করোনার প্রভাবে বাণিজ্য ঘাটতিতেও রেকর্ড

দেশের ইতিহাসে এই প্রথম অর্থনীতির অন্যতম প্রধান দুই সূচক আমদানি ব্যয় ও রপ্তানি আয় দুটোই কমেছে। এর আগের বছরগুলোতে কখনও কখনও রপ্তানি আয় হোঁচট খেলেও আমদানি ব্যয় বরাবরই বেড়েছে। করোনা ভাইরাস মহামারির মধ্যে পণ্য বাণিজ্যে প্রায় ১৮ বিলিয়ন ডলারের ঘাটতি নিয়ে শেষ হয়েছে গত অর্থবছর।

প্রাণঘাতী এই ভাইরাসের প্রভাবে বৈদেশিক বাণিজ্যে বড় ঘাটতি‌তে প‌ড়েছে বাংলাদেশ। সদ্য সমাপ্ত ২০১৯-২০ অর্থবছরের (জুলাই-জুন) বহির্বিশ্বের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়িয়েছে এক হজার ৭৮৬ কো‌টি ১০ লাখ (১৭৮৬১ মিলিয়ন) মার্কিন ডলার; বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ দেড় লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। বাণিজ্য ঘাটতির এ পরিমাণ আগের অর্থবছরের চেয়ে ২০২ কোটি ৬০ লাখ ডলার বা ১২ দশমিক ৭৯ শতাংশ বেশি। ২০১৮-১৯ অর্থবছরের ঘাটতি ছিল এক হাজার ৫৮৩ কোটি ৫০ লাখ ডলার।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রপ্তানি বাণিজ্যে বড় বড় হোঁচট খাওয়ায় বহির্বিশ্বের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি বেড়েছে। চীনের হুবেই প্রদেশে থেকে ছড়িয়ে পড়া প্রাণঘাতি করোনা ভাইরাস বছরের শুরু থেকে ইউরোপ আমেরিকাসহ বিশ্বব্যাপী আঘাত হানে। সৃষ্ট পরিস্থিতিতে অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে পুরো দুনিয়া। বন্ধ হয়ে যায় স্বাভাবিক কার্যক্রম। অচল হয়ে পড়ছে বিশ্ব বাণিজ্য। এতে করে নেতিবাচক ধারায় থাকা দেশের রপ্তানি আয় ফেব্রুয়ারির পর থেকে ব্যাপক হারে কমতে থাকে। অন্যদিকে অর্থনীতির চাঙ্গা রাখার প্রধান সূচক রেমিট্যান্স আয়ও চলতি বছরের মার্চ ও এপ্রিলে অনেক কমে যায়। এসব কারণে বড় বাণিজ্য ঘাটতিতে পড়েছে বাংলাদেশ।

বাংলাদেশ ব্যাংক ২০১৯-২০ অর্থবছরের জুলাই-জুন সময়ের বৈদেশিক লেনদেনে চলতি হিসাবে ভারসাম্যের (ব্যালেন্স অফ পেমেন্ট) এই তথ্য প্রকাশ করেছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনে তথ্য বলছে, ২০১৯-২০ অর্থবছরের ইপিজেডসহ রপ্তানি খাতে বাংলাদেশ আয় করেছে তিন হাজার ২৮৩ কোটি ডলার। এর বিপরীতে আমদানি বাবদ ব্যয় করেছে পাঁচ হাজার ৬৯ কোটি ডলার। সেই হিসেবে অর্থবছর শেষে দেশে বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়িয়েছে এক হাজার ৭৮৬ কোটি ১০ লাখ ডলার। বাংলাদেশি মুদ্রায় (বিনিময় হার ৮৪ টাকা ধরে) ছাড়িয়েছে দেড় লাখ কোটি টাকা। ঘাটতির এ অংক ২০১৮-১৯ অর্থবছরের চেয়ে ১২ দশমিক ৭৯ শতাংশ বেশি।

আলোচিত সময়ে, আমদানি কমেছে ৮ দশমিক ৫৬ শতাংশ। রপ্তানি কমেছে ১৭ দশমিক ১০ শতাংশ। তবে রেমিট্যান্স বেড়েছে ১০ দশমিক ৮৭ শতাংশ। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, গেল অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে বহির্বিশ্বের সঙ্গে বাংলাদেশের চলতি হিসাবে উদ্বৃত্ত থাকলেও গত বছরের সেপ্টেম্বর থেকে তা ঋণাত্মক হয়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, চলতি হিসাবে উদ্বৃত্ত থাকার অর্থ হলো নিয়মিত লেনদেনে দেশকে কোনো ঋণ করতে হচ্ছে না। আর ঘাটতি থাকলে সরকারকে ঋণ নিয়ে তা পূরণ করতে হয়। সেই হিসাবে উন্নয়নশীল দেশের চলতি হিসাবে উদ্বৃত্ত থাকা ভাল। কিন্তু গত কয়েক বছর উদ্বৃত্তের ধারা অব্যাহত থাকলেও গেল অর্থবছরে ঋণাত্মক ধারায় চলে গেছে। অর্থবছর শেষেও এ ধারা অব্যাহত রযেছে।

২০১৯-২০ অর্থবছর শেষে চলতি হিসাবে ৪৮৪ কোটি ৯০ লাখ ডলার ঋণাত্মক হয়েছে। যা আগের অর্থবছরে একই সময়ে ঋণাত্মক ছিল ৫১০ কোটি ২০ লাখ ডলার। তবে চল‌তি অর্থবছ‌রের সা‌র্বিক রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ার কারণে সামগ্রিক লেনদেনে বাংলাদেশের উদ্বৃত্ত দাঁড়িয়েছে ৩৬৫ কোটি ৫০ লাখ ডলারে। যা গত অর্থবছরের একই সময়ে সামগ্রিক লেনদেনে উদ্বৃত্ত ছিল ১৭ কোটি ৯০ লাখ ডলার।

আলোচিত সময়ে সেবা খাতে বাণিজ্য ঘাটতিও বেড়েছে। বিদেশিদের বেতন ভাতা পরিশোধ, মূলত বীমা, ভ্রমণ ইত্যাদি খাতের আয়-ব্যয় হিসাব করে সেবা খাতের বাণিজ্য ঘাটতি পরিমাপ করা হয়। গেল অর্থবছরের জুলাই-জুন সময়ে এ খাতে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২৯৮ কোটি ৭০ লাখ ডলার। যা তার আগের অর্থবছরে ছিল ২৯৯ কোটি ৩০ লাখ ডলার।

অর্থসূচক/জেডএ/এএইচআর