অবরোধে ভেঙে পড়েছে রাজশাহীর অর্থনীতি
বুধবার, ২৩শে সেপ্টেম্বর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ
today-news
brac-epl
প্রচ্ছদ » রাজশাহী

অবরোধে ভেঙে পড়েছে রাজশাহীর অর্থনীতি

Oborodh_strikeবিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোটের ধারাবাহিক টানা অবরোধ-হরতালে ভেঙে পড়েছে রাজশাহী অঞ্চলের অর্থনীতির চাকা। রাজশাহী নগরীসহ উপজেলা পর্যায়ের ব্যবসা-বাণিজ্যে অচলাবস্থা দেখা দিয়েছে।

ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, দেশের চলমান রাজনৈতিক অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে তাদের যে আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে তা কোনোভাবে পুষিয়ে নিতে পারছেন না তারা। দিন দিন লোকসানের পরিমাণও বাড়ছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে ব্যবসায়ীদের পথে বসতে হবে। পরিবহন বন্ধ থাকায় চরম ক্ষতির মুখে পড়েছেন মালিক-শ্রমিকরা। সেইসঙ্গে পণ্য সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ায় উপজেলা পর্যায়ে ব্যবসা-বাণিজ্যে পড়েছে নেতিবাচক প্রভাব।

রাজশাহী মহানগরীর রাণীবাজার এলাকার টাইলস গার্ডেনের কর্মকর্তা মাসুদ রানা বলেন, মাসব্যাপী হরতাল-অবরোধে ব্যবসায় ধস নেমেছে। স্বাভাবিক সময় প্রতিদিন এক গাড়ি পণ্য নিয়ে আসা হতো। ব্যবসাও চলতো বেশ ভালো। কিন্তু গত এক মাস থেকে নতুন করে কোনো পণ্য নিয়ে আসা যায় নি। ফলে আগের সব পণ্য প্রায় শেষ পর্যায়ে আসলেও এখনো নতুন করে পণ্য নিয়ে আসতে পারছেন না। এতে করে গ্রাহক পণ্য না পেয়ে ফিরে যাচ্ছেন। তাই দোকানে বিক্রি নেই। অলসভাবে দিন কেটে যাচ্ছে বলে তিনি জানান।

বাগমারা উপজেলার ভবানীগঞ্জ বাজারের কাঁচামাল ব্যবসায়ী রহিদুল ইসলাম জানান, বর্তমানে সবজির বাজার খুবই মন্দা যাচ্ছে। মালামাল বাইরে না যাবার কারণে কৃষকরা এলাকাতেই কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছে। এতে কৃষক ও ব্যবসায়ী সকলেই লোকসানের মুখে পড়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

মহানগরীর সাহেববাজারের কাপড় ব্যবসায়ী নিমাই চন্দ্র জানান, টানা অবরোধে ব্যবসা-বাণিজ্য লাটে উঠেছে। শীতের সময় গরম কাপড়ের বেশ চাহিদা থাকলেও অবরোধের কারণে নতুন করে মালামাল নিয়ে আসা যাচ্ছে না। অবরোধে দোকানপাট খোলা থাকলেও ক্রেতা একদম নেই। কিন্তু মাস শেষে দোকান ভাড়া, কর্মচারীদের বেতন ঠিকই দিতে হচ্ছে। সেইসঙ্গে বিদ্যুৎ, টেলিফোন বিলসহ আনুষঙ্গিক খরচ তো আছেই। এতে ব্যবসায় চরম আর্থিক লোকসান দেখা দিয়েছে। এভাবে চলতে থাকলে ব্যবসায়ীদের পথে বসতে হবে বলে তিনি জানান।

এসএ পরিবহনের রাজশাহী শাখার এক কর্মকর্তা বলেন, অবরোধে পরিবহন বন্ধ থাকায় ব্যবসায়িক কার্যক্রম স্থবির হয়েছে পড়েছে। লেনদেন নেই বললেই চলে। অফিসে শুধু শুধু অলস সময় কেটে যাচ্ছে।

