'ফ্লোরপ্রাইস সংক্রান্ত অনিশ্চয়তার অবসান জরুরি'
শুক্রবার, ৭ই আগস্ট, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ
today-news
brac-epl
প্রচ্ছদ » App Home Page

‘ফ্লোরপ্রাইস সংক্রান্ত অনিশ্চয়তার অবসান জরুরি’

একটি সংকটকালীন সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে দেশের পুঁজিবাজার। অনেক দিন ধরেই বাজারে আস্থা ও তারল্য সঙ্কট চলছিল। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে করোনাভাইরাসজনিত পরিস্থিতি। এই বিশেষ পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) বাজারে বড় ধরনের পতন এড়াতে ফ্লোরপ্রাইস ব্যবস্থা চালু করেছিল মার্চ মাসের শেষভাগে। এটি একটি সময়োচিত পদক্ষেপ হলেও এর মেরিট, ডি-মেরিট দুটোই আছে। বর্তমানে ফ্লোরপ্রাইস ইস্যুর কারণে বাজার একরকম গতিহীন হয়ে পড়েছে, লেনদেন নেমে এসেছে তলানীতে।

এটি ঠিক যে, অর্থনীতিতে করোনাভাইরাসের (কোভিড-১৯) বেশ বড় আঘাত লেগেছে। এতে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত। তাই করোনার প্রকোপ তীব্র হবার আগে মার্চে বেঁধে দেওয়া ফ্লোরপ্রাইসে বর্তমানে বেশিরভাগ বিনিয়োগকারীরা শেয়ার কিনতে চান না। কারণ ফ্লোরপ্রাইস বেঁধে দেওয়ার পর দুই মাস সাধারণ ছুটি ছিল। এখন ছুটি না থাকলেও দেশের পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। এসব কারণে কোম্পানিগুলোর ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বিনিয়োগকারীদের একাংশ মনে করেন, মার্চে বেঁধে দেওয়া শেয়ারের সর্বনিম্ন দাম বর্তমান প্রেক্ষিতে বাস্তবসম্মত নয়।

কিন্তু এটিও তো ঠিক, মার্চে যে ফ্লোরপ্রাইস ঠিক করে দেওয়া হয়েছে, বেশিরভাগ কোম্পানির পারফরম্যান্সের নিরিখে ওই মূল্য ছিল যৌক্তিক পর্যায়েরও কম। বাজারে আস্থা ও তারল্য সংকট থাকায় শেয়ারের মূল্য কমতে কমতে ওই পর্যায়ে নেমে এসেছিল। তাই করোনায় কোম্পানির ব্যবসা একটু ব্যাহত হলেও তাতে ফ্লোরপ্রাইসের মূল্য খুব একটা অসঙ্গতিপূর্ণ হবে না। তাছাড়া পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেই ব্যবসা-বাণিজ্যের ঘুরে দঁড়ানোর ব্যাপক সম্ভাবনা আছে। এই সম্ভাবনার ফলে ভারতের বাজার এখন অনেক উর্ধমুখী।

এ বাস্তবতায় বাজারে এত কম লেনদেন হওয়ার কথা নয়। বিশেষ করে পুঁজিবাজারে গতি ফেরানোর জন্য চলতি অর্থবছরের বাজেটে  অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগের সুযোগ দেওয়া হয়েছে, তার ফলে এই ধরনের কিছু বিনিয়োগকারী বাজারে সক্রিয় হওয়ার কথা।  তাছাড়া অনেক কোম্পানির শেয়ারের মূল্য যৌক্তিক পর্যায়ের নিচে থাকায় এমনিতেই কিছু নতুন বিনিয়োগ আসার কথা।

কিন্তু তবু বাজারে বিনিয়োগ ও লেনদেন বাড়ছে না কেন? আমার দীর্ঘ কর্মজীবনের আভিজ্ঞতা বলছে, অনেকেই ফ্লোরপ্রাইস সংক্রান্ত অনিশ্চয়তার মুখে বিনিয়োগ করতে চাইছেন না। অনেক বিনিয়োগকারীর ভয়, তাদের শেয়ার কেনার কিছু দিনের মধ্যেই যদি ফ্লোরপ্রাইস উঠে যায়, তাহলে শেয়ারের দাম অনেক কমে যাবে এবং তাদেরকে লোকসানে পড়তে হবে। আবার অনেক বিনিয়োগকারী আছেন, যারা সুযোগ সন্ধানী,  তারা হয়তো অপেক্ষা করছেন, কখন ফ্লোরপ্রাইস উঠে যাবে, তারা তখন কম দামে শেয়ার কিনবেন। তাতে বিনিয়োগের ঝুঁকি একেবারেই থাকবে না। বরং অতি কম দামে কেনা গেলে সহজেই মুনাফা করা যাবে।

