‘কপোতাক্ষ’ খননে অনিয়ম ও দুর্নীতি বন্ধের দাবিতে মানববন্ধন

কপোতাক্ষ নদ
ছবি: অর্থসূচক
কপোতাক্ষ নদ
ছবি: অর্থসূচক

কপোতাক্ষ নদের খনন কাজে অনিয়ম ও দুর্নীতি বন্ধ এবং সুপেয় পানি নিশ্চিত করার দাবিতে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেছে কপোতাক্ষ ফোরাম।

শনিবার সকাল সাড়ে ১০টায় জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে এ কর্মসূচি পালন করা হয়। কর্মসূচিতে ফোরামের পক্ষ থেকে সরকারের কাছে এ প্রকল্পে দুর্নীতি বন্ধে ৭ দফা দাবিও তুলে ধরা হয়েছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) তথ্যানুযায়ী, কপোতাক্ষ নদের দৈর্ঘ্য ১৯৮ কিলোমিটার। এ নদ চুয়াডাঙ্গার জীবননগর থেকে যশোর ও সাতক্ষীরা হয়ে খুলনার পাইকগাছা উপজেলার শিববাড়ী পর্যন্ত বিস্তৃত। ২০০০ সাল থেকে যশোর ও সাতক্ষীরা অংশ পলি পড়ে ভরাট হওয়া শুরু হয়। পাউবো ২০১১ সালে নাব্য ফিরিয়ে আনতে নদের সাতক্ষীরা অংশ খননের জন্য একটি প্রকল্প গ্রহণ করে।

নদটি খননের জন্য ২০১১ সালের জুলাইয়ে চার বছর মেয়াদী একটি প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। এ প্রকল্পের আওতায় ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ২১ দশমিক ২৫০ কিলোমিটার খননের জন্য ৬১ কোটি ৮০ লাখ ৭৪ হাজার ৬০০ টাকা ব্যয় ধরা হয়। ১৫টি গ্রুপে ১২টি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে নদের ১৯ হাজার ৪৫০ মিটার, দুটি ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যানকে ৮৫৫ মিটার ও চারজন ইউপি সদস্যকে ৯৪৫ মিটার খননের জন্য কার্যাদেশ দেওয়া হয়। খননকাজের নকশা অনুযায়ী নিচের অংশে স্থানবিশেষ ১০৩-১৩০ ফুট ও ওপরের অংশে প্রস্থ ১৪৮-২০৩ ফুট এবং গভীরতা হবে ১০-১৪ ফুট।

চলতি অর্থবছরে (২০১৩-১৪) প্রথম পর্যায়ে খননের মাধ্যমে নিচের অংশে ৩৩ ফুট ও ওপরের অংশে প্রস্থ ৪৯ ফুট এবং গভীরতা সাড়ে ছয় ফুট করা হচ্ছে। দরপত্রের শর্তানুসারে খননের মাধ্যমে তোলা মাটি নদ থেকে ১৭০ ফুট দূরে ফেলার কথা। কিন্তু ঠিকাদারের লোকজন নদের মধ্যেই মাটি স্তূপ করে রাখছেন।

কপোতাক্ষ নদ খননের জন্য এক্সকাভেটর (খননযন্ত্র) দিয়ে মাটি কাটা হচ্ছে। নিচের অংশের মাটি কেটে নদের প্রস্থ ২০-২৫ ফুট এবং ওপরের অংশে প্রস্থ ৩০ থেকে ৩৫ ফুট ও গভীরতা আড়াই থেকে তিন ফুট করা হচ্ছে। খননের পর মাটি নদের ভেতরেই স্তূপ করে রাখা হচ্ছে। ফলে বৃষ্টির ছোঁয়া পেলেই সে মাটি আবার নদীতে গিয়ে ভরাট হয়ে যাবে। তাতে প্রকল্পটি ভেস্তে যাবে এবং নদী অববাহিকার ২০ লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্ধী হয়ে পড়বে বলে মানববন্ধন থেকে জানানো হয়।

