পাত্তাই পেল না বার্সা, সেমিফাইনালে বায়ার্ন

ইতিহাসের পাতা আতিপাতি করে খুঁজেও এতটা বাজে পাওয়া গেলো না বার্সেলোনাকে। দলটির অভ্যন্তরে যে কি চলছে, সেটা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলো বার্সেলোনা। অগোছালো মেসিদের নিয়ে স্রেফ ছেলেখেলা করল বায়ার্ন মিউনিখ। পর্তুগালের রাজধানী লিসবনে অনুষ্ঠিত তৃতীয় কোয়ার্টার ফাইনালে মেসিদের জালে গুনে গুনে আটবার বল জড়ালো জার্মান জায়ান্টররা। এছাড়া নিজেদের জালে নিজেরাই জড়িয়েছে একবার।

বার্সাকে ৮-২ গোলে হারিয়েছে বায়ার্ন। জার্মান ক্লাবটির হয়ে জোড়া গোল করেছেন টমাস মুলার ও ফিলিপে কৌতিনহো। আর একটি করে গোল করেছেন ইভান পেরিসিচ, সার্জি জিনাব্রি, জশুয়া কিমিচ ও রবার্ট লেভান্ডভস্কি।

শুক্রবার (১৪ আগস্ট) দিনগত রাতে পর্তুগালের এস্তাদিও দো স্পোর্ট লিসবোন স্টেডিয়ামে বার্সার জন্য দিনটা ছিলো দুঃস্বপ্নের। জার্মান চ্যাম্পিয়নদের কাছে রীতিমতো পাড়ার ক্লাবে পরিণত হয়ে যায় স্প্যানিশ জায়ান্টরা। বায়ার্নের গতি আর কৌশলের কাছে অসহায় ছিলো বার্সা। লিওনেল মেসি ছিলেন তার নিজের ছায়া হয়ে। দাঁড়িয়ে থেকে শুধু দেখেছেন দলের ডিফেন্সের করুণ পরিনতি।

পর্তুগালের ম্যাচের শুরুটা হয়েছিলো দুর্দান্ত। চার মিনিটের মাথায় এগিয়ে যায় বায়ার্ন। লেভানডস্কির কাছ থেকে পাওয়া বল মুলারের বাম পায়ের শট বার্সা গোলরক্ষক টার স্টেগানকে পরাস্ত করলে ১-০ গোলে এগিয়ে যায় জার্মান পাওয়ার হাউজ।

তবে এই লিড বেশিক্ষণ স্থাযী হয় নি। ম্যাচের সপ্তম মিনিটেই সমতায় ফেরে স্প্যানিশ জায়ান্টরা। তবে এতে বায়ার্নের অবদান বেশি। বার্সার আক্রমণ রুখতে গিয়ে নিজেদের জালেই বল পাঠান বায়ার্নের দাভিদ আলাভা। আত্মঘাতী গোলে বার্সা ১-১ সমতায় ফেরে।
ম্যাচের নবম মিনিটে লুইজ সুয়ারেজ গোলের সুযোগ নষ্ট না করলে বার্সা এগিয়ে যেতে পারতো। পরে মিনিটেই বার্সার আরও একটি আক্রমণ বিফলে যায়। বল গোলবারে লেগে ফিরে আসে।

তবে এরপর পর ম্যাচের চিত্রটা পাল্টে যায় মুহূর্তেই। বায়ার্নের গতিময় ফুটবলের কাছে বার্সার রক্ষণ হয়ে যায় পাড়ার ফুটবলের মতো। ২১-৩১ এই ১০ মিনিটের ঝড়েই নষ্ট হয়ে যায় বার্সার সেমিফাইনালের স্বপ্ন।

২১ মিনিটে জিনাব্রির কাছ থেকে পেনাল্টি বক্সের বাম দিকে বল পেয়ে যান পেরিসিচ। বাম পায়ের জোড়ালো শটে বল জালে পাঠান এই ক্রোয়েশিয়ার অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার। ২-১ গোলে এগিয়ে যায় বায়ার্ন।

২৪ মিনিটে ব্যবধান বাড়ানোর সুযোগ পেয়েছিলো বায়ার্ন। বার্সা গোলরক্ষক স্টেগানের কল্যাণে রক্ষা পায় বার্সা। ২৬ মিনিটে আরও একটি সহজ গোলের সুযোগ হাতছাড়া করেন লেভানদস্কি। বার্সার রক্ষণের ভুলে পেনাল্টি বক্সের ভেতরে বল পেয়ে যান এই পোলিশ স্ট্রাইকার। তার বাম পায়ের নেওয়া শটটি কর্নারের বিনিময়ে রক্ষা করেন স্টেগান।

২৭ মিনিটে আর ভুল করেননি জিনাব্রি। পেনাল্টি বক্সের ডান দিকে থেকে গোরেস্কার বাড়ানো বল খীপ্র গতিতে বার্সা ডিফেন্ডারকে ফাঁকি দিয়ে ডান পায়ের টোকায় বল জালে পাঠান তিনি। ৩-১ গোলের লিড পায় জার্মান চ্যাম্পিয়নরা।

