মায়ের আশা তবুও ভালো থাকবে ছেলে

ma dayস্বামীহারা ৬৫ বছর বয়সী মিনারা বেগম। রাস্তার পাশেই কাগজ টোকাচ্ছিলেন। পেছন দিক থেকে ডাক দিতেই ফিরে তাকালেন। জানতে চাইলেন ডাক দেওয়ার কারণ। বাড়ি কোথায় জিজ্ঞেস করলে একটু কাপা কাপা কন্ঠে উত্তর দিলেন রংপুরে। বয়সের ভারে অনেকটাই যেন নুয়ে পড়েছেন। একমাত্র ছেলের জননী মিনারা থাকেন বাসাবোর বস্তিতে। একটি হোটেলেও থালা-বাসন ধোয়ার কাজ করেন। হোটেল মালিক মাসে ১০০০ হাজার টাকা বেতন দেন। কাগজ বিক্রি করে প্রতিদিন ৩০ থেকে ৪০ টাকা আয় করেন। এতো অল্প টাকায় কিভাবে তার দিন চলে জিজ্ঞেস করতেই দু’চোখ দিয়ে পানি চলে আসে তার। কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলতে থাকেন অসহ্য মানষিক যন্ত্রণার কথা।

ছয় বছর আগে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে তার স্বামী মারা যায়। এরপর কষ্টের জমানো টাকা দিয়ে ছেলেকে একটি রিক্সা কিনে দেন। ছেলে রিক্সা চালিয়ে যা উপার্জন করে তা দিয়ে কোনোরকম চলে যাচ্ছিল মিনারার ছোট্ট সংসার। এর একবছর পর তার একমাত্র ছেলেকে বিয়ে করিয়ে বউ ঘরে আনেন। তার পরেই বাধে যতো সমস্যা। সামান্য বিষয় নিয়ে ছেলের বউ প্রায়ই তার সাথে ঝগড়া বাধিয়ে দিত। ছেলে কোনো প্রতিবাদ করতো না। একদিন ঝগড়া লেগে ছেলের বউ বাবার বাড়িতে চলে যায়। কয়েকদিন পর মাকে ছেড়ে ছেলেও তার বউয়ের কাছে চলে যায়। এরপর মিনারা বেগম একদম একা হয়ে পড়েন। এই সুযোগে তার দেবররা স্বামীর রেখে যাওয়া দুই শতাংশ জায়গাও দখল করে নেয়।

ক্ষুধার তাড়নায় মানুষের বাড়িতে কাজ করেও দু-বেলা পেট ভরে খেতে পারতেন না। একদিন এক প্রতিবেশির পরামর্শে ঢাকায় চলে আসেন তিনি। উঠেন বাসাবো বস্তিতে। পাশের ঘরের একজন তাকে মাসিক ১০০০ হাজার টাকা বেতনে একটি হোটেলে কাজ ঠিক করে দেন। এই সামান্য টাকায় দিন চলে না তার। তাই বাধ্য হয়েই কাগজ কুড়িয়ে নিজের খরচ চালান। কান্নাভেজা কণ্ঠে বলতে থাকেন সন্তানকে কাছে না পাওয়ার বেদনার কথা। বলেন ছেলেকে অনেক দেখতে ইচ্ছে করে। কিন্তু ছেলে তার কোনো খোঁজ-ই নেয় না। তাই অসহায় একাকী এই জীবনে বেঁচে থাকার আকুতিও তার ভেতরে আর কাজ করে না বলে জানান তিনি।

তবে তিনি আশা করেন তা ছেলে ভালো থাকবে। তিনি এখনও তার ছেলের জন্য প্রার্থনা করেন।

আজ মা দিবস । তাই এতোক্ষণ বলছিলাম এক অসহায় মায়ের করুণ আর্তনাদের কথা। মিনারার মতো এমন অনেক মা আছেন যারা নিজের লুকানো কষ্টের কথা কারও কাছে বলার সুযোগ পান না।

পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ শব্দ মা। কারণ মা-ই পৃথিবীতে একমাত্র ব্যক্তি যে কিনা তার সন্তানকে কোনো কিছু পাওয়ার আশা না করে নি:শর্ত ভালোবাসা দিয়ে যান। নারী-পুরুষ, ধনী-গরিব কারও সঙ্গে মায়ের কোনো তুলনা চলে না। মা সার্বজনীন, মা ভালোবাসা, মা মানেই পরম মমতা।

