অগ্রণী ব্যাংকে অভিনব লুটপাট

রফতানি বিল নিয়ে অভিনব জালিয়াতির ঘটনা ঘটেছে রাষ্ট্রীয় মালিকানার অগ্রণী ব্যাংকে। ম্যাগপাই নিটওয়্যার নামে একটি প্রতিষ্ঠানকে ১৪টি রফতানি বিল ২৮ বার দিয়েছে এই ব্যাংক। এক্ষেত্রে ৩৭ কোটি টাকার বিলের বিপরীতে পরিশোধ করা হয়েছে প্রায় ৭৫ কোটি টাকা। আর এই প্রক্রিয়ায় ব্যাংকটির প্রধান শাখা থেকে ৩৮ কোটি টাকা বের করে নেয়া হয়েছে। ব্যাংকের অসাধু কর্মকর্তা ও কোম্পানির যোগসাজশেই ঘটেছে এমন বড় জোচ্চুরি।

অগ্রণী ব্যাংকেরই অভ্যন্তরীন নিরীক্ষায় প্রতিবেদনে এই জালিয়াতির বিষয়টি ধরা পড়েছে। দেড় বছর আগের এই টাকার মধ্যে এক টাকাও উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। এ ধরনের জালিয়াতির ঘটনায় ব্যাংকের কর্মকর্তারাই অবাক। ঘটনাটি নিয়ে ব্যাংকটির ভেতরে এখন তোলপাড় চলছে।

পরিস্থিতি সামাল দিতে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ বলছে, ভুলবশত এটি করা হয়েছে। ইতিমধ্যে গ্রাহকের নামে ফোর্সড লোন (বাধ্যতামূলক ঋণ) সৃষ্টি করে তা সমন্বয় করা হয়েছে। ব্যাংকিং খাতে এ ধরনের ফোসড লোনের কোনো নিয়মও নেই এবং রেকর্ডও নেই। অর্থনীতিবিদর বলছেন, সুক্ষ পরিকল্পনায় এই জালিয়াতি। ব্যাংকের কর্মকর্তারা এই টাকার ভাগ পেয়েছেন। বাংলাদেশ ব্যাংক এবং দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নিতে হবে।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ বলেন, এটা কোনো ভুল নয়; সম্পূর্ণ ইচ্ছাকৃত এবং দণ্ডনীয় অপরাধ করা হয়েছে। এ বিষয়গুলো বাংলাদেশ ব্যাংকের কঠোর দৃষ্টিতে দেখা উচিত।

জানতে চাইলে ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মোহাম্মদ শামস উল ইসলাম অর্থসূচককে বলেন, ব্যাংকে এক কোটি গ্রাহক। আমি সবার খবর বলতে পারবো না। সংশ্লিষ্ট শাখার জিএম এ ব্যাপারে বিস্তারিত জানাতে পারবে। তিনি শাখার দায়িত্বপ্রাপ্ত জিএম  মোজাম্মেল হোসেনকে ফোনে ধরিয়ে দেন।

মোজাম্মেল হোসেন অর্থসূচককে বলেন, ম্যাগপাই গ্রুপের কিছু বিল ডুপ্লিকেশন (দ্বিতীয়বার) হয়েছে। এটা ইচ্ছাকৃতভাবে হয়নি। অনিচ্ছাকৃত ভুল। তবে ফোর্সড লোন হয়নি। কারণ রফতানি বিলে ফোসর্ড লোনের কোনো বিধান নেই। তিনি বলেন, কাগজপত্র সব ঠিক করা হয়েছে। তিনি রিপোর্ট না করে পরদিন তার অফিসে গিয়ে নথিপত্র দেখে বিষয়টি বুঝতে রিপোর্টারকে অনুরোধ জানান।

