রবিবার, নভেম্বর ১, ২০২০
Home App Home Page আড়াই বছরের প্রকল্প ১৩ বছরেও শেষ হয়নি, ব্যয় বেড়েছে ৫ গুণ

আড়াই বছরের প্রকল্প ১৩ বছরেও শেষ হয়নি, ব্যয় বেড়েছে ৫ গুণ

আড়াই বছরের প্রকল্প ১৩ বছরেও শেষ হয়নি, ব্যয় বেড়েছে ৫ গুণ

প্রকল্পে সময় যেন পানির চেয়েও সস্তা। যার কারণে নির্ধারিত মেয়াদে প্রকল্পগুলো নানা অজুহাতে শেষ করতে চায় না বাস্তবায়নকারী সংস্থাগুলো। বাস্তবভিত্তিক প্রাক্কলন না হওয়ায় দু-দুবার দরপত্রে কেউ সাড়া দেয়নি। আশুগঞ্জ ও এলেঙ্গা কম্প্রেসর স্টেশন স্থাপন প্রকল্পটিতে এমন ঘটনা ঘটেছে। আড়াই বছরের প্রকল্প শেষ করতে লাগল ১৩ বছর। আর ৩০৪ কোটি টাকা খরচ গিয়ে পৌঁছে এক হাজার ৪৩১ কোটি টাকায়। যথাযথ সমীক্ষা না করার কারণেই প্রকল্পের সময় ও ব্যয় বৃদ্ধি পাচ্ছে।

পরিকল্পনা কমিশনের এক কর্মকর্তা বলছেন, বাস্তবায়নকারী সংস্থাগুলোর অদক্ষতা, খামখেয়ালিপনা এবং বাস্তবমুখী পরিকল্পনার অভাবে এই প্রকল্পটিসহ বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে সরকারকে অতিরিক্ত অর্থ গচ্চা দিতে হচ্ছে।

প্রকল্প পর্যালোচনা থেকে জানা গেছে, আশুগঞ্জ এবং এলেঙ্গায় যথাক্রমে দেড় হাজার এমএমসিএফডি এবং ৫০০ এমএমসিএফডি ক্ষমতাসম্পন্ন কম্প্রেসর স্টেশন স্থাপনের জন্য ২০০৬ সালে প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়। উদ্দেশ্য এই স্টেশন দুটির মাধ্যমে গ্যাস সঞ্চালন বৃদ্ধি করা। বিশেষ করে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে পিকআওয়ারে গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে খরচ ধরা হয় ৩০৪ কোটি ৮ লাখ ৪৮ হাজার টাকা। যার মধ্যে বিদেশী ঋণ ২০৯ কোটি ২৭ লাখ ৩৫ হাজার টাকা।

২০০৮ সালের জুনে অর্থাৎ, আড়াই বছরে প্রকল্পটি শেষ করার কথা। কিন্তু নানা কারণে ১০ বছর বিলম্বিত হয় বলে আইএমইডি বলছে। আট বছর পর একনেক সভায় উপস্থাপন করা হয় প্রকল্পটির মেয়াদ ও ব্যয় বৃদ্ধির মাধ্যমে সংশোধনের জন্য। ২০১৩ সালের ২২ জানুয়ারি চার গুণ ব্যয় বাড়িয়ে প্রকল্পটির খরচ অনুমোদন দেয়া হয় ১ হাজার ৪৩০ কোটি ৫৯ লাখ ৪৩ হাজার টাকা। আর ২০১৮ সালের জুনে কাজ সমাপ্ত করার কথা।

জানা গেছে, বিলম্ব হবার কারণ হলো- মূলত দুইবার পুনঃদরপত্র আহ্বান, অর্থসঙ্কট এবং কাজের সুযোগ পরিবর্তন করে অতিরিক্ত কম্প্রেসর সংযোগ ইত্যাদি। আর এ সবের কারণে অর্থায়নকারী সংস্থা এশীয় উন্নয়ন ব্যাংককে (এডিবি) তাদের ঋণ তহবিল সমন্বয় করতে হয়। স্থানান্তরিত তহবিল থেকে অর্থ প্রদান ২০১১ সালের ১৬ মার্চ থেকে কার্যকর হয়। কমিশন সূত্র জানায়, প্রকল্পটি ২০১২ সালের ৯ সেপ্টেম্বর মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভায় পর্যালোচনা করা হয়। তখন বলা হয়, প্রকল্পটি ২০০৬ সালের জানুয়ারিতে শুরু করে ২০০৮ সালের জুনে শেষ করা কথা। এরই মধ্যে মেয়াদ দুই বছর বাড়ানো হয়।

মুচাই ও আশুগঞ্জে কম্প্রেসর স্টেশন স্থাপনের জন্য পরপর দুই দফা টেন্ডার আহ্বান করা হয়। ২০০৬ সালের ১৬ এপ্রিল এবং ২০০৮ সালের ২৩ জানুয়ারি আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করেও তেমন সাড়া পায়নি বাস্তবায়নকারী সংস্থা জিটিসিএল। তবে সর্বনিম্ন দরপত্র প্রক্রিয়ার বিপরীতে সর্বনিম্ন দরদাতার উদ্ধৃত দর দাতাসংস্থা এডিবির সংস্থানকৃত পাঁচ কোটি ৫০ লাখ ডলার অপেক্ষা ১৫৩ শতাংশ বেশি। ফলে কম্প্রেসর স্টেশনগুলো স্থাপন করা সম্ভব হয়নি। কিন্তু এডিবির চেয়ে বেশি দরে কাজ দিয়ে ঠিকাদারের সাথে চুক্তি হয় ২০১১ সালের ২১ অক্টোবর। এমনকি ঠিকাদারের অনুকূলে ১০ শতাংশ অগ্রিম অর্থ প্রদান করার ফলে ৭ ফেব্রুয়ারি চুক্তি কার্যকর হয়।

