত কর্মীদের সাথে সুসম্পর্ক স্থাপন করেন।

এক কথায় একটি প্রতিষ্ঠানের কেন্দ্রবিন্দুতে আছে মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা। এই ব্যবস্থাপনা বিশ্বাস করে যে, একটি প্রতিষ্ঠানের নানাবিধ সম্পদের মধ্যে মানুষ এমন একটি উপাদান যা তার নিজেস্ব মেধার দ্বারা অন্য সকল সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যাবহার নিশ্চিত করতে পারে।

মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনার গুরুত্বঃ

মানবসম্পদ বিভাগ যেকোনো প্রতিষ্ঠানের জন্য সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ। মালিকপক্ষ এই বিভাগটির মাধ্যমে নিজেস্ব তথ্য কর্মীদের প্রেরণ ও প্রাতিষ্ঠানিক তথ্য গ্রহণ করে থাকেন। যদিও মানবসম্পদ বিভাগ কর্মী নির্বাচন, সাক্ষাতকার গ্রহণ, প্রতিষ্ঠানের সুযোগ সুবিধার ব্যাখ্যাদান, কর্মীদের সাথে সম্পর্ক বজায় রাখার মাধ্যমে উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য বেশি পরিচিত। তবে বর্তমানে তারা শুধুমাত্র এই সকল কর্মকাণ্ডের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রতিষ্ঠানের লক্ষ নির্ধারণ এবং বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে প্রতিভা ও মেধার সঠিক বিচারে মানবসম্পদ বিভাগ কাজ করছে। মানবসম্পদ কর্মকর্তারা বর্তমানে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ পদে কাজ করছেন এবং উন্নয়নশীল এই পেশাটিতে একজন যোগ্যতাসম্পন্ন কর্মকর্তা পরিণত হচ্ছেন প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বা সিইও হিসেবে।

ব্যেক্সিমকো মিডিয়া লিমিটেডের মানবসম্পদ বিভাগিয় প্রধান মাহবুবুর রহমান বলেন, একটি প্রতিষ্ঠান প্রধানের মূল দায়িত্ব তার প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা এবং এই কাজটিতে মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তাদের দক্ষতা রয়েছে নিঃসন্দেহে। তাই বর্তমানে বিশ্বের বড় বড় ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানে মানবসম্পদ কর্মকর্তারা সফলতার সাথে সিইও বা প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে তাদের দায়িত্ব পালন করছেন।

মানবসম্পদ বিভাগের দ্বায়িত্ব ও গুনাবলীঃ

একজন মানবসম্পদ কর্মকর্তাকে বিভিন্ন পরিস্থিতি মোকাবেলা করা ও যেকোনো পরিস্থিতিতে নিজেকে মানিয়ে নিয়ে প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নের জন্য কাজ করার দিকে বেশি নজর দিতে হয়। যদি আপনি আপনার ক্যারিয়ার হিসেবে মানবসম্পদকে বেছে নেন তবে আপনার ভিতর ধৈর্য ও সহনশীলতা এই দুটি গুণ অবশ্যই থাকতে হবে। এটি আপনাকে বিভিন্ন ধরণের অভিজ্ঞতা, অনুভূতি, শিক্ষা, জ্ঞান, দক্ষতা ও মেধাসম্পন্ন মানুষের সাথে সহজেই যোগাযোগ স্থাপন করতে সাহায্য করবে। প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের সুযোগ সুবিধা নিয়ে যদি আপনাকে কাজ করতে হয় তবে তাদের সাথে সুসম্পর্ক ও সহজ সাবলীল যোগাযোগ স্থাপন করা আপনার জন্য পূর্বশর্ত।

কৌশলী দৃষ্টিকোণ থেকে যখন আপনি প্রতিষ্ঠানের পলিসি তৈরি করবেন এবং তার সঠিক ব্যাবহার নিশ্চিতের লক্ষে কাজ করবেন তখন আপনি কর্মীদের কাছে মালিকপক্ষের কণ্ঠ হিসেবে কাজ করবেন। তাই আপনি যেমনি মালিকপক্ষের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ন ঠিক আপনি সমান গুরুত্বপূর্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের কাছে। যে কারণে আপনার মধ্যে কূটনৈতিকতা, সূক্ষ বিচার ক্ষমতা, ও পারিপার্শিক পরিবেশকে সহজে এবং সল্প সময়ে বুঝে ওঠার গুনগুলী থাকা আবশ্যক।

প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাঃ

মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনাকে পেশা হিসেবে নেওয়ার ক্ষেত্রে এই প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে প্রয়োজন সামঞ্জস্যপূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা। মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা বিষয়ে সম্পূর্ণ ও সঠিক জ্ঞান একজন ব্যক্তিকে পরিপূর্ণ পেশাদার হতে সাহায্য করে। এসব দিক বিবেচনা করে আমেরিকা ‘হিউম্যান রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট সোসাইটি’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান তাদের নিজেস্ব মানবসম্পদ নীতি বই (এইচ আর গাইড বুক) প্রণয়ন করেছেন। যার দ্বারা তারা বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়কে আরও বাস্তবসম্মত মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা শিক্ষাদানে অনুপ্রাণিত করেছে।

মানবসম্পদ বিভাগের গুরুত্ব অনুধাবন করে বর্তমানে আমাদের দেশে বেশকিছু প্রতিষ্ঠান এ বিষয়ে ডিপ্লোমা কোর্স ও স্নাতকোত্তরের ব্যবস্থা করেছে। এছাড়া প্রায় প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে বিষয়টি নিয়ে পড়ার সুযোগ রয়েছে। নিচে কিছু প্রতিষ্ঠানের নাম ও বিবরন উল্লেখ করা হলঃ

১. বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ম্যানেজমেন্ট (বিআইএম) প্রতিষ্ঠানটি মানবসম্পদের উপর এক বছরের পোস্ট গ্রাজুয়েট ডিপ্লোমা ডিগ্রী দিয়ে থাকে। এছাড়াও প্রতিষ্ঠানটি থেকে অন্যান্য বেশকিছু কোর্স করার সুযোগ আছে। প্রতিষ্ঠানটির ঠিকানা-

চার, সোবহানবাগ, মিরপুর রোড, ঢাকা-১২০৭

ফোনঃ +৮০২৮১১৭৪০৫-৭, ৯১০৩১৭১-৩, ৯১০৩১৭৮

ফ্যাক্সঃ +৮৮-০২-৮১১৪৩০৪

ইমেইলঃ bim@bim.org.bd

২. বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব হিউম্যান রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা শিক্ষায় প্রতিষ্ঠানটি দেশের অন্যতম শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন এই প্রতিষ্ঠানটি মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা ও ব্যবস্থাপনা শিক্ষাদানের লক্ষে ২০০৩ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং এটি একটি অলাভজনক সরকারি প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানটির ঠিকানা-

বি আই এইচ আর এম ফাউন্ডেসন অফিসঃ ফার্মগেট

নয়, ইন্দিরা রোড, ফার্মগেট, ঢাকা- ১২১৫

ফোন- ৮৮০২-৯১৪২৪৬৪, ০১৮১৭ ০১১ ৪০৬, ০১৯১১ ২১৪ ৫৪৫

ইমেইল- info@bihrm.orgbihrmbd@gmail.com;

ওয়েব- www.bihrm.org

 

মানবসম্পদে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা না থাকলে যা হবেঃ

মানবসম্পদ অথবা, এইচ আর-র প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা না থাকা সত্বেও বেশকিছু ব্যক্তি মানবসম্পদ চর্চা করছেন এবং তারা অত্যন্ত দক্ষতার সাথে কাজটি করতে সক্ষম হচ্ছেন। তবে তার জন্য বিষয়টির সাথে স্বামঞ্জস্য রয়েছে এমন কোনো বিষয়ে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা থাকা প্রয়োজন। এক্ষেত্রে বেশকিছু বিষয় যেমন- ব্যবস্থাপনা, লোকপ্রসাশন, ব্যবসায় শিক্ষা ইত্যাদি বিষয় গুরুত্বের সাথে বিবেচিত হয়ে থাকে।

বেক্সিমকো মিডিয়া লিমিটেডের সহকারি ব্যবস্থাপকপ্রমিত ঘোষ নিজের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে বলেন, ব্যবস্থাপনার উপরে আমি দেশে ও বিদেশে পড়াশুনা করি। পরবর্তিতে বেশকিছু প্রতিষ্ঠানের প্রসাশনিক কাজে যুক্ত হই। প্রসাশনিক কাজের অভিজ্ঞতা থাকলেও মানবসম্পদ বিভাগে কখনো কাজ করা হয় নি। তবে আমার কাজের অভিজ্ঞতা মানবসম্পদ বিভাগের কাজের সাথে স্বামঞ্জস্যপূর্ন হওয়ায় সহজেই নিজেকে এখানে মানিয়ে নিতে পেরেছি।

 

মানবসম্পদ বিভাগে শিক্ষানবিস বা ইন্টার্নশিপঃ

মানবসম্পদ বিভাগে কাজের জন্য সাধারণত এক বছর এবং কোন কোন ক্ষেত্রে ২ থেকে ৩ বছরের অভিজ্ঞতার প্রয়োজন হয়ে থাকে। এ ব্যাপারটি বিবেচনা করলে একজন অনভিজ্ঞ ব্যক্তির জন্য এ পেশায় আসা বেশ কষ্টসাধ্য। তবে মানবসম্পদ বিভাগে শিক্ষানবিস হিসেবে কাজ করার সুযোগ ব্যাপারটিকে অনেকটাই সহজ করে দিয়েছে। ২০০৭ সালে আমেরিকার ‘সোসাইটি ফর হিউম্যান রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট’-র করা এক গবেষণায় জানানো হয় যে, ৯৬ শতাংশ মানবসম্পদ শিক্ষার্থীরা মানবসম্পদ বিভাগে তাদের কর্মসংস্থান খুঁজে পাচ্ছেন ওই বিভাগে শিক্ষানবিস বা ইন্টার্নশিপের মাধ্যমে। যদিও যেকোনো বিভাগে শিক্ষানবিস হিসেবে কাজ করা যে ওই বিভাগে স্থায়ী কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করে দেবে তা নয়। তবে এর মাধ্যমে আপনি যেমন নিজের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাকে বাস্তবের সাথে মিলিয়ে নেওয়ার সুযোগ পাবেন তেমনি আপনি সুযোগ পাবেন বেশকিছু পেশাদার ব্যক্তিত্বের সাথে পরিচিত হবার ও তাদের কাজগুলিকে কাছ থেকে দেখার।

সবশেষে বলা যেতে পারে, মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা পেশা হিসেবে অত্যন্ত গতিশীল। দক্ষ মানবসম্পদ কর্মকর্তাদের সুষ্ঠু চর্চার মাধ্যমে পেশাটি আরও বেশি গুরুত্বের সাথে বিবেচিত হচ্ছে। বর্তমানে আমাদের দেশের প্রায় প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে মানবসম্পদ বিভাগ চালু করা হচ্ছে এবং সেই সাথে বাড়ছে বিভাগটির জন্য দক্ষ কর্মীর চাহিদা। তাই পেশা হিসেবে মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনাকে বেছে নেওয়া একটি সময় উপযোগি সিদ্ধান্ত।