এ সময় বক্তারা বলেন, কপোতাক্ষ নদ আমাদের জীবনের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। এর সাথে পাইকগাছা-কয়রা (খুলনা), তালা-পাটকেলঘাটা (সাতক্ষীরা), যশোরসহ আশপাশের এলাকার প্রায় ৫০ লাখ মানুষ জড়িত। পলি পড়ে এ নদী ভরাট হয়ে যাওয়ায় ২০০৯ সালে এর অববাহিকায় অবস্থিত বিপুল এলাকা প্লাবিত হয়। এরপর থেকে এসব এলাকায় শুরু হয়েছে স্থায়ী জলাবদ্ধতা। এ জলাবদ্ধতা কাটাতে এবং নদীর খননের জন্য ইতোমধ্যে সরকারের পক্ষ থেকে উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। কিন্তু পরবর্তীকালে সরকারের উদাসিনতা এবং খনন প্রকল্পে দুর্নীতি ও দলীয়করণ হওয়ায় কার্যত এ প্রকল্প ভেস্তে যেতে শুরু করেছে। তাই এ প্রকল্প মূল নকশা অনুযায়ী করা এবং দুর্নীতি বন্ধের জন্য সরকারের কাছে সাত দফা দাবি করছে কপোতাক্ষ ফোরাম।

কপোতাক্ষ ফোরামের দাবিগুলো হলো- জলাবদ্ধতা থেকে দেশের দক্ষিণ- পশ্চিম অঞ্চলের ৫০ লাখ মানুষের জীবন রক্ষার্থে কপোতাক্ষ খননে সব ধরনের দুর্নীতি ও অনিয়ম বন্ধ করে দ্রুত খনন কাজ সম্পাদনের জন্য প্রয়োজনে সেনা বাহিনী অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।

কপোতাক্ষ ও পাশ্ববর্তী নদীসমূহের নাব্য সৃষ্টি করে পানির প্রবাহ বৃদ্ধি ও অব্যাহত রাখার জন্য উজানে পদ্মার সাথে মাথাভাঙ্গা, ভৈরবসহ কপোতাক্ষের সংযোগ স্থাপন করতে হবে।

কপোতাক্ষ রক্ষার্থে অবৈধ দখলদার উচ্ছেদ, সীমানা পিলার স্থাপন এবং দুর্নীতিবাজদের দ্রুত খুঁজে বের করে শাস্তি দিতে হবে।
প্রতিবেশী দেশ থেকে বাংলাদেশে প্রবাহমান পদ্মা  ও তিস্তাসহ সকল নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা আদায় করতে হবে এবং অভিন্ন নদীসমূহের পানি প্রবাহ নিশ্চিত করতে হবে।

কপোতাক্ষ অববাহিকায় সকল খাল বিল জলাশয় মুক্ত রাখতে হবে ও যত্রতত্র ঘের-বেড়িসহ মৎস্য চাষ বন্ধ করতে হবে এবং অবিলম্বে মৎস্য চাষ নীতিমালা গ্রহণ করতে হবে।

দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে যোগাযোগ ব্যবস্থা নির্বিঘ্ন রাখার জন্য খুলনা-সাতক্ষীরা, যশোর-সাতক্ষীরা ও খুলনা-কয়রা মহাসড়ক বন্যা ও জলাবদ্ধতা মুক্ত করে পুনর্নির্মাণ করতে হবে।

কপোতাক্ষ অববাহিকা, বিশেষ করে আইলা দুর্গত এলাকায় পর্যাপ্ত সুপেয় পানির ব্যবস্থা, বিশ্ব ঐতিহাসিক সুন্দরবন ও জীববৈচিত্র্য রক্ষা এবং বিধ্বস্ত বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধসমূহ দ্রুত নির্মাণ করতে হবে।

অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন, খুলনার পাইকগাছা সমিতির সভাপতি জিএম কেরামত আলী, কপোতাক্ষ ফোরামের সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাড. শহিদুল ইসলাম, যুগ্ম সম্পাদক বদরু  মোহাম্মদ খালেকুজ্জামান, সাধারণ সম্পাদক সাঈদ হোসেন লাভলু প্রমুখ।

মানববন্ধন কর্মসূচিতে সভাপতিত্ব করেন কপোতাক্ষ ফোরামের সহ-সভাপতি অ্যাড. আব্দুস সালাম।

এসএই/ এআর