জবির শিক্ষক নিয়োগ বোর্ডের এক্সপার্ট নিয়োগে স্বজনপ্রীতির অভিযোগ
বৃহস্পতিবার, ১৩ই আগস্ট, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ
today-news
brac-epl
প্রচ্ছদ » App Home Page

জবির শিক্ষক নিয়োগ বোর্ডের এক্সপার্ট নিয়োগে স্বজনপ্রীতির অভিযোগ

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) প্রভাষক নিয়োগ ও পদোন্নতি সংক্রান্ত হাইয়ার বোর্ড ও লোয়ার বোর্ডের এক্সপার্ট নিয়োগে থামছে না অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতি। যার ফলে প্রতিষ্ঠার ১৫ বছরেও শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ বঞ্চিত থাকছেন জবির শিক্ষার্থীরা।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, অধিকাংশ বিভাগে এক্সপার্ট আসেন একটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। এছাড়াও অনেক বিভাগে একই এক্সপার্ট ৮-১০ বছর ধরেও আসছেন। অনেকক্ষেত্রে বিতর্কিত ব্যক্তিদেরও এক্সপার্ট হিসেবে আনা হচ্ছে বছরের পর বছর। এমনকি একই এক্সপার্ট হাইয়ার ও লোয়ার উভয় বোর্ডেই আছেন। ফলস্বরুপ একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাই শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পাচ্ছেন নিয়মিত। এছাড়াও শিক্ষকদের পদন্নোতিতেও স্বজনপ্রীতির সুযোগ থাকছে।

ইউজিসির ২০০৫ গেজেট অনুযায়ী, লোয়ার বোর্ডে এক্সপার্ট নিয়োগের ক্ষেতে সিন্ডিকেট মনোনীত একজন থাকবেন ও উপাচার্য মনোনীত একজন থাকবেন। দুইজন এক্সপার্টের একজন বাইরের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে হবে, তবে অপরজন যেকোনো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে হতে পারে। অর্থাৎ নিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকেও একজন এক্সপার্ট থাকার সুযোগ আছে।

তবে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনিয়র ও অভিজ্ঞ অনেক অধ্যাপক থাকা সত্ত্বেও অজানা কারণেই এক্সপার্ট হিসেবে সুযোগ পান না তারা। এমন অনেক অধ্যাপক আছেন যারা নিয়মিত অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে এক্সপার্ট হিসেবে গেলেও জবির নিয়োগ বোর্ডে তাদের নাম ওঠে না।

অভিযোগ আছে, এক্সপার্ট নিয়োগের ক্ষেত্রে মতামত বা পরামর্শ দূরে থাক জানানোও হয় না অনেক বিভাগের চেয়ারম্যান ও সিনিয়র অধ্যাপকদের, যা তাদের জন্য অপ্রীতিকর। এটি নিয়ে ক্ষোভ তৈরি হচ্ছে সিনিয়র অধ্যাপকদের মধ্যে।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, ২০১৯ সাল পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়েল শিক্ষক সংখ্যা ৬৭১ জন। এদের মধ্যে জবি শিক্ষার্থী আছেন মাত্র ৩৬ জন। যা মোট শিক্ষকের ৫.৩৬ শতাংশ মাত্র। এছাড়াও বর্তমান উপাচার্যের সময়ে চার শতাধিক শিক্ষক নিয়োগ হলেও ২০১৯ সাল পর্যন্ত জবি শিক্ষার্থী নিয়োগ পেয়েছেন মাত্র ৩২ জন।

জানা যায়, ২০১৪, ২০১৫, ২০১৬ ও ২০১৭ সালের জবির ২৮ জন শিক্ষার্থী ‘প্রধানমন্ত্রী স্বর্ণপদক’ পেলেও শুধুমাত্র মার্কেটিং বিভাগের মেহজাবীন আহমেদ ও সমাজবিজ্ঞান বিভাগের মার্জিয়া রহমান বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন। বাকিদের কেউই শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পাননি। এমনও অভিযোগ আছে অন্য বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পেলে জবিতে সুযোগ মেলেনি অনেক শিক্ষার্থীর।

