শুধু বৃষ্টিপাত নয় জলাবদ্ধতাও পাহাড় ধসের কারণ

hill
ফাইল ফটো
hill
ফাইল ফটো

চট্টগ্রাম নগরীতে কেবল ভারী বৃষ্টিপাত হলেই পাহাড় ধসে পড়ে এমন নয় সেই সঙ্গে নগরীতে জলাবদ্ধতা এবং সাগরের জোয়ারের বিষয়টিও জড়িত বলে মনে করেন জলবায়ূ ও পরিবেশ গবেষক ম. আবদুর রহমান রানা।

রোববার ভোর থেকে ভারী বৃষ্টির ফলে নগরীর বাকলিয়ায়, বহদ্দারহাট, মুরাদপুর, ষোলশহর ও শুলকবহরসহ প্রায় অর্ধেক স্থানে হাটু থেকে কোমড় পর্যন্ত পানি জমে গেছে। এমন জলাবদ্ধতার ফলে কোথাও না কোথাও পাহাড় ধ্বসে পড়ার আশংকা করছেন বিশেষজ্ঞরা।

এদিকে, পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণ বসবাসকারী পরিবারকে সরে আসার জন্য মাইকিং করছেন জেলা প্রশাসক।

অতীত পাহাড় ধসের সময়ে বিভিন্ন বিষয় বিশ্লেষণ করে আবদুর রহমান রানা বলেন, নগরীতে জলাবদ্ধতা আর সাগরে জোয়ারের পানি চার মিটারের চেয়ে বেশি থাকে তখনই পাহাড় ভেঙ্গে পড়ে। যদিও বিশেষজ্ঞরা বলে আসছেন চট্টগ্রামে দৈনিক ৩০০ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টিপাত হলে পাহাড় ধসে থাকে কিন্তু এই বিষয়টি সত্য নয়।

তিনি আরও বলেন, চট্টগ্রাম মহানগরীতে পাহাড় ধসে পড়ার ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায় ৩০০ কেন ৫০০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাতের দিনেও পাহাড় ধসে না পড়ার রেকর্ড রয়েছে আবার ১৭০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাতেও পাহাড় ধসে পড়েছে। চট্টগ্রামে যে সকল ঘটনাকে আমরা পাহাড় ধ্স বলে চালিয়ে দেয়া হয় তা হলো মাড ফ্লো (মৃত্তিকার প্রবাহমানতা)। প্রকৃত অর্থে তা পাহাড় ধ্স নয়। চট্টগ্রামসহ সারা দেশের পাহাড়সমূহ কংলোমারেট বালিমাটি দ্বারা তৈরি। এসব পাহাড়সমূহের সাধারণ বৈশিষ্ট্য হলো বৃষ্টির সময়ে পানি ছুঁয়ে পাহাড়ের পাদদেশ পর্যন্ত বহন করে নিয়ে যায়। আর যদি পাহাড়ের ছাদ উন্মুক্ত এবং গাছপালাবিহীন নেড়া থাকে তাহলে এই পানি শোষণের হার বেড়ে যায়। এখানকার পাহাড়সমূহের বর্তমান পরিস্থিতি এমনই।

অধিক জনবসতির কারণে পাহাড়সমূহের ছাদেও গাছপালা, লতাগুল্ম কেটে ছাদকে পুরো নেড়া করে ফেলা হয়েছে আবার অধিকাংশ জায়গায় পাহাড়ের মাথায় স্থাপনা তৈরির কারণে বিশাল বিশাল গর্ত সৃষ্টি করা হয়েছে। এসব উন্মুক্ত স্থান ও গর্ত দিয়ে অতি সহজে বৃষ্টির পানি প্রবেশ করে পাহাড়ের তলদেশ পর্যন্ত প্রবেশ করছে। তার ওপর রয়েছে অধিক তাপমত্রার কারণে ত্বরান্বিত চর্ণীভবন প্রক্রিয়া। গত কয়েকদিন যাবত প্রচণ্ড তাপের কারণে পাহাড়ের শিলাসমূহের হ্রাস-বৃদ্ধি্র কারণে অনেক জাযগায় ফাটল সৃষ্টি হয়েছে। এ সকল ফাটল দিয়ে পানি প্রবেশ করছে পাহাড়ের তলদেশে।