২০০৮-০৯ সালে দরপত্র প্রক্রিয়ায় দেখা যায়, চারটি কম্প্রেসর স্টেশন স্থাপনের জন্য বাজেট ছিল সাড়ে ৫ কোটি ডলার, যা একেবারেই অপ্রতুল। সর্বনিম্ন দরদাতার দাম তিনগুণ বেশি ছিল। পরে সরকার ও এডিবি বাজেট সংশোধন করে এটা ১০ কোটি ৪১ লাখ ৫০ হাজার ডলারে উন্নীত করে।

এ দিকে ইতোমধ্যে পেট্রোবাংলা প্রস্তাবিত উৎপাদন-বণ্টন চুক্তির (পিএসসি) আওতায় আন্তর্জাতিক তেল কোম্পানি শেভরন মুচাইয়ে কম্প্রেসর স্টেশন স্থাপন করে। ফলে এডিবির নতুন ঋণের আওতায় মুচাই ব্যতীত অবশিষ্ট দুটি স্থানে অর্থাৎ আশুগঞ্জ (দক্ষিণ ও পশ্চিমে কম্প্রেসর স্টেশনদ্বয়কে একীভূত করে) এবং এলেঙ্গায় প্রতিটিতে একটি করে মোট দুটি কম্প্রেসর স্টেশন স্থাপনের লক্ষ্যে সংশোধিত ডিপিপি একনেক অনুমোদন করে। দ্বিতীয় সংশোধনে ব্যয় ৬৩ কোটি ৫৩ লাখ টাকা কমানো হয়। ইপিসি ঠিকাদার হলো হুন্দাই ইঞ্জিনিয়ারিং সার্ভিসেস কোরিয়া; যার সাথে চুক্তির মূল্য ছিল ১ হাজার ৮১ কোটি ৫৭ লাখ টাকা।

বিলম্বের কারণে বলা হয়েছে, ইপিসি টার্নকি কন্ট্রাক্টর (প্রকৌশলী ডিজাইন, ক্রয়, নির্মাণ, স্থাপন, কমিশনিং এবং দু’বছরের অপারেশন ও ম্যানটেইনেন্সসহ) ২০১২ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি শুরু করে। ২০১৪ সালের এপ্রিলে কম্প্রেসর স্টেশন নির্মাণ সমাপ্ত হয়। কমিশনিংয়ের জন্য সময় নির্ধারিত ছিল এক মাস। কিন্তু এক্ষেত্রে সময় লাগে ১৭ মাস। ২০১৩-১৪ সালে রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে প্রকল্প অঞ্চল দূরে হওয়াতে মালামাল আনা নেওয়ায় সমস্যা হয়। পাশাপাশি বিভিন্ন দুর্ঘটনা ঘটে।

আইএমইডি বলছে, প্রকল্পটি গ্রহণ করার সময় প্রকল্পের বিভিন্ন অঙ্গের ব্যয় প্রাক্কলন যথাযথভাবে করা হয়নি। যার কারণে প্রাক্কলিত ব্যয় আন্তর্জাতিক বাজার দরের তুলনায় অনেক কম। ফলে কিছু ক্ষেত্রে পুনঃদরপত্র আহ্বান এবং প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধি করতে হয়েছে। প্রকল্পের কর্মপরিকল্পনা এবং কাজের সুযোগ নির্ধারণে কিছুটা ঘাটতি পরিলক্ষিত হয়। প্রকল্পের মূল ডিপিপিতে প্রাক্কলিত ব্যয় বাস্তবমুখী না হওয়ায় ডিপিপি বারবার সংশোধন ও ব্যয় বৃদ্ধি করতে হয়েছে। পুনঃদরপত্র আহ্বান করতে হয়েছে। ফলে এই ঘাটতির কারণেই প্রকল্পটি যথাসময়ে শেষ করতে পারেনি বাস্তবায়নকারী সংস্থা। আর অতিক্রান্ত সময়ের পরিমাণ ছিল ৪০০ শতাংশ। প্রকল্পের আওতায় ৭.০৬ হেক্টর ভূমি অধিগ্রহণ করা হলেও শেষ পর্যন্ত সে ভূমিতে প্রকল্পটি স্থাপন হয়নি।

বিশেষজ্ঞদের অভিমত, জ্বালানি খাতের প্রকল্পগুলো নিয়ে আমরা সব সময়ই এই ধরনের আশঙ্কা করি। এখানে অস্বচ্ছতা এবং কমিশন বাণিজ্য বেশি থাকে। আর এই কাজগুলো পূর্বনির্ধারিত। অর্থ ব্যয় করে পরে সংশোধিত বাজেট অনুমোদন করা হয়। কারণ এই কাজে দুর্নীতির ব্যাপার থাকে। প্রথম পর্যায়ে যে ব্যয় ধরা হয় তা সম্পর্কে দেশের সাধারণ জনগণ জানলেও পরে যা করা হয় তা সম্পর্কে দেশের মানুষ আর জানে না। এখানে দুর্নীতির একটা জাল বিস্তার করে রাখা হয়েছে।

অর্থসূচক/এমআরএম/এএইচআর