বাজার থেকে আমেরিকার ডলার জোগানোর প্রকল্প গুটিয়ে ফেলার হুমকিতে ভারতে বিশ্ব বিনিয়োগ বাড়ছে

ভারতে বিশ্ব বাজারের বিনিয়োগের হিড়িক পড়েছে । ফলে সোমবার  সেনসেক্সকে টেনে নিয়ে যায় ৪৫১ পয়েন্ট ওপরে ৷ এক মাসের সর্বোচ্চ গতি দেখিয়ে ২০ হাজার ৮৫০.৭৪ পয়েন্টে দৌড় শেষ করে বম্বে শেয়ারবাজার সূচক৷

গত সপ্তাহে দু’মাসের তলানিতে পৌঁছে যাওয়া ভারতীয় মুদ্রাও এদিন ডলারের নিরিখে ওঠে ৭০ পয়সা ৷ বন্ধ হয় ডলার প্রতি ৬২.৪১ টাকায় ৷ ১৩২ পয়েন্ট ওঠে ৬ হাজার ১৮৯ পয়েন্টে স্থির হয় ন্যাশনাল স্টক এক্সচেঞ্জ সূচক নিফটি ৷ কারণ, বাজার থেকে ঋণপত্র কিনে ডলার জোগানোর পরিধি বাড়ানোর প্রকল্প শিগগিরই গুটিয়ে ফেলা হবে বলে বিশ্ব শেয়ারবাজারকে চাপে ফেলেছিলেন মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বর্তমান চেয়ারম্যান বেন বার্নানকি ৷

বিশেষজ্ঞদের ব্যাখ্যা, শুধু মার্কিন আশ্বাসেই নয়, চিনে নয়া অর্থনৈতিক সংস্কার এবং বাজারে চাহিদা সৃষ্টি সংক্রান্ত নীতি গ্রহণের জেরেও বিদেশি বিনিয়োগকারীরা উন্নয়নশীল দেশগুলির শেয়ারবাজারে বিনিয়োগে ফের আগ্রহী হয় ৷ মে মাসের শেষ থেকে ভারতসহ বিভিন্ন উন্নয়নশীল দেশ থেকে বিদেশি বিনিয়োগ দ্রুত বেরিয়ে যেতে শুরু করে ৷ যে কারণে, ইন্দোনেশিয়া, তুরস্ক, রাশিয়া, ভারত, ব্রাজিল, থাইল্যান্ড সবক’টি দেশের শেয়ারবাজার এবং ডলারের নিরিখে মুদ্রার বিনিময় দর পড়তে শুরু করে ৷

সোমবার মুম্বাই স্টক এক্সচেঞ্জ এবং ন্যাশানাল স্টক এক্সচেঞ্জে ১ হাজার ১৫৮ কোটি টাকা বিদেশি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ ঢুকেছে ৷ চলতি মাসে এই নিয়ে চার হাজার কোটি টাকারও বেশি প্রাতিষ্ঠানিক লগ্নি এসেছে ভারতীয় শেয়ার বাজারগুলিতে ৷ শেয়ার বাজার নিয়ন্ত্রক সেবির তথ্য বলছে, এ বছর এখনও পর্যন্ত ভারতীয় শেয়ার বাজার মোট বিদেশি প্রাতিষ্ঠানিক লগ্নি ৯২ হাজার ৯৩৬ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গিয়েছে ৷

মার্কিন মুলুকের সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, সে দেশে বেকারত্ব রয়েছে ৭.৩ শতাংশে, মূল্যবৃদ্ধি রয়েছে দু’ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রার নিচে, গত ত্রৈমাসিকে মোট অভ্যন্তরীণ উত্পাদন বা জিডিপি বৃদ্ধি পেয়েছে ২.৮ শতাংশ ৷ ফেডারেল রিজার্ভ নমিনি চেয়ারম্যান জেনেট বলেছেন, ‘মার্কিন অর্থনীতি এখনও সন্তোষজনক মাত্রায় পৌঁছায়নি৷ এখনই কেন্দ্রীয় ব্যাংক বন্ড কেনার প্রকল্প তুলে নেবে, এমন আশঙ্কা ক্ষীণ ৷’ অর্থাৎ, ডিসেম্বরে ত্রাণ প্রকল্প গুটানো হতে পারে এমন জল্পনায় ইতি টেনে দিলেন জেনেট ৷ তাঁর কথায় স্পষ্ট, বাজার থেকে ঋণপত্র কিনে সস্তার ডলার জোগান দেওয়ার প্রকল্প অন্তত আগামি মার্চ মাস পর্যন্ত চলবে ৷ তাই ভারতীয় শেয়ারবাজারে এখন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছেন ডলারে মন দেওয়া বিনিয়োগকারীরা ৷

তবে সেনসেক্স-নিফটির এই উত্থানে ঘরোয়া কয়েকটি কারণও তুলে ধরেছেন বিশেষজ্ঞরা ৷ বিভিন্ন মহলের ব্যাখ্যা, টাকা নিয়ে আরবিআই গভর্নর রঘুরাম রাজনের প্রত্যয়ী মনোভাবও বিনিয়োগকারীদের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দিয়েছে ৷ টাকার পতন-পর্বে তেল বিপণন সংস্থাগুলির ডলার চাহিদা কমাতে যে ‘বিশেষ জানালা’ ব্যবস্থা চালু করেছিল আরবিআই (রিজার্ভ ব্যাংক থেকে নেওয়া ডলার ঋণ টাকার মাধ্যমে পরিশোধ করতে পারবে তেল বিপণন সংস্থাগুলি) তার সময়কাল আরও বাড়িয়ে দেওয়ায় বিনিয়োগকারীরা আশ্বস্ত হয়েছেন যে, টাকার বিনিময় দর স্থিতিশীল রাখতে আরবিআই তত্পর ৷ এই ইতিবাচক মনোভাবেরই প্রতিফলন ঘটেছে শেয়ারবাজারে ৷

শেয়ারের মতো ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগের দিকে লগ্নিকারীরা বেশি করে ঝুকতে শুরু করায় বিশ্ব বাজারে সোনার দাম পড়ে যায়৷ লন্ডনের বাজারে প্রতি ট্রয় আউন্স সোনার দর ০.৫ শতাংশ পড়ে ১,২৮৪.২২ মার্কিন ডলার হয় ৷ রুপার আউন্স প্রতি দাম ০.৭ শতাংশ পড়ে হয় ২০.৬৬ মার্কিন ডলার ৷ আন্তর্জাতিক বাজার যে সোনার প্রতি আস্থা হারাচ্ছেন তা গোল্ড ইটিএফের দশা দেখলেই বোঝা যায় ৷ গত ১৫ নভেম্বর লন্ডনে গোল্ড ইটিএফগুলির সামগ্রিক সোনার পরিমাণ ১.৫ টন পড়ে ১,৮৬৯.৫ টন হয় ৷ ভারতের বাজারেও সোনার দাম এ দিন কমেছে ৷ কলকাতায় পাকা সোনার দাম ১০ গ্রাম পিছু ৭০ টাকা এবং গয়না সোনার দাম ৬৫ টাকা পড়ে যায় ৷

 

এআর