বাজারের বর্তমান এই সংকট থেকে উত্তরণের দুটি পথ আছে। এর একটি হচ্ছে- ফ্লোরপ্রাইস ব্যবস্থা তুলে নেওয়া, কিন্তু সেটি অনেক ঝুঁকিপূর্ণ; অপরটি হচ্ছে-ফ্লোরপ্রাইস কতদিন বহাল থাকবে সে সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট ঘোষণা দেওয়া। তবে এটিরও কিছু নেতিবাচক দিক আছে। যদিও প্রথমটির তুলনায় দ্বিতীয়টির ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে কম।

ফ্লোরপ্রাইস ব্যবসা তুলে দিলে শেয়ারের দামের উঠা-নামার সুযোগ পাবে। তাতে লেনদেনে স্বাভাবিক ছন্দ আসবে। বাড়বে লেনদেনও। কিন্তু বিষয়টি বর্তমান বাস্তবতায় অনেক ঝুঁকিপূর্ণ। তাতে যদি শেয়ারের দাম অনেক কমে যায়, তাহলে অসংখ্য বিনিয়োগকারী ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বিশেষ করে যারা ব্রোকারহাউজ ও মার্চেন্ট ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে (মার্জিন ঋণ) শেয়ার কিনেছেন, তারা ফোসর্ড সেলের কবলে পড়বেন। এই ধরনের বেশিরভাগ বিনিয়োগকারীর পক্ষে হয়তো নতুন করে তহবিল যোগান দিয়ে ইক্যুইটির পরিমাণ বাড়ানো সম্ভব হবে না। তাই ফোসর্ড সেলও এড়ানো যাবে না। তাদের শেয়ার ফোসর্ড সেল হয়ে গেলে তারা পুঁজি হারিয়ে বাজার থেকে ছিটকে পড়েন। শুধু বিনিয়োগকারী নয়, ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোও তাতে বিপদে পড়বেন। তাই ফ্লোরপ্রাইস তুলে দেওয়ার পথে এগুতে চাইলে পর্যাপ্ত ব্যাক-আপের ব্যবস্থা রাখতে হবে, যাতে বাজারে যতই শেয়ার বিক্রির চাপ আসুক, ভাল মানের সব শেয়ার কিনে নেওয়া যায়। টানা কয়েকদিন বিক্রির চাপ সামাল দিতে পারলে বিনিয়োগকারীদের ভয় ধীরে ধীরে কেটে যাবে, আস্থা বাড়বে। বাজারে নতুন বিনিয়োগকারীও সক্রিয় হবেন। এমন সিদ্ধান্ত নিলে হলে বাংলাদেশ ফান্ডের মতো কোনো বড় একটি ফান্ড গঠন করার কথা ভাবা যেতে পারে।

কিন্তু যদি ব্যাক-আপ সাপোর্ট তৈরি করা না যায়, সে ক্ষেত্রে ফ্লোরপ্রাইস ব্যবস্থা আরও কিছুদিন বহাল রাখা উচিত হবে। এ ক্ষেত্রে বিএসইসির উচিত হবে, একটি সময়সীমা বেঁধে দেওয়া, যে সময়সীমার আগে ফ্লোরপ্রাইস ব্যবস্থা প্রত্যাহার হবে না। সেটি হতে পারে আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত। ওই সময়ের আগে ফ্লোরপ্রাইস উঠবে না বা কম দামে শেয়ার কেনার সুযোগ পাওয়া যাবে না-এমনটি নিশ্চিত হলে নতুন বিনিয়োগ নিয়ে যারা দ্বিধায় আছেন, তাদের অনেকেই আর অপেক্ষায় না থেকে বিনিয়োগে সক্রিয় হবেন। তাতে ধীরে ধীরে বাজারে লেনদেনের পরিমাণ বাড়বে আশা করা যায়। যদিও তাতেও লেনদেন তেমন না বাড়ে, ব্রোকারহাউজগুলোকে আয় নিয়ে সমস্যায় পড়তে হয়, তাহলে তাদের জন্যে স্বল্প সুদে ঋণের ব্যবস্থা করে সাপোর্ট দেওয়া যেতে পারে।

দুটি বিকল্পের যে কোনো একটি গ্রহণ করে হোক অথবা অন্য কোনো বিকল্পের মাধ্যমে হোক ফ্লোরপ্রাইস সংক্রান্ত অনিশ্চয়তার অবসান হওয়া বেশ জরুরি।

# লেখকঃ সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক, ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশ (আইসিবি)

এই বিভাগের আরো সংবাদ