ভূমি অধিগ্রহণের দোহাই দিয়ে শেষ হয় না প্রকল্প

দেশের উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর ধীরগতি বা নির্ধারিত মেয়াদে শেষ না হওয়ার পেছনে ভূমি অধিগ্রহণই মূল কারণ হিসেবে কাজ করছে। দেশের উন্নয়ন প্রকল্প যেন সরকারের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। যে উৎসাহ নিয়ে সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে প্রকল্পগুলো অনুমোদন দেওয়া হয় বাস্তবায়নকারী সংস্থার অদক্ষতাই সেটাকে নষ্ট করে দিচ্ছে ছোট-বড়-মেগা সব প্রকল্পেরই একই চিত্র।

জেলা শহরের মাত্র ৩ দশমিক ৭৪ কিলোমিটার একটি সড়কের উন্নয়ন বা প্রশস্তকরণের প্রায় দেড় বছরের প্রকল্পও এখন পাঁচ বছরে উন্নীত করা হচ্ছে। দেড় বছরে এমনকি আরও দুই বছর বাড়িয়েও ওই কাজ শেষ করা যায়নি। ফলে ব্যয় বেড়েছে ১৩৯ কোটি টাকা এবং সময় আড়াই বছর। ভূমি অধিগ্রহণের দোহাই দিয়েই এখন নির্মাণ প্রকল্পগুলো সমাপ্তির মুখ দেখছে না বলে জানিয়েছে পরিকল্পনা কমিশন।

আগামীকাল (২১ জুলাই) জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) বৈঠকে সময় ও ব্যয় বাড়ানোর জন্য প্রকল্পটি উপস্থাপন করা হচ্ছে।

প্রকল্প প্রস্তাবনার তথ্য ও পরিকল্পনা কমিশন সূত্র জানায়, লাঙ্গলবন্দ-কাইকারটেক-নবীগঞ্জ সড়কের লাঙ্গলবন্দ হতে মিনারবাড়ি পর্যন্ত সড়ক প্রশস্তকরণ কাজটি ১২১ কোটি ৫৭ লাখ টাকা খরচে ২০১৭ সালে অনুমোদন পায়। মূল অনুমোদিত মেয়াদ ছিল ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ২০১৮ সালের জুন পর্যন্ত। নির্ধারিত সময়ে প্রকল্পটির কাজে অগ্রগতি তেমন ছিল না। ফলে ব্যয় বৃদ্ধি ছাড়াই বাস্তবায়নকাল এক বছর বাড়িয়ে ২০১৯ সালের জুন পর্যন্ত বাড়ানো হয়। তাতেও কাজ শেষ করতে পারেনি বাস্তবায়নকারী সংস্থা। আরও এক বছর পার করে এখন নতুন করে আড়াই বছর সময় বাড়িয়ে ২০২১ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত মেয়াদ বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বলছে, ইতোমধ্যেই লাঙ্গলবন্দ-কাইকারটেক-নবীগঞ্জ সড়ক উন্নয়ন নামের অপর একটি প্রকল্পের মাধ্যমে সড়কটি ৩ দশমিক ৭০ মিটার (১২ ফুট) হতে ৫ দশমিক ৫ মিটার (১৮ ফুট) প্রশস্ত করা হয়েছে। এরপর ২০১৫ সালের ২৭ মার্চ অষ্টমী স্নানের সময় এক দুর্ঘটনায় পদদলিত হয়ে ১০ জন নিহত হওয়ায় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে সড়কটি ১১ মিটার অর্থাৎ ৩৬ ফুট প্রশস্তকরণের নির্দেশ দেওয়া হয়। তাই সড়কটি ১১ মিটার প্রশস্ত করতে হলে ৮ দশমিক ৮ হেক্টর জমি অধিগ্রহণের প্রয়োজন। এতে প্রকল্পের ব্যয় ও মেয়াদ বাড়াতে হচ্ছে।

সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের সংশোধনী প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, লাঙ্গলবন্দ-কাইকারটেক-নবীগঞ্জ সড়কটি ৮ কিলোমিটার দীর্ঘ। প্রকল্পের আওতায় লাঙ্গলবন্দ হতে মিনারবাড়ি পর্যন্ত ৩ দশমিক ৭৪ কিলোমিটার উন্নয়নের জন্য প্রথম পর্যায়ে ভূমি অধিগ্রহণের প্রস্তাব করা হয়। সড়কটিতে যান চলাচল করে গড়ে ১৩ হাজার ৬৫২টি। এর মধ্যে ভারী যানবাহন চার হাজার ৮৫০ এবং হালকা যানবাহন আট হাজার ৮০২টি। এ ছাড়া সড়কটি দিয়ে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ শীতলক্ষ্যা নদী পার হয়ে নারায়ণগঞ্জ শহরে যাতায়াত করেন। সড়কটির গুরুত্ব আরও বেড়ে যাবে তৃতীয় শীতলক্ষ্যা সেতু নির্মাণের পর। এই সড়ক ব্যবহার করে হিন্দু ধর্মাবলম্বী লাখ লাখ পুণ্যার্থী লাঙ্গলবন্দ অষ্টমী স্নান পালন করতে আসেন।

তিন বছর পর সংশোধনের কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, সর্বশেষ ভূমি অধিগ্রহণ আইন অনুযায়ী জমির দাম ও ক্ষতিপূরণের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় এখানে বাড়তি ৯৬ কোটি ৪৪ লাখ টাকা ব্যয় বাড়ছে। এ ছাড়া ক্ষতিপূরণ ও ভূমি অধিগ্রহণে মোট প্রাক্কলিত ব্যয়ের ২০ শতাংশ হিসাবে ৪২ কোটি ৩০ লাখ টাকার সংস্থান করতে হচ্ছে। সেই সাথে প্রকল্পের মেয়াদ বেড়ে যাওয়ায় সংশোধনের প্রয়োজন জরুরি হয়ে পড়েছে।

পরিকল্পনা কমিশনের সংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, প্রকল্প গ্রহণের আগে যথাযথ সমীক্ষা হয় না। তাড়াহুড়া করে অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়। সঠিকভাবে সমীক্ষা করা না হলে প্রকল্পের প্রাক্কলন ও পরিকল্পনায় ত্রুটি থাকে। যার কারণে অনুমোদনের পর দফায় দফায় সংশোধন ও ব্যয় বৃদ্ধি করা হচ্ছে। এতে করে প্রকল্প ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। নীতিমালা মেনে প্রকল্প গ্রহণ করা হলে এত বেশি সংশোধনের প্রয়োজন হতো না।

অর্থসূচক/এমআরএম/এএইচআর