প্রিয় গর্ভধারিণীকে ভালোবাসতে সন্তানের জন্য কোনো বিশেষ দিন লাগে না। মায়ের জন্য ভালোবাসা প্রতিদিনের। তারপরেও মায়ের প্রতি সন্তানের ভালোবাসার প্রকাশ ঘটাতে বিশ্বজুড়ে নানা আয়োজনে পালন করা হয় এই দিনটিকে।

সন্তানের সঙ্গে মায়ের সম্পর্ককে কোনো কিছু দ্বারা বাঁধা যায় না। আর এখানেই মায়ের সার্থকতা। তারপরেও দিবস বলে কথা। মায়ের প্রতি ঋণের কথা ভেবে এই দিনটিতে সন্তানেরা বাড়তি প্রেরণা পাওয়ার জন্য প্রিয় মাকে কিছু একটা উপহার দেওয়ার চেষ্টা করেন। আর যারা দূরে থাকেন তারাও প্রযুক্তির আশীর্বাদে টেলিফোন কিংবা ইন্টারনেটের সাহায্যে মাকে কাছে পেতে চান। প্রাণভরে ‘মা’ বলে ডাকতে চান।

প্রতি বছর মে মাসের দ্বিতীয় রোববার বিশ্বব্যপী পালিত হয় এই মা দিবস। প্রায় দেড়শ বছর আগে যুক্তরাষ্ট্রের মেয়ে অ্যানা জারভিসের জন্য প্রতি রোববারের সকালটা আসতো একটু অন্যরকম ভাবেই। এদিন তিনি নিজের প্রতিষ্ঠিত স্কুলে বাচ্চাদের বাইবেল পাঠ করাতেন আর তাদের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতেন। কারণ এসব বাচ্চাদের চেহারায় তিনি খুঁজে পেতেন নিজের মায়ের মুখ। আর মায়ের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ থেকেই ১৯০৫ সাল থেকে প্রবর্তন করেন মাদার্স ডে বা মা দিবসের।

আর যুক্তরাষ্ট্রে ১৯১৪ সালে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসন মে মাসের দ্বিতীয় রোববারকে জাতীয় মা দিবস পালনের মর্যাদা দেন। এরই ধারাবাহিকতায় আমেরিকার সাথে বাংলাদেশ, অষ্ট্রেলিয়া, ব্রাজিল, কানাডা, চীন, রাশিয়া, জার্মানীসহ বিশ্বের ৪৬টি দেশে পালিত হতে থাকে মা দিবস। আর ১৯৬২ সালে এই দিবসটি আন্তর্জাতিক মা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি পায়।

মা দিবস যুক্তরাষ্ট্রে শুরু হলেও বিশ্বের অনেক দেশই যার যার মতো করে বছরের ভিন্ন ভিন্ন সময়ে তা পালন করে। কিন্তু বাংলাদেশে মা দিবসটি পালনের চল খুব বেশি দিনের না হলেও তা শুধু শহরের মধ্যবিত্ত ও বিত্তশালীদের অচেতন মনের গণ্ডিতেই বিরাজ করে। এখানে গ্রামের লাখ লাখ দরিদ্র মায়েদের তেমন কোনো অন্তর্ভুক্তি থাকে না। কারণ মা দিবসের তেমন কোনো তাৎপর্য এই শ্রেণির মায়েদের ভেতরে বিরাজ করে না। এই মায়েরা এতোটাই আটপৌরে যে বিশেষ দিনে কাউকে বিশেষায়িত করার কথা তারা ভাবতেই পারেন না।

একজন মায়ের দিনের অধিকাংশ সময়ই চলে যায় তার সন্তানকে লালন পালন ও সাংসারের কাজ করতে। এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, শিশু রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিবার পালনসহ একজন মা প্রতিদিন ১৪ থেকে ১৮ ঘণ্টা কাজ করেন। কিন্তু সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে এই মাকেই সবচেয়ে বেশি উপেক্ষিত হতে হয়।