বায়ার্নের চতুর্থ সাফল্য আসে ৩১ মিনিটে। কিমিচের কাছ থেকে বল পেয়ে পেনাল্টি বক্সে খানিক ভেতর থেকে ডান পারেয় শটে বল জালে জড়ান মুলার। প্রধমার্ধেই ৪-১ গোলে এগিয়ে যায় বায়ার্ন মিউনিখ।

বিরতির পর আক্রমণের ধার বাড়াতে গ্রিজম্যানকে মাঠে নামান বার্সা কোচ সেতিয়েন। তবে ৫০ মিনিটে জালে ঠিকানা খুজে পেয়েছিল লেভানদস্কি। তবে অফ-সাইডের কারণে গোলটি বাতিল করা হয়।

৫৭ মিনিটে ব্যবধান কমায় বার্সা। জর্দি আলবার কাছ থেকে বল পেয়ে একক প্রচেষ্টা দারুণ এক গোল করেন সুয়ারেজ। ব্যবধান দাড়ায় ৪-২ গোলের।

তবে এরপর বার্সার ডিফেন্সকে নিয়ে রীতিমতো ছেলেখেলা শুরু করে দেয় বায়ার্ন। ৬৩ মিনিটে আলফোনসোর কাছ থেকে বল পেয়ে গোল করেন কিমিচ। স্কোর লাইন হয় ৫-২।

পাঁচ গোল খেয়ে বার্সার ডিফেন্স হয়ে যায় নড়বড়ে। একের পর এক আক্রমণ চালাতে থাকে জার্মান ক্লাবটি। ৮২ মিনিটে কৌতিনহোর ক্রস থেকে হেড দিয়ে গোল করেন লেভানদস্কি। ৬-২ গোলে এগিয়ে বায়ার্ন। বায়ার্নের হয়ে এটি লেভানদস্কির ৫০তম চ্যাম্পিয়নস লিগ গোল।

ম্যাচের পরের গল্পটা বার্সার জন্য আরও করুণ। দুটি গোল হজম করতে হয় কাতালানদের। গোল দুটি দিয়েছেন বার্সা থেকেই ধার করে বায়ার্নে যোগ দেওয়া বার্সার দল বদলের সবচেয়ে দামি ফুটবলার ফিলিপে কৌতিনহো। তবে গোল দুটি করে উদযাপন করেননি তিনি।

৮৫ মিনিটে মুলারের কাছ থেকে বল পেয়ে বল জালে জড়ান কৌতিনহো। আর ম্যাচের শেষ দিকে ৮৯ মিনিটে কৌতিনহো নিজের দ্বিতীয় গোল করলে ৮-২ গোলের বড় ব্যবধানের জয় নিশ্চিত হয় বায়ার্নের।

ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের সাবেক ডিফেন্ডার রিও ফার্ডিনান্ড বার্সার খেলা দেখে মন্তব্য করলেন, ‘সত্যিকার অর্থেই নৃশংস পরিস্থিতির মুখোমুখি বার্সা, স্ট্রিম রোলার চালানো হলো তাদের ওপর। পুরোপুরি বোকা বানিয়ে ছেড়ে দেয়া হলো তাদের।’

ম্যাচ শেষ হওয়ার আগেই লিওনেল মেসি, লুইস সুয়ারেজদের মুখখানা হয়েছিল দেখার মত। চোখ ফেটে কান্না বেরিয়ে আসবে যেন। আর কোচ কিকে সেতিয়েন তো টেন্টের ওপর দুই হাত ছড়িয়ে দিয়ে উদাস দৃষ্টিতে যেভাবে আকাশের দিকে তাকিয়েছেন, তাতেই নিশ্চিত হওয়া গেছে, ন্যু ক্যাম্পে আর হয়তো ফেরা হবে না তার। এর আগেই বিদায়ের চিঠি হয়তো ধরিয়ে দেয়া হবে।

ম্যাচটিকে সবাই ধরে নিয়েছিল, ফাইনালের আগে আরেক ফাইনাল হিসেবে। বার্সেলোনা এবং বায়ার্ন মিউনিখের খেলা বলে কথা। হাড্ডাহাড্ডি লড়াই তো হবেই!

কিন্তু মাঠের খেলায় বার্সাকে খুঁজে পাওয়াই ছিল কঠিন। লিওনেল মেসিরা মাঠে নেমেছিলেন যেন শুধু বায়ার্নের আক্রমণ ঠেকানোর জন্যই। নিশ্চিত আরও কয়েকটি গোলের সুযোগ মিস না হলে স্কোরলাইন আরও বাজে হতে পারতো। লিখতে হতো হয়তো, বার্সার জালে একের পর এক গোল দিয়েই গেলো বায়ার্ন।

অর্থসূচক/কেএসআর