সর্বশেষ বোর্ডের মেয়াদ শেষ হলেও এক্সপার্টদের তথ্য দিতে অস্বীকার করে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার ওহিদুজ্জামান বলেন, এভাবে তথ্য দেওয়া যায় না, এক্সপার্টরা বিব্রত হন। তাদের কাছে অনেকে লবিং-তদবির নিয়ে যেতে পারে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর থেকেই অদৃশ্য কারণে প্রাণীবিদ্যা বিভাগের এক্সপার্ট হিসেবে রয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য আজাদ চৌধুরীর সহধর্মিণী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণীবিদ্যা ব্ভিাগের অধ্যাপক গুলশান আরা। ভূগোল বিভাগে দীর্ঘ সময় ধরে অপরিবর্তিত রয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোলের অধ্যাপক নাসরিন আহম্মেদ ও অধ্যাপক ড. আব্দুল বাকি।

এছাড়াও বাংলায় এক্সপার্ট হিসেবে পরিবর্তিত হয়ে আসেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সৌমিত্র শেখর, অধ্যাপক বিশ্বজিৎ ঘোষ ও অধ্যাপক সৈয়দ আজিজুল হক। পরিসংখ্যান বিভাগেও পরিবর্তিত হয়ে আসেন, অধ্যাপক ড. নিতাই চক্রবর্তী, অধ্যাপক ড. নুরুল ইসলাম, অধ্যাপক ড. সেকেন্দার হায়াত খান।

রসায়ন বিভাগে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর থেকেই এক্সপার্ট হিসেবে রয়েছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শরীফ এনামুল কবীর। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে একই শিক্ষককে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগ দেওয়ার পর আবার জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে পুনরায় নিয়োগ দিয়েছেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কামালউদ্দিন যৌন হয়রানির অভিযোগে বাধ্যতামূলক অবসরে যান ২০০৮ সালে। এরূপ অভিযোগের পরও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে এক্সপার্ট হিসেবে আছেন তিনি।

এ বিষয়ে নীল দলের (সনাতন) সভাপতি কাজী সাইফুদ্দিন বলেন, আমাদের কি প্রয়োজন বাইরে থেকে যারা আসেন তারা বোঝেন না। জবিতে প্রায় একশর বেশি অধ্যাপক ও ২৩০ মতো পিএইসডি হোল্ডার আছেন যা অনেক ভার্সিটিতে নাই। আমাদের শিক্ষকরা বোঝেন আমাদের কি লাগবে। যে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এক্সপার্ট আনা হয় তারাতো আমাদের ডাকে না।

নীল দলের (সংস্কারপন্থী) সভাপতি অধ্যাপক ড. জাকারিয়া মিয়া বলেন, আগে না হলেও বর্তমানে কিছু ডিপার্টমেন্টে এক্সপার্ট জবি থেকে নেওয়া হয়েছে। তবে আমরা আশাবাদী ভবিষ্যতে সব ডিপার্টমেন্টে জবির সিনিয়র শিক্ষকদের প্রশাসন রাখবে।

শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ড. নূর আলম আব্দুল্লাহ বলেন, আমরা উপাচার্যের সাথে এ বিষয়ে কথা বলছি, যাতে আমাদের প্রবীণ শিক্ষকদের বেশি বেশি বোর্ডে রাখা যায়। আমরা আশা করছি সামনে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতর থেকে এক্সাপার্ট সংখ্যা বাড়বে।

এ বিষয়ে উপাচার্য অধ্যাপক ড. মীজানুর রহমান বলেন, হায়ার ও লোয়ার দুই বোর্ডেই জবির শিক্ষকরা আছেন। আস্তে আস্তে এক্সপার্টের সংখ্যা বাড়ানো হবে। আগে অধ্যাপকের সংখ্যা কম ছিলো। অধ্যাপকের সংখ্যা বাড়ছে, আস্তে আস্তে দুই বোর্ডেই জবির শিক্ষকদের সংখ্যা বাড়ানো হবে। শিক্ষক হিসেবে আমাদের শিক্ষার্থীদের সংখ্যা বাড়ানো হচ্ছে। ভবিষ্যতে দেখা যাবে জবি শিক্ষার্থীদের বাইরে কাউকে নিয়োগ দেওয়া হবে না।

বিতর্কিতদের বিষয়ে উপাচার্য বলেন, সিন্ডিকেটের কাছে খবর থাকলে নিয়োগ দেওয়া হয় না। চেষ্টা করা হয় যে এমন কেউ যেন না আসেন।

দীর্ঘ সময় একই ব্যক্তি এক্সপার্ট দেওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, এটা সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্ত। সিন্ডিকেট যাকে নির্ভরশীল-যোগ্য মনে করে তাকে রাখে।

অর্থসূচক/এএফ/কেএসআর

এই বিভাগের আরো সংবাদ