রংপুরে এরশাদের মুক্তির দাবিতে হরতাল

Rongpur Japa Hortal

Rongpur Japa Hortalজাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের মুক্তির দাবীতে জাতীয় পার্টির দুই গ্রুপের ডাকে ৪৮ ঘন্টার হরতালের প্রথম দিন বুধবার নজীরবিহীনভাবে পালিত হচ্ছে। ভারী যানবাহন চলাচল তো দুরের কথা নগরীসহ আশেপাশে সাইকেল পর্যন্তও চলেনি। সকল পথঘাট রাস্তায় জাতীয় পার্টি নেতাকর্মীদের সাথে সাধারণ মানুষ অবস্থান নেয়ায় মানুষে মানুষে ভরপুর ছিল পুরো নগরী।

অন্যদিকে পীরগাছার পাওটানা এলাকায় গাছে কেটে রাস্তায় ফেলে অবরোধ গড়ে তোলায় ওই এলাকায় দুপুরে যৌথ বাহিনী অভিযান পরিচালনা করে। আগামীকাল বৃহস্পতিবার নতুন আহবায়ক কমিটির ডাকে আবারও সকাল সন্ধা হরতাল চলবে। তবে বিলুপ্ত কমিটির বলেছে কোন হরতাল হবে না।

ভোরেই সদ্য বিলুপ্ত জেলা ও মহানগর কমিটির সভাপতি প্রেসিডিয়াম সদস্য সাবেক এমপি মসিউর রহমান রাঙ্গা, জেলা সেক্রেটারী বীর মুক্তিযোদ্ধা আবুল মাসুদ চৌধুরী নান্টু এবং মহানগর সেক্রেটারী সালাহ উদ্দিন কাদেরী, সেক্রেটারী  হাসানুজ্জামান নাজিম, মহানগর সভাপতি শাহাদত হোসেন, সেক্রেটারী ইউসুফ আলী, ছাত্রসমাজের জেলা সভাপতি নাজদুল হুদা লাভলু, সেক্রেটারী আশরাফুল হক জবার নেতৃত্বে নেতাকর্মীরা নগরীর সেন্ট্রাল রোড জাতীয় পার্টির অফিস, পায়রা চত্বর, জাহাজ কোম্পানী মোড় এলাকায় অবস্থান নিয়ে দফায় দফায় বিক্ষোভ মিছিল করেন।

দিনভর নেতাকর্মীরা জাহাজ কোম্পানি মোড়ে সমাবেশ করে। সমাবেশে বক্তব্যে জেলা ও মহানগর সভাপতি ও প্রেসিডিয়াম সদস্য মসিউর রহমান রাঙ্গা বলেন, এরশাদ স্যারকে মুক্ত করে না দেওয়া পর্যন্ত আমরা রাজপথ ছেড়ে যাব না। তিনি নেতাকর্মীদের উদ্দেশ্য করে বলেন, জাতীয় পার্টির বিরুদ্ধে চিহ্নিত ষড়যন্ত্রকারীরা আবারও মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে তাদেরকেও  রুখে দিতে হবে। এরশাদকে মুক্ত জীবনে ফিরে আনাই আমাদের একমাত্র লক্ষ। পরে ডিসি অফিসে এরশাদের মুক্তির দাবিতে স্মারকলিপি দেন তারা।

অন্যদিকে, গ্রান্ড হোটেল মোড়, শাপলা চত্ত্বর, খামার মোড়সহ সেনপাড়া এরশাদের পৈত্রিক নিবাস স্কাইভিউ লাঙ্গল ভবন এলাকায় সদ্য এরশাদ ঘোষিত জাতীয় পার্টির বিভাগীয় সমন্বয়কারী হোসেন মকবুল শাহরিয়ার এমপি, জেলা কমিটির আহবায়ক প্রেসিডিয়াম সদস্য সাবেক এমপি করিম উদ্দিন ভরসা, সদস্য সচিব মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা, সদস্য সচিব এসএম ইয়াসিরের নেতৃত্বে বিপুল পরিমান নেতাকর্মী অবস্থান নেয়। আহবায়ক কমিটির জেলা সদস্য সচিব মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা নেতৃত্বে শাপলা চত্ত্বর থেকে খামার মোড়, লালবাগ ও পার্কের মোড় পর্যন্ত এলাকায় দফায় দফায় বিক্ষোভ হয়।

দুপুরে সিটি বাজারের সামনে জাপার মহানগর আহবায়ক কমিটির সদস্য সচিব এসএম ইয়াসিরের নেতৃত্বে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের হলে পুলিশ মিছিলে বাঁধা দিয়ে এসএম ইয়াসিরকে আটকের চেষ্টা করে।

এদিকে লালবাগে মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা বলেন, এরশাদ স্যারকে চিকিৎসার নামে সিএমএইচএ আটকে রাখা হয়েছে। তাকে বিদেশে পাঠিয়ে মেরে ফেলার ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে। এরশাদ মুক্তির জন্য আমরা জনসাধারণকে মাঠে নিয়ে ৪৮ ঘন্টার হরতাল শুরু করেছি। বৃহস্পতিবারও একই দাবিতে হরতাল পালন করা হবে। এরমধ্যে যদি এরশাদ স্যারকে সিএমএইচ থেকে ফিরিয়ে প্রেসিডেন্ট পার্কে নিয়ে আসা না হয় তবে সাংবাদিক সম্মেলনের মাধ্যমে পরবর্তি কর্মসূচি দেওয়া হবে।

