তিতুমীর কলেজ কর্মচারী ও স্বাস্থ্যকর্মীদের সংঘর্ষ

ছবি: আহত তিতুমীর কলেজ কর্মচারীদের একাংশ

সরকারি তিতুমীর কলেজের কর্মচারী ও কলেজে করোনার নমুনা সংগ্রহে নিয়োজিত জোবেদা খাতুন হেলথ কেয়ারের স্বাস্থ্যকর্মীদের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন অন্তত ১৩ জন।

ছবি: আহত তিতুমীর কলেজ কর্মচারীদের একাংশ

এ ঘটনায় তিতুমীর কলেজের স্টাফ শাহাবুদ্দিন গুরুতর আহত হয়ে রাজধানীর পঙ্গু হাসপাতালে ভর্তি আছেন। তার হাতে কোপ পড়েছে। এছাড়া ৭-৮ জন ঢাকা মেডিকেল থেকে চিকিৎসা নিয়েছেন৷ দুয়েকজন কলেজের ছাত্রাবাসে থেকে চিকিৎসা নিচ্ছেন। তাদের অভিযোগ, আহত কর্মচারীদের কলেজের ভেতরে থাকা স্বাস্থ্যকর্মীরা তাদের বাসায় ঢুকতে দিচ্ছেন না। বাধ্য হয়ে তারা ছাত্রাবাসে অবস্থান নিয়েছেন।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আসা একটি ভিডিওতে দেখা গেছে, জোবেদা খাতুন হেলথকেয়ারের কর্মীরা কর্মচারীদের বাসায় গিয়েও হামলা চালায়। এ সময় তারা বাসার জিনিসপত্র ভাঙচুর করে। এক পর্যায়ে কর্মচারীরা কলেজ মসজিদের ইমামের কক্ষে আশ্রয় নিলে সেখানেও তাদের উপর হামলার ঘটনা ঘটে।

জানা গেছে, রমজানের সপ্তাহ দুয়েক আগ থেকে রাজধানীর মহাখালীর তিতুমীর কলেজে করোনা প্রতিরোধ ইউনিটের ক্যাম্প স্থাপিত হয়। সেখানে করোনার নমুনা সংগ্রহে বুথ বসানোর দায়িত্ব পায় বেসরকারি ওভাল কোম্পানি। এই কোম্পানির অধীনে জোবেদা খাতুন হেলথকেয়ার সবকিছু তত্বাবধান করে। তারা গত দুইমাস ধরে ক্যাম্প চালিয়ে আসছে কলেজ মাঠে। কিন্তু সবশেষ মঙ্গলবার রাতে তারা তিতুমীর কলেজের স্টাফদের সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে।

একাধিক প্রত্যক্ষদর্শী জানান, রাত দুইটার পর দফায় দফায় হামলা-পাল্টা হামলার ঘটনা ঘটেছে। ঘটনাস্থলেই তিতুমীর কলেজের ৪র্থ শ্রেণির কর্মচারী ও জোবেদা খাতুন হেলথকেয়ারের স্বাস্থ্যকর্মী-স্বেচ্ছাসেবকরা আহত হন।

তিতুমীর কলেজের কর্মচারীরা অভিযোগ করেন, ‘আমাদের ওপর তিনবার হামলা চালানো হয়েছে। রাত ১০টায়, ১২টায় ও রাত ২টায়।’

তিতুমীর কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর মোঃ আশরাফ হোসেন বলেন, এটা অত্যন্ত ন্যাক্কারজনক ঘটনা। আমাদের কলেজে আমাদের কর্মচারীদের রক্তাক্ত করেছে। একজনের অবস্থা খারাপ। ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ বিচার দাবি করছি৷ অন্যদিকে জোবেদা খাতুন হেলথকেয়ারের কর্ণধার ডা. সাবরিনা আরিফ চৌধুরী অভিযোগ করেন, তার নারী স্বাস্থ্যকর্মীদের ওপর হামলা করেছেন তিতুমীর কলেজের স্টাফরা। দশ জনের মোবাইল নিয়ে গেছে। ছেলেদেরকে রড দিয়ে মেরেছে। এই ঘটনায় তারা শঙ্কিত ও বিব্রত। জীবনের নিরাপত্তা চাই।

এ ঘটনায় সংবাদকর্মীদের ওপর হামলার ঘটনাও ঘটেছে। মঙ্গলবার বেলা ১২টার দিকে সংবাদকর্মীদের ওপর হামলা চালায় জোবেদা খাতুন হেলথকেয়ারের স্বাস্থ্যকর্মীরা। দুই সংবাদকর্মী জিসকা হেলথ কেয়ায়ের বক্তব্য জানতে চাইলে তাদের মারধর করেন। অশ্রাব্য ভাষায় গালাগাল করেন সাংবাদিকদের। সংবাদকর্মী পরিচয় দিলেও তারা বলেন, ‘তোরা কিসের সংবাদিক, তোদের আসতে বলছে কে, দেইখা নিমু। সবাইকে পিটামু।’