উল্লেখ, অগ্রণী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের গ্রাহক পোশাকখাতের প্রতিষ্ঠান মেসার্স ম্যাগপাই নিটওয়্যার লিমিটেড। এই কোম্পানির রফতানি বিল নিয়ে ব্যাংকের ভেতরে এখন তোলপাড় চলছে। ব্যাংকের নিজস্ব তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ম্যাগপাই নিটওয়্যারের ১৪টি রফতানি বিল বিভিন্ন তারিখে ২ বার করে মোট ২৮ বার দিয়েছে অগ্রণী ব্যাংক। ২০১৮ সালের ১২ সেপ্টেম্বর প্রথম রফতানি বিলটির জন্য পরিশোধ করা হয় ৪৬ লাখ ৫৮ হাজার টাকা। এর ১ বছর ২ মাস পর ২০১৯ সালের ৭ নভেম্বর ওই বিলের টাকা আবার পাঠানো হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্বিতীয়বার পাঠানো টাকাটা ব্যাংক কর্মকর্তাদের সুস্পষ্ট জালিয়াতি। কারণ কিসের ভিত্তিতে এই টাকা পাঠানো হলো, তা পরিস্কার নয়। প্রতিষ্ঠানটির দ্বিতীয় রফতানি বিল ছিল ২ কোটি ৭৬ লাখ ৬ হাজার টাকা। ২০১৮ সালের ২২ অক্টোবর এটি পরিশোধ করা হয়েছে। ২০১৯ সালের ৭ নভেম্বর একই পরিমাণ টাকা কোম্পানির একাউন্টে পাঠানো হয়। তৃতীয় বিলের ৩ কোটি ২১ লাখ ৯৬ হাজার টাকা। ২০১৮ সালের ২৪ ডিসেম্বর এবং ২০১৯ সালের ৭ নভেম্বর দুই দফায় পাঠানো হয় টাকা। একইভাবে ২০১৮ সালের ৫ নভেম্বর ১ কোটি ১৫ লাখ ১০ হাজার ৪৩৪ টাকার রফতানি বিল জমা হলেও একই বিলের সমপরিমাণ অর্থ দ্বিতীয়বারের মতো গ্রাহকের হিসাবে জমা করা হয় ২০১৯ সালের ৭ নভেম্বর। ৫ম বিল হিসেবে ২ কোটি ১৯ লাখ ৬৯ হাজার টাকা ২০১৮ সালের ২২ নভেম্বর গ্রাহকের হিসাবে জমা হয়। তবে এবার তারিখ কিছুটা পিছিয়ে ২০১৯ সালের ১৭ নভেম্বর গ্রাহকের হিসাবে পাঠানো হয় সমপরিমাণ টাকা। ৬ষ্ঠ বিলটি পরিশোধ করা হয় ২০১৮ সালের ৩০ অক্টোবর। যার পরিমাণ ৩ কোটি ৩৬ লাখ ৯২ হাজার ১৭ টাকা। তবে দ্বিতীয়বার একই বিলের সমপরিমাণ অর্থ পাঠানো হয় ২০১৯ সালের ১৫ ডিসেম্বর। বিলগুলো ব্যাংকের ফরেন কারেন্সি অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট ডিভিশন (এফসিএমডি) কর্তৃক সমন্বয় করা হয়েছে ২০১৯ সালের ২৪ ডিসেম্বর।