অন্যদিকে সাগরের পানি ভরা জোয়ারের কারণে পানি শহরে প্রবেশ করছে। একদিকে বৃষ্টির পানি এবং অন্যদিকে জোয়ারের পানি। দুইয়ে মিলে শহরের ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি পানি বিরাজ করছে শহরে। এই পানি সৃষ্টি করছে জলাবদ্ধতা। স্বল্পকালীন এই জলাবদ্ধতাই মূলত এখানকার মাড ফ্লো যাকে আমরা পাহাড় ধ্স বলে জানি তার জন্য দায়ী বৃষ্টিপাত নয়। এই জলাবদ্ধতা ঠেকানো গেলে চট্টগ্রাম মহানগরী ও তার আশেপাশে কখনো পাহাড় ভেঙে পড়ার মতো ঘটনা ঘটবে না।

রোববার আবহাওয়া সূত্রে জানা গেছে, আজ চট্টগ্রামে বিকেল ৩ টা পর্যন্ত বৃষ্টিপাত ধারণ করা হয়েছে ১৮২ দশমিক ২ মিলিমিটার। অন্যদিকে সাগরে ভরা জোয়ার আসবে রাত ১১টার দিকে। যা সমুদ্রপৃষ্ট থেকে চার মিটারের চেয়ে বেশি হবে ।

এ সকল বিষয় বিশ্লেষণ করে এ গবেষক জানান, আজ চট্টগ্রাম মহানগরী পানির নীচে সাঁতরাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে চট্টগ্রামের পাহাড় ধ্স হওয়ার আশংকা কোনোভাবেই উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তাই প্রশাসন ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানসমূহ যারা সরাসরি দুর্যোগ মোকাবেলার সাথে সম্পৃক্ত তাদেরকে সকল ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করে রাখা জরুরি।

ম. আবদুর রহমান তার বিভিন্ন গবেষণা উল্লেখ নগরীর কয়েকটি ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়গুলো ধসে পড়ার আশংকার কথা জানান।

তিনি বলেন, মতিঝর্ণা পাহাড়টির উচ্চতা ৫৪.৪ মিটার এবং এ পাহাড়টি পাদদেশ থেকে ২৯ মিটার উচ্চতায় ভেঙ্গে পড়তে পারে। সেক্ষেত্রে কর্দম প্রবাহ ৩৩ মিটার অতিক্রম করবে এবং তা আশপাশের ২৩১১৭.৪০ বর্গমিটার এলাকজুড়ে ক্ষয়ক্ষতি করার আশংকা রয়েছে। উক্ত এলাকার উল্লেখিত স্থান জুড়ে ৬৩টি পরিবার বসবাস করছে যারা সবচেয়ে ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।

বাটালি হিল পাহাড়ের উচ্চতা ৬৪.৮ মিটার এবং এ পাহাড়টি পাদদেশ থেকে ৩১.১ মিটার উচ্চতায় ভেঙ্গে পড়তে পারে। সেক্ষেত্রে কর্দম প্রবাহ অতিক্রম করবে ৩৩.৬৩ মিটার এবং তার প্রভাব অনুভূত হবে ২৬৮৪.০৬ বর্গ মিটার   আয়তন জুড়ে। উক্ত এলাকার উল্লেখিত স্থান জুড়ে ৫১টি পরিবার বসবাস করছে যারা সবচেয়ে ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।

কুসুমবাগ এ এলাকার পূর্বে অবস্থিত স্থানটি বেশি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। এখানকার পাহাড়ের উচ্চতা ৫১ মিটার এবং এ পাহাড়টি পাদদেশ থেকে ৩৮ মিটার উচ্চতায় ভেঙ্গে পড়তে পারে। এ স্থানটি পোড়া কলোনী নামে পরিচিত। সেক্ষেত্রে কর্দম প্রবাহ অতিক্রম করবে ৩৫.৭৫ মিটার এবং তার প্রভাব ১৩৯৮.৪০ বর্গমিটার আয়তন জুড়ে অনুভূত হবে। উক্ত এলাকার উল্লেখিত স্থান জুড়ে ১০৭টি পরিবার বসবাস করছে যারা সবচেয়ে ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।

উল্লেখ্য, গত ছয় বছরে পাহাড় ধসে চট্টগ্রামে ২৫৩ জন নিহত হয়। যার মধ্যে ২০০৭ সালে ১২৭ জন এবং ২০১২ সালে ১০৯ জন নিহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে পাহাড় ধসের কারণে।