জয়িতা পুরস্কার পাচ্ছেন দুই আদিবাসী নারী

রাজশাহী

logo-rajshaiরাজশাহী বিভাগে জয়িতা অন্বেষণে নির্বাচিত হয়েছেন যাচিন্তা মুরমু ও পুষ্পরানী রায়। শিক্ষাক্ষেত্রে সাফল্য ও সমাজ উন্নয়নে অবদান রাখার জন্য তারা ‘২০১৩ সালের বিভাগীয় পর্যায়ে জয়িতা অন্বেষণে বাংলাদেশ’ পুরস্কারের জন্য মনোনীত হয়েছেন।

আগামি ২৪ ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে এই দুই নারীর হাতে এ পুরস্কার তুলে দেওয়া হবে।

জানা গেছে, হতদরিদ্র আদিবাসী পরিবারে জন্ম নেওয়া যাচিন্তা মুরমু নিজকে বদলে দিতে লেখাপড়ার পাশাপাশি কঠোর পরিশ্রম শুরু করেন। কৃষি শ্রমিক হিসেবে কাজ করার পাশাপাশি চালক হিসেবে পাওয়ার ট্রিলার চালিয়ে প্রতিদিন ২০০ টাকা আয় করেন। লেখাপড়া ও সংসারের খরচ মিটিয়ে কিছু টাকা সঞ্চয় করেন তিনি। সঞ্চয়কৃত টাকা দিয়ে পরিবারের সদস্যদের চিকিৎসাসহ আনুষঙ্গিক খাতে ব্যয় করেন। যাচিন্তা মুরমু ১৯৯৫ সালে এসএসসি এবং ১৯৯৮ সালে এইচএসসি পাস করার পর সমাজের অসহায় নারীদের নিয়ে কাজ শুরু করেন।

২০০২ সালে মোহনপুর ইউনিয়ন পরিষদে সংরক্ষিত সদস্য নির্বাচিত হন তিনি। সংরক্ষিত সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তিনি একটি বেসরকারি স্কুলে শিক্ষকতা শুরু করেন। ২০০৬ সালে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক পদে চাকরি শুরু করেন। ওই বছরে চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর উপজেলার রাঙ্গামাটি গ্রামের বার্নাবাস হেমরমের ছেলে প্রদীপ হেমরমের সঙ্গে বিয়ের বন্ধনে আবদ্ধ হন। বর্তমানে তিনি রাঙ্গামাটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক হিসেবে কর্মরত আছেন। তিনি এই এলাকার অসহায় নারীদের সহায়তা করার পাশাপাশি শিশুদের শিক্ষা গ্রহণে সহযোগিতা করছেন।

বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা জানান, যাচিন্তা মুরমু স্কুলের পরিচ্ছন্নতার কাজ নিজেই করে থাকেন। তার ছোট ভাই আলবেনুর মুরমু রাজশাহী বরেন্দ্র কলেজে এইচএসসিতে অধ্যয়নরত। ছোট ভাইয়ের লেখাপড়ার খরচও যোগান দেন তিনি। তার একটাই স্বপ্ন, পিছিয়ে পড়া আদিবাসীদের লেখাপড়া শিখিয়ে সমাজে প্রতিষ্ঠিত করা।

এদিকে পুষ্পরানী রায় তৃতীয় শ্রেণিতে লেখাপড়া অবস্থায় অভাব-অনটনের কারণে স্কুল যাওয়া বন্ধ করে কৃষি শ্রমিক হিসেবে অন্যের জমিতে কাজ শুরু করেন। দিনমজুরের কাজ করে যে টাকা আয় করে তা দিয়ে নিজের সংসার চালানোর পাশাপাশি সমাজের অসহায় মানুষদের সহায়তা করেন। তার একমাত্র সম্বল ৪ কাঠা জমিতে একটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছেন। বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের আর্থিক সহায়তায় এ স্কুলে আদিবাসী শিশুদেরকে বিনামূল্যে বই ও পাঠদান করা হচ্ছে। অবসর সময়ে তিনি সরকারি রাস্তার ধারে ২ হাজার ৫০০টি বিভিন্ন ফলজ ও বনজ গাছ লাগিয়ে পরিবেশ রক্ষার কাজ করছেন দীর্ঘদিন ধরে।

পুষ্পরানী জানান, আদিবাসী পরিবারের শিশুরা অর্থাভাবে স্কুলে যাওয়ার পরিবর্তে কৃষি জমিতে কাজ করে থাকে। এসব শিশুদের লেখাপড়ার সুযোগ করে দিতেই তিনি স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছেন। তার স্কুলের শিক্ষার্থীরা লেখাপড়া করে সমাজে প্রতিষ্ঠিত হবে এমন স্বপ্ন দেখেন পুষ্পরানী।

এদিকে, উপজেলার বাসুদেবপুর ইউনিয়নের ডোমকুলী গ্রামের আবদুর রহিমের স্ত্রী জান্নাতুন ফেরদৌস দরিদ্রতার বিরুদ্ধে লড়াই করে আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী, কাশিমপুর গ্রামের আক্কেল আলীর স্ত্রী মনোয়ারা বেগম ছেলেমেয়েদেরকে শিক্ষিত করে সফল জননী এবং গোগ্রাম ইউনিয়নের সেতাব উদ্দীনের মেয়ে নাদিরা খাতুন নির্যাতনের বিভীষিকা মুছে ফেলে নতুন উদ্যমে জীবন শুরু করায় উপজেলা পর্যায়ে জয়িতা অন্বেষণে বাংলাদেশ পুরস্কার দেওয়া হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে গোদাগাড়ী উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা শিমুল বিল্লাহ সুলতানা বলেন, পিছিয়েপড়া নারীদের এগিয়ে নিতেই সফল নারীদের সরকার বেগম রোকেয়া দিবস উপলক্ষে এ ধরনের পুরস্কার দেওয়া হচ্ছে। পুরস্কারপ্রাপ্ত সফল নারীদের দেখে অন্য নারীরাও নিজ নিজ ক্ষেত্রে কাজ করে সফল হবেন এমনটাই আশা করেন তিনি।

কেএফ/এআর