২০১৯-২০ অর্থবছরে রাজস্ব ঘাটতি ৮২ হাজার কোটি টাকা

গত ২০১৯-২০ অর্থ বছরের শুরুতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছিল ৩ লাখ ২৫ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। করোনাসহ নানামুখী কারণে আদায় কমতে থাকায় অর্থ বছরের শেষ দিকে লক্ষ্যমাত্রা কমিয়ে ৩ লাখ ৫০০ কোটি টাকায় নির্ধারণ করা হয়।

বছর শেষে এনবিআর হিসাব করে দেখেছে, রাজস্ব আদায় হয়েছে ২ লাখ ১৮ হাজার ৪০৬ কোটি টাকা। অর্থাৎ সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি ৮২ হাজার কোটি টাকার কিছু বেশি। আর অর্থ বছরের শুরুতে নেওয়া মূল লক্ষ্যমাত্রার হিসাবে ঘাটতি ১ লাখ ৭ হাজার ৯৪ কোটি টাকা।

২০১৮-১৯ অর্থ বছরে রাজস্ব আদায় হয়েছিল ২ লাখ ২৩ হাজার ৪৬২ কোটি টাকা। সেই হিসাবে গতবারের চেয়ে সার্বিকভাবে ৫ হাজার কোটি টাকা কম রাজস্ব আদায় হয়েছে। ১৫ জুলাই পর্যন্ত আগের মাসের ভ্যাট রিটার্ন জমার সময় ছিল। রিটার্ন বাবদ যত ভ্যাট পেয়েছে, তা যোগ করে রাজস্ব আদায়ের হিসাবটি চূড়ান্ত করেছে এনবিআর।

এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, বিদায়ী অর্থবছরে সবচেয়ে বেশি রাজস্ব এসেছে ভ্যাট বাবদ। এ খাত থেকে ৮৪ হাজার ৮৪৯ কোটি টাকা আদায় হয়েছে। এই খাতে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ছিল ১ লাখ ৮ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। সেই হিসাবে লক্ষ্যের তুলনায় ঘাটতি হয়েছে ২৩ হাজর ৭৫০ কোটি টাকা। আয়কর বাবদ আদায় হয়েছে ৭৩ হাজার ৪ কোটি টাকা। এই খাতে লক্ষ্য ছিল ১ লাখ ৬ হাজার ৬৭৯ কোটি টাকা। তাতে বছর শেষে আয়কর খাতে ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩৩ হাজার ৬৭৫ কোটি টাকা।

এ ছাড়া আমদানি শুল্ক, সম্পূরক শুল্ক, আবগারি শুল্কসহ অন্যান্য শুল্ক খাতে এনবিআর গত অর্থবছরে আদায় করেছে ৬০ হাজার ৫৫২ কোটি টাকা। এসব খাতে লক্ষ্য ছিল ৮৫ হাজার ২২১ কোটি টাকা। কিন্তু বছর শেষে এ খাতে ঘাটতি হয়েছে ২৪ হাজার ৬৬৯ কোটি টাকা। বিদায়ী অর্থ বছরের শুরুতে এনবিআরকে মোট ৩ লাখ ২৫ হাজার ৬০০ কোটি টাকার রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য দেওয়া হয়। কিন্তু কাঙ্ক্ষিত হারে আদায় না হওয়ায় পর তা ২৫ হাজার কোটি টাকা কমিয়ে দেওয়া হয়।

স্বাধীনতার পর এই প্রথম এত বড় ধাক্কা খেল রাজস্ব আদায়। গত ২০১৯-২০ অর্থ বছরের প্রথম থেকেই রাজস্ব আদায়ে গতি মন্থরতা দেখা যাচ্ছিল। তবে গত ফেব্রুয়ারি থেকে করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব শুরু হওয়ার বড় আকারে ধাক্কা খেতে শুরু করে আদায়। মার্চ থেকে সাধারণত রাজস্ব আদায়ের গতি বাড়তে থাকে। অথচ ঐ মাস থেকেই করোনার ধাক্কায় রীতিমতো ওলট-পালট হয়ে যায় আদায়। চলতি ২০২০-২১ অর্থ বছরের জন্য ৩ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা দেওয়া হয়েছে এনবিআরকে, যা গত অর্থ বছরের আদায়ের চেয়ে ৫১ শতাংশ বেশি।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এই রাজস্ব আদায় বাস্তবে সম্ভব নয়। ফলে চলতি অর্থ বছরেও শেষ দিকে এসে লক্ষ্যমাত্রা ফের সংশোধন করে কমিয়ে আনতে হবে। গত কয়েক অর্থবছর ধরেই এভাবেই বিশাল রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নেওয়ার পর শেষ দিকে এসে তা কমিয়ে আনতে হচ্ছে। এই ধরনের লক্ষ্যমাত্রা নেওয়ার ফলে রাজস্ব ব্যবস্থাপনাসহ সার্বিক বাজেট কাঠামো মানুষের আস্থা হারাচ্ছে বলেও মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।

অর্থনীতিবিদ ও পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, স্বাভাবিক পরিস্থিতিতেও এ লক্ষ্যমাত্রা (৫১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি) অর্জন সম্ভব নয়। আর বর্তমান বাস্তবতায় তো নয়ই। অবশ্য রাজস্ব আদায় আরও বাড়ানোর ক্ষেত্রে এনবিআরের আধুনিকায়ন তথা সক্ষমতা বাড়ানোর ওপরও জোর দেন তিনি।

এনবিআরের পরিসংখ্যান পর্যালোচনায় দেখা গেছে, গত পাঁচ অর্থবছরে গড় রাজস্ব আদায়ের হার ১৩ দশমিক ১৬ শতাংশ। আর ২০১৮-১৯ অর্থবছরে রাজস্ব আদায় হয়েছিল ১১ শতাংশেরও কম। বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি রাজস্ব প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ২০০৭-০৮ অর্থবছরে, প্রায় ২৪ শতাংশ। ফলে চলতি বছরও বিশাল রাজস্ব ঘাটতি দেখতে হতে পারে দেশকে।

অর্থসূচক/এমআরএম/এএইচআর