ফুটপাতে অন্ন

footpathরফিক, রিক্সা চালান ঢাকা শহরে। যাত্রী নিয়ে সারা দিন শহরের এক মাথা থেকে আরেক মাথা ছুটে বেড়ান। পরিশ্রম হয় তার খুব। ফলে ক্ষিধেও পায় বেশ। বিশেষ করে দুপুর বেলায় পেটের মধ্যে কি যেন একটা ছুটে বেড়ায়। হোটেল, খাবার দোকানের অভাব নেই। রাস্তার পাশে অসংখ্য পরিপাটি খাবারের দোকান। কিন্তু ওগুলো রফিকদের জন্য নয়। সারা দিনের আয়ের চাইতে ওখানে একবেলার খাবারের দাম ঢের বেশি!

আবার নাজমা আক্তারের মতো মানুষও আছে এই মহানগরে। একটু ভালো বাঁচবেন এমন আশায় নোয়াখালী ছেড়ে স্বামীর সাথে রাজধানীতে এসেছিলেন নাজমা আক্তার (৪৫)। ঢাকায় আসার পর স্বামী আরেকটা বিয়ে করে তাকে ছেড়ে চলে গেছে তাও বছর পাঁচেক হলো। ভাগ্যবিড়ম্বনার স্বিকার এই নারী তখন একমাত্র মেয়ে মর্জিনাকে নিয়ে পড়েছিলেন অকুল পাথারে। কিভাবে মেয়েটাকে বাঁচাবেন, নিজে বাঁচবেন; অচেনা শহরটিতে তখন তা ছিল তার কাছে অজানা। খুঁজে পেতে অনেক কষ্টে ফকিরাপুলের একটি বস্তিতে মাথাগোজার ঠাঁই পেয়ে গেলেন। তবে বস্তির মালিক জানিয়ে দিল মাস ফুরোতেই ভাড়া দিতে হবে ৮০০ টাকা। বস্তিতে তার প্রতিবেশী সখিনা বেগম তখন বঙ্গবন্ধু জাতীয় ষ্টেডিয়ামস্থ আউটার ষ্টেডিয়াম এলাকায় দুবেলা অস্থায়ী দোকান সাজিয়ে  ভাত, তরকারি বিক্রি করত। সেই সখিনা তাকে পরামর্শ দিয়েছিলেন সখিনার মত বস্তি থেকে ভাত তরকারি রান্না করে আউটার ষ্টেডিয়ামে অস্থায়ী দোকান সাজিয়ে বিক্রি করতে। এরই মধ্য দিয়ে বেঁচে থাকার একটা উপায় পেয়েছিলেন তিনি। সখিনার দেওয়া দু’শ টাকা নিয়ে শুরু করেছিলেন এই বেঁচে থাকার যুদ্ধ। শুরুতে আউটার ষ্টেডিয়াম এলাকায় বসে  পুলিশকে সারাদিনে দিতে হত ৫০ টাকা। ব্যবসাও ভালো চলেছিল তখন। প্রতিদিন ভাত তরকারি বিক্রি করে দেড় থেকে দু’শ টাকা আয় করতে পারতেন। গত বছর থেকে পুলিশ তাদের সেখানে বসতে দিচ্ছে না। এরপর রাস্তার ফুটপাতে বসেন তারা।footpath2

রফিকদের মতো মানুষের শেষ আশ্রয় ফুটপাতের নাজমা আক্তারদের খাবার দোকানগুলো। রাজধানীর বেশিরভাগ এলাকায়ই এমন অনেক দোকান দেখা যায়। বিয়ে বাড়ীর গরু বা মুরগির তরকারীর উচ্ছিষ্ট রান্না করে ফুটপাতের দোকানগুলোতে বিক্রি করা হয়। গরুর মাংস, গরুর বট, ছাগলের বট, মুরগির মাংস, পাঙ্গাশ মাছ, তেলাপিয়া মাছ, ডিম ও হরেক রকমের তরকারি নিয়ে ফুটপাতে খাবারের ডালা সাজিয়ে বসে এসব অস্থায়ী দোকানিরা।

মাংস, ডিম দিয়ে খেলে লাগে ৪০ টাকা। আর মাছ দিয়ে খেলে ২৫-৩০ টাকার মধ্যে হয়ে যায়। সবজিতে লাগে ১৫-২৫ টাকা।