প্রতিবেদনে আরও দেখা যায়, ৭ম বিলের বিপরীতে ৩ কোটি ২৪ লাখ ১০ হাজার ৮১৯ টাকা দুই বার গ্রাহকের হিসাবে পাঠিয়েছে অগ্রণী ব্যাংক। এর মধ্যে প্রথম তারিখটি হলো ২০১৯ সালের ১৯ জানুয়ারি এবং দি—তীয়টি পাঠানো হয় একই বছরের ১৫ ডিসেম্বর। ৮ম বিলের ৩ কোটি ৭৪ লাখ ৯৭ হাজার ৩৪৪ টাকা গ্রাহককে পাঠানো হয় ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের ২৭ তারিখ। দ্বিতীয়বারে বিলটির সমপরিমাণ অর্থ একই বছরের ১৫ ডিসেম্বর গ্রাহকের হিসাবে পাঠায় ব্যাংক। ৭ম ও ৮ম বিল দু’টি সমন্বয় করা হয় ২০২০ সালের ৫ জানুয়ারি। নবম বিল হিসেবে ২০১৯ সালের মার্চ মাসের ২৮ তারিখ ২ কোটি ৬৮ লাখ ৩৬ হাজার ৯৮৪ টাকা পাঠানো হয় ম্যাগপাই নিটওয়্যারের হিসাবে। তবে একই বিলের জন্য পাঠানো অনিয়মের টাকাটি পাঠানো হয়েছে একই বছরের ১৫ ডিসেম্বর। ১০ নম্বর বিলের বিপরীতে ৩ কোটি ৩৭ লাখ ১৫ হাজার ৫৩১ টাকা পরিশোধ করা হয় ২০১৯ সালের ১৮ মার্চ। সমপরিমাণ টাকা আবারও পাঠানো হয়েছে একই বছরের ১৫ ডিসেম্বর। নবম এবং দশম বিলটি ২০১৯ সালের ২৪ ডিসেম্বর সমন্বয় করে অগ্রণী ব্যাংকের ফরেন কারেন্সি বিভাগ। ১১ নম্বর রফতানি বিলের মূল্য ছিল ১ কোটি ৫৪ লাখ ১৩ হাজার ৪৩০ টাকা। স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় টাকাটি গ্রাহকের হিসাবে পাঠানো হয় ২০১৯ সালের ২২ মে। তবে অস্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় টাকাটি আবারও গ্রাহকের হিসাবে ১৫ ডিসেম্বর পাঠিয়েছে ব্যাংক। ব্যাংকের এফসিএমডি কর্তৃক বিলটি সমন্বয় করা হয় ২০২০ সালের ৫ জানুয়ারি। ১৪টি বিলের মধ্যে এখনও পর্যন্ত অসমন্বিত (১২, ১৩) রয়েছে দুইটি বিল। এর মধ্যে প্রথম বিলের ২ কোটি ৭৭ লাখ ৯৪ হাজার ১১৩ টাকা পরিশোধ করা হয় ২০১৯ সালের ৩০ মার্চ। দ্বিতীয়বার সমপরিমাণ টাকা গ্রাহকের হিসাবে পাঠানো হয় ৩০ ডিসেম্বর। অসমন্বিত দ্বিতীয় বা ১৩ নম্বর বিলের ৩ কোটি ৩৪ লাখ ৮২ হাজার ৬৬২ টাকা পরিশোধ করা হয় ২০১৮ সালের ৫ ডিসেম্বর। একই বিলের সমপরিমাণ টাকা আবারও ২০১৯ সালের ৩০ ডিসেম্বর গ্রাহকের হিসাবে পাঠায় অগ্রণী ব্যাংক। সর্বশেষ এবং ১৪ নম্বর বিলের বিপরীতে ৩ কোটি ৪০ লাখ ৮২ হাজার ৪৪০ টাকা ২০১৯ সালের ২৩ মার্চ গ্রাহকের হিসাবে পাঠানো হয়। সমপরিমাণ টাকা আবারও ৩০ ডিসেম্বর পাঠানো হয়েছে গ্রাহক বরাবর।

ব্যাংকের ফরেন কারেন্সি বিভাগ টাকাটি সমন্বয় করে ২০২০ সালের ৫ জানুয়ারি। অগ্রণী ব্যাংকের যে বিভাগে বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন সম্পন্ন হয় তার নাম ফরেন কারেন্সি অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট ডিভিশন (এফসিএমডি)। রফতানি বিলের সব টাকা এসে জমা হয় এই বিভাগে। স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় গ্রাহকের রফতানির টাকা পরিশোধের জন্য ব্যাংকের বিভিন্ন শাখা এমওডিএ বা ডেবিট অ্যাকাউন্ট তৈরি করে এফসিএমডিতে জমা দেয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে শাখা বরাবর টাকা পাঠায় সংশ্লিষ্ট বিভাগটি। সেই টাকা আবার গ্রাহকের অ্যাকাউন্টে পাঠিয়ে দেয় শাখা। কিন্তু একই বিলের বিপরীতে সমপরিমাণ টাকা দ্বিতীয়বার পাঠানোর কোনো নিয়ম বাংলাদেশে নেই।

তদন্ত চলাকালীন সময়ে প্রধান শাখা বরাবর প্রয়োজনীয় নথিপত্র সরবরাহ করার জন্য বিভিন্ন সময়ে মৌখিক এবং তিনবার লিখিতভাবে অনুরোধ করা সত্ত্বেও তা সরবরাহ করা হয়নি। যে সব নথিপত্র, ভাউচার, রিয়েলাইজেশন সিট, সুইফট কপিসহ বিভিন্ন কাগজ সরবরাহ করা হয়েছে তার অধিকাংশই স্বাক্ষরবিহীন এবং ডুপ্লিকেট (নকল)।