মালয়েশিয়া থেকে দেশে ফিরে যা বললেন রায়হান

দেশে ফিরেছেন মালয়েশিয়া প্রবাসী রায়হান কবির। মালয়েশিয়ায় নির্যাতন নিয়ে কাতার ভিত্তিক আল-জাজিরা টেলিভিশনে সাক্ষাৎকার দেওয়ার কারণে দেশটির পুলিশের হাতে আটক হয়েছিলেন তিনি। শুক্রবার (২১ আগস্ট) দিবাগত রাত ১টার দিকে মালয়েশিয়ান এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে ঢাকায় ফিরেছেন রায়হান।

মালয়েশিয়া থেকে দেশে পরিবারের কাছে ফিরে একটি বেসরকারি টেলিভিশনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে রায়হান কবির জানান, মালয়েশিয়ায় পুলিশের রিমান্ডে ২৭ দিন একই জামাকাপড়ে কেটেছে তার। হাতকড়া পরিয়েই পুলিশ তাকে মালয়েশিয়ার বিমানবন্দরে ইমিগ্রেশন অতিক্রম করায়। এ সময় এক বাঙালি একটা শার্ট এনে দিলে গায়ের ময়লা জামাটি পরিবর্তন করে নেন তিনি। মালয়েশিয়ায় পুলিশ তার সঙ্গে ভালো আচরণ করলেও দিনগুলো কেটেছে মানসিক চাপের মধ্যে। তবে তাকে যে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হচ্ছে, বিমানবন্দরে আসার আগ পর্যন্ত জানতেন না রায়হান।

রায়হান জানিয়েছেন, আলজাজিরার সাক্ষাৎকারে মালয়েশিয়া সরকারের বিরুদ্ধে তিনি কিছুই বলেননি। শুধু প্রবাসীদের দুঃখ, কষ্ট ও সমস্যার কথা তুলে ধরেছিলেন।

রায়হান বলেন, আপনারা সবাই দেখেছেন, আমি আলজাজিরায় কী বলেছি। বলার মতো তেমন কিছুই বলিনি। শুধু প্রবাসীদের ওপর, আমার দেশের মানুষের ওপর, যেকোনো দেশের মাইগ্রেন্ট ওয়ার্কারদের প্রতি যে অন্যায় হয়েছে, শুধু সে বিষয়ে বলেছি। হিউম্যান রাইটস বলতে যে ব্যাপারটি আছে, মানুষের সঙ্গে যেভাবে আচরণ করা উচিত, সে ব্যাপারে একজন শিক্ষিত মানুষ হিসেবে আমি আমার মতামত দিয়েছি।

এ ব্যাপারে রায়হান আরো বলেন, আমি তোমার দেশে (মালয়েশিয়া) কাজ করতে যাই, এর মানে এই নয়, আমি তোমার দেশের গোলাম। তুমি আমার দেশে আসতে পারো, আমি তোমার দেশে যেতে পারি। এটা গিভ অ্যান্ড টেক পলিসি। একুশ শতকে এসে কেউ বলবে না, আমি ওই দেশে কাজ করতে যাই। তার আমাকে প্রয়োজন। সে আমার মেধা, আমার শ্রম কিনে নিচ্ছে এবং এর বিনিময়ে আমি তার কাছ থেকে অর্থ পাচ্ছি। তাই মানুষ হিসেবে সবার প্রতি শ্রদ্ধা থাকা উচিত। যে বিষয়গুলো আমার কাছে খারাপ লেগেছে, আমি অতটুকই তুলে ধরেছি।

মালয়েশিয়ার পুলিশ ভালো আচরণ করেছে উল্লেখ করে রায়হান কবির বলেন, পুলিশ আমার প্রতি সদয় ছিল। পুলিশ জানত আমি নির্দোষ। জানত যে, এটা কোনো ক্রিমিনাল অফেন্স নয়। তাই পুলিশও আমার প্রতি সদয় ছিল। তারা আমার সঙ্গে খুব সুন্দর ব্যবহার করেছে।

রায়হান আরো বলেন, আমার ভিডিওবার্তা দেওয়ার পেছনে কোনো স্বার্থ লুকায়িত আছে কিনা, পলিটিকাল ইনফ্লুয়েন্স আছে কিনা, তারা এটাই তদন্ত করার চেষ্টা করেছে। যেহেতু তারা কিছু খুঁজে পায়নি, তাই আমার বিরুদ্ধে চার্জ গঠন করতে পারেনি। শুধু তদন্ত করার জন্য তারা আমাকে গ্রেপ্তার করে।

বাংলাদেশের জনগণসহ যারা পাশে ছিল, সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন রায়হান। তিনি বলেন, আমি প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানাতে চাই। বিশেষ করে ধন্যবাদ জানাতে চাই বাংলাদেশের জনগণকে, যারা আমার পাশে ছিল। এ ছাড়া পুরো বিশ্ব আমার পাশে ছিল, সব প্রবাসী পাশে ছিল। এ ছাড়া বিভিন্ন আইনজীবী, আন্তর্জাতিক মিডিয়া, এনজিও—এমন কোনো এনজিও নাই যে, এ ক্ষেত্রে আমার পাশে দাঁড়ায়নি। সবাই প্রচণ্ড পরিমাণে আমাকে সাপোর্ট দিয়েছে, ওই দেশের মানুষও, বাংলাদেশের মানুষও। সবার প্রতিই আমি কৃতজ্ঞ।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা জানতে চাইলে রায়হান বলেন, আপাতত মানসিক শান্তি প্রয়োজন। এখন কিছু ভাবছি না। পরে চিন্তা করব, কী করা যায়। যোগ্যতা আছে, মেধা আছে, কিছু একটা হয়ে যাবে।

এদিকে, কয়েক দিন পর সংবাদ সম্মেলন করে মালয়েশিয়ায় প্রবাসীদের বাস্তব জীবন এবং নিজের রিমান্ডের বিষয়ে কথা বলার ইচ্ছে প্রকাশ করেছেন রায়হান কবির।

প্রসঙ্গত, গত ৩ জুলাই ‘লকডআপ ইন মালয়েশিয়ান লকডাউন-১০১ ইস্ট’ শীর্ষক একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করে আল-জাজিরা টেলিভিশন। এতে দেখানো হয়, মালয়েশিয়া সরকার মুভমেন্ট কন্ট্রোল অর্ডার (এমসিও)-এর মাধ্যমে মহামারির সময়ে অভিবাসীদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ করছে। সেখানে রায়হান কবিরের একটি সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়। এরপর সে দেশের অভিবাসন বিভাগ রায়হানকে খুঁজতে থাকে। ছবি প্রকাশ করে রায়হানের বিষয়ে তথ্য জানানোর অনুরোধ করে তারা। এছাড়া প্রতিবেদনের সঙ্গে আল-জাজিরার সংশ্লিষ্ট কয়েকজনকেও জিজ্ঞাসাবাদ করে তারা। এরপর ২৪ জুলাই রায়হান কবিরকে আটক করে দেশটির পুলিশ।

অর্থসূচক/কেএসআর