ফুটপাতের এসব খাবারের দোকান গুলোর খদ্দের হলেন রিক্সা চালক, বাস চালক, ফুটপাতের ব্যবসায়ী, পথচারী ও টোকাইসহ নিম্ন আয়ের মানুষেরা। কম খরচে ভাল খাবার দিয়ে দুপুরের ভোজন সারতে অনেক ভোজন রসিকও খেতে বসেন ফুটপাতে।

এখন দিনে কত টাকা আয় করতে পারেন এমন প্রশ্নের জবাবে ছলছল চোখে বিক্রেতা নাজমা বললেন, ‘কয়দিন আগে এইহানেই বইয়া খানা বেচতেছিলাম। দুপুইরের পরে পুলিশ আইয়া এইহানেও বইওন যাইবনা এ কথা কইয়া খানার সব ডেক-ডেকসি রাস্তায় ফেলাইয়া দিল। হেইদিন বেঁচা অইছিল ১২০ ট্যাহা লস অইছে ২০০ ট্যাহা। এহন আর আয় নাই, পুলিশের ডরে ডরে থাহি, তারা যদি আবার আইসা সব ফেলাইয়া দেয়। কোনরহমে ১০০ টাকা অইলেই দোকান বইটটা বস্তিত যাইগা।’

তার সাথে আলাপকালে দেখা গেল কয়েকটি টোকাই (পথশিশু) এসে খাবার দেওয়ার অর্ডার দিল। টোকাই শিশুগুলো সারাদিন বিভিন্ন উপায়ে উপার্জন করে থাকে। কেউ দিনমান হার ভাঙ্গা পরিশ্রম করে আবার কেউ কেউ অপরাধমূলক কর্মকান্ডের সাথে জড়িয়ে অবৈধ পথে আয় করে।

এদের একজনের নাম মনিরুল(১১)। সে কমলাপুর রেলস্টেশনে থাকে। সে অর্ডার দিল মুরগি, ভাত। যার মূল্য আসবে ৪০ টাকা। মনিরুল কোন উপায়ে উপার্জন করে খেতে এসেছে প্রশ্নটি করতেই সে কাঁদো কাঁদো হয়ে বলল, ‘স্যার ছবি উডাইয়েননা। আম্মাই দেখলে আমারে কুঁজে ঢাহায় আইয়া পড়ব।’ মনিরুল ক্ষিপ্রতার সাথে পালিয়ে গেলেও তার অন্য বন্ধুদের কাছে জানতে পারলাম, তার বাড়ি টাঙ্গাইল, পড়াশোনা করার ভয়ে সে গ্রাম থেকে পালিয়েছে।

এদিকে দেশের রাজনৈতিক সংকটে অস্থির সকলে। লাগাতার হরতাল, অবরোধ কর্মসূচি চলছে। দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি এদের ভাত বিক্রির ব্যবসাকে ক্ষতিগ্রস্থ করছে কিনা তা জানতে চাইলাম আরেকজন বিক্রেতা কস্তুরি বেগমের(৩৮) কাছে।  তিনি বললেন, ‘এই কদিনে ব্যবসা-পাতি কিছু নাই। দুই মাস আগেও যে ব্যবসা করতাম তার অর্ধেকও অখন বেচতাম পারিনা।’

অবরোধের মধ্যে কেন আজ ভাত বিক্রি করতে এসেছেন এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘বাবাগো আমার ঘরে চাইরডা মুখ। তাগোরে বাঁচাইতে অইলে ভাত বেইচচায় ত খাওন যোগান লাগব।’

footpath1দেশের এই পরিস্থিতি চলতে থাকলে তারা কি করবেন এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি জানালেন, ‘বাবাগো বাড়িত যাইয়াম গা, কিন্তুক কেমনে যাইতাম? হুনি ত বাড়িত যাওনের গাড়িও নাকি সরকারে বন্ধ কইরা দিছে।’

এসব নিম্নবিত্ত সাধারণ মানুষগুলো জানেও না দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির কথা। তারা জানেনা দেশ কোন দিকে যাচ্ছে। তারা শুধু জানে অবরোধ হোক, হরতাল চলুক, ককটেল ফাটুক দেশে যায় ঘটে যাক না কেন দুবেলা দুটো মোটা ভাত আর মোটা কাপড় গায়ে জড়াতে হলে এই ফুটপাতেই ভাত বিক্রি করতে হবে প্রতিদিন।