ঘটনার সূত্রপাত কীভাবে জানতে চাইলে তারা জানান, রোববার ছেলেদের থাকার জায়গায় একজন মেয়েকে ঘোরাঘুরি করতে দেখা যায়। ভেতরে প্রবেশ করতেই করোনা বুথের দু’জন ছেলে এবং একজন মেয়েকে একসঙ্গে অসৌজন্যমূলকভাবে থাকতে দেখে তিতুমীর কলেজের স্টাফরা মিলে আমরা প্রতিবাদ করি। এরপর তারা বিভিন্নভাবে হুমকি-ধমকি দিতে থাকে। সর্বশেষ সোমবার রাতে দশটার দিকে আমাদের দুইজন কর্মীকে তারা কলেজ গেইটে মারধর করে। এরপর রাত ১২টার দিকে আমরা কয়েকজন তাদের কাছে কি কারণে আমাদের কর্মীদের মারধর করা হয়েছে জানতে গেলে তারা বলেন, তোরা এখানে থাকতে চাইলে ভালোভাবে থাক না হলে, চলে যা এরপর আবার বিতর্কের এক পর্যায়ে চড়াও হয় জিসকা হেলথ কেয়ারের স্বাস্থ্যকর্মীরা। তারা তিতুমীর কলেজের কর্মীদের ধাওয়া দিয়ে বের করে দেয় ক্যাম্পাসের মূল ফটকের বাইরে। এরপর রাত দুইটা নাগাদ জোবেদা খাতুন হেলথকেয়ারের স্বাস্থ্যকর্মীরা লাঠি, চাপাতি নিয়ে তিতুমীর কলেজ কর্মীদের স্টাফ কোয়াটারে হামলা চালায়। এ সময় জোবেদা খাতুন হেলথকেয়ারের স্বাস্থ্যকর্মীরা বেশ কয়েকটি ঘরের দরজা ভেঙে ফেলে এবং এলোপাথাড়ি হামলা চালায়। এ ঘটনায় আহত হয়ে বেশ কয়েকজন হাসপাতালে ভর্তি আছেন। এর মধ্যে তিতুমীর কলেজের কর্মচারী জাবেদ ও শাহাবুদ্দীনের অবস্থা গুরুতর হলেও তাদেরকে তৎক্ষনাৎ হাসপাতালে পাঠানোর সুযোগও দেয়া হয়নি বলে জানান এক কলেজ কর্মচারী।

তবে জোবেদা খাতুন হেলথকেয়ারের স্বেচ্ছাসেবীরা অভিযোগ করে বলেন, ‘কলেজের কর্মচারীরা অনেকদিন ধরে তাদের সাথে অসহযোগীতামূলক আচরণ করছে। তাদের মনোভাব এমন, যেন এই কলেজ মাঠপর্যায়ে থেকে করোনা টেস্টের জন্য স্থাপিত বুথ গুলো উঠিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। এছাড়া কর্মচারীদের হামলায় তাদের বেশ কয়েকজন আহত হয়েছে। যাদের পরবর্তীতে নিকটস্থ হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়া হয়।

নাম প্রকাশে তিতুমীর কলেজের এক কর্মচারী জানান, ওই হেলথকেয়ারের কর্মিরা কলেজে রাতবিরাতে গান বাজনা করতো। এমনকি রমজানের তারাবির সময়ও এমন করতো। মেয়েদের অবাধ চলাফেরা ছিলো সেখানে। মহল্লার লোকজন অভিযোগ দেয়। পরে কলেজের কর্মচারীরা প্রতিবাদ করে। শুরু সেখানে থেকেই। এরপর হেলথ কেয়ারের একজন মহাখালীর গাউসুল আজম মসজিদের সামনে মেয়ের সঙ্গে অসামাজিক কার্যকলাপে ধরা পড়েন। বিষয়টা কলেজের প্রিন্সিপাল পর্যন্ত গড়ায়। পরে মীমাংসা করা হয়। এরপর গত ১ জুন রাতে কলা ভবনে তাদের একজনকে মেয়েসহ আপত্তিকর অবস্থা ধরে ফেলে কলেজ কর্মচারীরা।

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে বনানী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নুরে আজম মিয়া বলেন, ‘আমরা ঘটনার তদন্ত করছি। সুষ্ঠু ব্যবস্থা নিবো।’

অর্থসূচক/এএইচআর