বাগমারা উপজেলার সাথী পোল্ট্রি অ্যান্ড ফিস ফিডসের স্বত্বাধিকারী আবু তালেব জানান, প্রায় এক মাস থেকে কোনো প্রকার মালামাল আনতে না পারায় কয়েকটি পোল্ট্রি ফার্মে বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। মাছ ও মুরগির খাদ্য সংকটে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন মাছচাষি ও পোল্ট্রি ব্যবসায়ীরা।

চারঘাট উপজেলার কাঁকড়ামারী বাজারের চাল বিক্রেতা মুজিবর রহমান বলেন, অবরোধে মোকাম থেকে চাল আনতে না পারায় চরম লোকসান গুণতে হচ্ছে। সপ্তাহে শুক্রবার অবরোধ না থাকলেও মাত্র একদিনের মধ্যে মোকাম থেকে পণ্য কিনে আনা সম্ভব হচ্ছে না। তাছাড়া কোনো যানবাহনের চালকই দূর থেকে পণ্য আনতে রাজি হচ্ছে না। আবার রাজি হলেও ভাড়া চাইছে কয়েক গুণ বেশি। আর বেশি খরচ দিয়ে চাল এনে বিক্রি করতে চরম বেগ পেতে হচ্ছে।

মোহনপুর উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে বাঁশ থেকে তৈরি করা হয় নানা ধরনের গৃহস্থালির কাজে ব্যবহৃত পণ্য। শিল্পীদের হাতে বানানো সরপোশ, টাপা, ধামা, কাঠা, ডালি, চাটা, মালয়, পলয়, কুলাসহ বিভিন্ন পণ্য অধিক আমদানি হলেও নেই বেচাকেনা। উপজেলার বাকশৈল গ্রামের কুটিরশিল্পী ইসমাইল হোসেন জানান, এসব পণ্য তৈরি করে সামান্য টাকা আয় হয়। যা দিয়ে কোনো মতে সংসার যাপন করে থাকি। প্রতিসপ্তায় পাঁচ শ টাকার পণ্য বাজারজাত করি। বর্তমানে এক হাটের পণ্য তার পরের হাটেও বিক্রি করতে পারছি না। অবরোধের কারণে হাটে পাইকারি ব্যবসায়ী আসতে না পারায় এমন অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে বলে তিনি জানান।

বাস শ্রমিক আলম বলেন, টানা মাসব্যাপী অবরোধে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হচ্ছে আমাদের বাস-ট্রাক শ্রমিকরা। প্রায় এক মাস থেকে আমাদের কোনো আয় নেই। আমরা দিনে আনি দিনে খাই। কাজ না থাকায় ঋণ করে সংসার চালাতে হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে আমরা সর্বস্বান্ত হয়ে যাবো।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন ফেডারেশনের রাজশাহী বিভাগীয় সভাপতি কামাল হোসেন রবি বলেন, অবরোধে ব্যবসা-বাণিজ্য কিছুটা স্বাভাবিক হলেও যানবাহন চলাচল একদম বন্ধ রয়েছে। এতে করে এই অঞ্চলের লক্ষাধিক পরিবহন শ্রমিক এখন মানবেতর জীবনযাপন করছেন। শ্রমিকদের পাশাপাশি গাড়ির মালিকরাও বিপদে রয়েছেন বলে তিনি জানান।

রাজশাহী চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি আবু বাক্কার আলী বলেন, হরতাল-অবরোধে এ অঞ্চলের ব্যবসায়ীরা মারত্মকভাবে আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে দেশে অর্থনৈতিক গতি ব্যাহত হবে। আমরা হরতাল-অবরোধের বিকল্প কোনো কর্মসূচি রাজনৈতিক দলগুলোর কাছ থেকে প্রত্যাশা করি।

এআর

এই বিভাগের আরো সংবাদ