এ সময় মোস্তফা আরও বলেন, স্যার পার্টির গঠনতন্ত্রের ৩৯ ধারা অনুযায়ী আমাদেরকে আহবায়ক কমিটি গঠন করে দিয়েছে। আমরা সেই বৈধ আহবায়ক কমিটির আলোকেই আন্দোলন করছি। অন্য যারা নিজেদের বৈধ বলে দাবি করছেন তাদের কমিটি বিলুপ্ত করে দেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, এখন আমাদের এরশাদ স্যারকে মুক্তির জন্য। কোন গ্রুপিংয়ের জন্য নয়।

তবে বৃহস্পতিবারের হরতাল সম্পর্কে বিলুপ্ত মহানগর কমিটির সাধারণ সম্পাদক এ্যাডভোকেট সালাহ উদ্দিন কাদেরী বলেন, জাতীয় পার্টি বৃহস্পতিবার কোন হরতাল পালন করবে না। আমরা মানুষকে কষ্ট দিবো না। গাড়ি ঘোড়া চলবে। দোকান খোলা থাকবে। নিজেদের জাতীয় পার্টির মুল ধারার নেতা দাবি করে তিনি বলেন, কেন্দ্র থেকে আমাদের যে কর্মসূচি দেয়া হবে আমরা সেটা পালন করবো। স্মারকলিপি দেয়ার পাশাপাশি আমরা রংপুরবাসীর প্রত্যাশা অনুযায়ী অতিরিক্ত হিসেবে হরতাল পালন করেছি।

এদিকে নগরীর মডার্ণ মোড়, সাতমাথা, লালবাগ, মাহিগঞ্জ, কুকরুল, মেডিকেল মোড়, সিও বাজার পাগলাপীর, বুড়িরহাট, নজিরের হাট, দর্শনা, পালিচড়া, দমদমাসহ বিভিন্ন মোড়ে মোড়ে অবস্থান নিয়েছে জাতীয় পার্টির নেতাকর্মীরা।

এদিকে হরতালের কারণে রংপুর মহানগরীসহ সব কিছুই স্তব্ধ হয়ে পড়েছে। অবরোধের কারণে সকাল থেকেই বন্ধ হয়ে আছে দুরপাল্লা, আন্ত:জেলা ও উপজেলাগামী সকল ধরনের ভারী মাঝারী যানবাহন। অন্যদিকে এরশাদের মুক্তির দাবীতে আহুত হরতালের কারনে রিকশা, অটো রিকশা, সাইকেল, মোটর সাইকেলসহ কোন যানবাহনও চলছে না। ফুটপাতের পান সিগারেট দোকানসহ সকল ধরনের দোকান পাট বন্ধ আছে। এমনকি খাবার দোকান পর্যন্তও বন্ধ আছে। রাস্তায় নেমে এসেছেন জাতীয় পার্টির নেতাকর্মী ছাড়াও এরশাদ ভক্ত মানুষ। ফলে রাস্তায় শুধু মানুষ আর মানুষ লক্ষা করা গেছে। কোথাও কোথোও পিকেটিং করেছেন মহিলারাও।

এদিকে যেকোনো ধরণের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে নগরীতে বিজিবি, র‌্যাব, পুলিশসহ বিপুল পরিমাণ আইন-শৃংখলা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। আছে নির্বাহী ম্যাজিষ্ট্রেটও। আইন-শৃংখলা বাহিনীর টহল অব্যাহত আছে পুরো নগরীতে।

এদিকে  পীরগাছা উপজেলার ছাওলা ইউনিয়নের পাওটানা এলাকার বিভিন্ন রাস্তায় গাছ কেটে অবরোধ গড়ে তোলে স্থানীয়  জাতীয় পার্টির নেতাকর্মীরা। এসময় জাতীয় পার্টির একটি বিক্ষোভ মিছিল থেকে পাওটানা বাজারের ১০ টি দোকানে ভাংচুর চালানো হয়। এ ঘটনায় দুপুরে পাওটানা এলাকার বিভিন্ন গ্রামে র‌্যাব বিজিবি ও পুলিশ যৌথ অভিযান চালায়। এসময় সেখানে পীরগাছা থানার ওসি মকবুল হোসেনসহ আইনশৃংখলাবাহিনীর উর্ধতন কর্তা ব্যাক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।

এদিকে বুধবার আঠারো দলীয় জোট রংপুর মহানগরীর দর্শনা মোড় এলাকায় অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছে। এছাড়াও জেলার বিভিন্ন উপজেলা ও হাট বাজারে তারা অবরোধের সমর্থনে আলাদা বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করে।

কোতয়ালী থানার ওসি সৈয়দ সাহাবুদ্দিন খলিফা জানান, কেউ নাশকতা করতে চাইলে তা কঠোরভাবে মোকাবেলা করা হবে।

প্রসঙ্গত, মঙ্গলবার একই ইস্যুতে জাতীয় পার্টির দুই গ্রুপের সংঘর্ষের পর সদ্য বিলুপ্ত কমিটি বুধবার সকাল-সন্ধ্যা ১২ ঘন্টা এবং এরশাদ ঘোষিত আহবায়ক কমিটি বুধ ও বৃহস্পতিবার ৪৮ ঘন্টা হরতালের ডাক দেয়।