পুঁজিবাজারের কোন খাতে কেমন হতে পারে করোনার প্রভাব
মঙ্গলবার, ৭ই জুলাই, ২০২০ ইং
today-news
brac-epl
প্রচ্ছদ » App Home Page

পুঁজিবাজারের কোন খাতে কেমন হতে পারে করোনার প্রভাব

করোনাভাইরাস মোকাবেলায় ঘোষিত ছুটি শেষ হয়েছে কার। দীর্ঘ ৬৬ দিন পর আজ রোববার (৩১ মে) খুলছে দেশের পুঁজিবাজার। তার কিছুদিন আগেই খুলেছে শিল্প-কারখানা ও ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান। তবে এরই মধ্যে ছুটি ও করোনাজনিত অস্বাভাবিক পরিস্থিতির মারাত্মক শিকার হয়েছে বেশিরভাগ ব্যবসা-বাণিজ্য। করোনার বৈশ্বিক পরিস্থিতি এবং বিশ্বঅর্থনীতিরও প্রভাব পড়েছে অনেক খাতে। আবার দুয়েকটি খাত এই পরিস্থিতির মধ্যেও ভালো ব্যবসা করেছে।


অর্থসূচকে প্রকাশিত পুঁজিবাজার ও অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ খবরগুলো পাওয়া যাচ্ছে আমাদের ফেসবুক

গ্রুপ Sharebazaar-News & Analysis এ। গ্রুপে যোগ দিয়ে সহজেই থাকতে পারেন আপডেট।


পুঁজিবাজারে বিভিন্ন খাতের কোম্পানি রয়েছে। আর এসব খাতে করোনার প্রভাব পড়েছে নানা মাত্রায়। দেশের অন্যতম শীর্ষ ব্রোকারহাউজ ইউসিবি ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্ট লিমিটেডের গবেষণাপত্রে উঠে এসেছে বিভিন্ন খাতে করোনা-সংকটের সম্ভাব্য প্রভাব, ঝুঁকি এবং খাতগুলোর ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনার চিত্র।

ব্যাংক-এনবিএফআই
ব্যাংক এবং নন-ব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠান (এনবিএফআই) করোনায় সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত খাতগুলোর অন্যতম। এমনিতেই করোনার আগে থেকে খাত দুটি বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণ, তারল্য সংকট, ঋণের প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়াসহ নানা সমস্যায় ভুগছিল। পরে এর সঙ্গে যুক্ত হয় ঋণের সুদ হার বেঁধে দেওয়ার বিষয়।
গত জানুয়ারি মাসে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি ছিল ৯ দশমিক ২ শতাংশে, যা সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে কম প্রবৃদ্ধি। আর মার্চে এটি ৪/৫ শতাংশে নেমে এসে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
অন্যদিকে করোনা ব্যাংকের আমানতেও বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছে। অর্থনৈতিক স্থবিরতায় ব্যাংকে নতুন আমানত কমে গেছে। অন্যদিকে সাধারণ ছুটিতে অনেকের আয়-রোজগার বন্ধ থাকায় পারিবারিক ব্যয় নির্বাহে ব্যাংক থেকে তুলে নিয়েছে আমানত।
করোনা পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে বাংলাদেশ ব্যাংক জুন মাস পর্যন্ত বিভিন্ন ঋণের কিস্তি শোধ স্থগিত করেছে। তাতে ব্যাংকে তারল্য ঘাটতি বৃদ্ধির যথেষ্ট আশংকা দেখা দিয়েছে।
যেসব ভাল গ্রাহক ঋণের কিস্তি পরিশোধে নিয়মিত ছিল, করোনায় ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় এদের কেউ কেউ খেলাপি হয়ে যেতে পারে।
সব মিলিয়ে ব্যাংক ও এনবিএফআই খাত রয়েছে উচ্চ ঝুঁকিতে। আবার এই দুটি খাতের পুনরুদ্ধারের গতি হতে পারে তুলনামূলক ধীর অর্থাৎ স্বাভাবিক ধারায় ফিরতে সময় লাগতে পারে বেশ বেশি।

বস্ত্র খাত
করোনা সংকটে দেশের সবচেয়ে বড় শিল্প বস্ত্র খাত সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত। এই খাতটি মূলত রপ্তানিমুখী হওয়ায় ইউরোপ ও আমেরিকার করোনা-সংকটের তীব্র প্রভাব পড়েছে এ খাতে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপের বিভিন্ন দেশ হচ্ছে আমাদের তৈরি পোশাকের প্রধান ১০ বাজার। দেশের তৈরি পোশাক রপ্তানির ৭২ শতাংশই হয় এসব বাজারে। করোনায় এসব দেশ সম্পূর্ণ অথবা আংশিক লকডাউনে ছিল বা আছে। তাতে দেশগুলোর অর্থনীতি সাময়িকভাবে স্থবির হয়ে পড়েছে। চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত সময়ে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় তৈরি পোশাক রপ্তানি প্রায় ৯ শতাংশ কমে গেছে।
করোনাভাইরাস মহামারিতে দেশের তৈরি পোশাক তথা বস্ত্র খাত প্রচণ্ড ঝুঁকিতে। তবে এই খাতে পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনাও আছে মোটামুটি, এই সম্ভাবনাকে মাঝারি ক্যাটাগরিতে দেখা যেতে পারে।

সিমেন্ট ও ইস্পাত
দেশের সিমেন্ট এবং ইস্পাত শিল্প খাত এই মুহূর্তে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ খাতগুলোর অন্যতম। আর নানা কারণে এই দুই খাতের ব্যবসা পুনরুদ্ধার বা স্বাভাবিক গতি ফিরে পেতে সময়ও লাগতে পারে বেশি।
সরকারের বিভিন্ন অবকাঠামো প্রকল্পের উপর ভর করে গত পাঁচ বছরে সিমেন্ট খাতে বছরে গড়ে ১৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। কিন্তু লকডাউনের কারণে সরকারি প্রকল্প, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোর নির্মাণ এবং ব্যক্তিগত বাড়ি নির্মাণের মতো কাজও প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। তাতে সিমেন্টের বিক্রি কমে যায় ৮০ শতাংশের মতো। লকডাউন শেষে সরকারের অগ্রাধিকারভিত্তিক প্রকল্পগুলোর কাজ শুরু হলেও বাকী প্রকল্প এবং বেসরকারি খাতের নির্মাণ কার্যক্রমে গতি আসতে বেশ সময় লাগতে পারে।
অন্যদিকে দেশের ইস্পাত শিল্প বেশ কিছুদিন ধরেই অতি উৎপাদনসক্ষমতার সমস্যায় ভুগছে। চাহিদার তুলনায় মোট উৎপাদনক্ষমতা বেশি হওয়ায় এই খাতে অনেক বেশি প্রতিযোগিতা।
গত দুই বছরে ৫০ শতাংশ ইস্পাত পণ্যের ব্যবহার হয়েছে বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পে। করোনাজনিত আর্থিক চাপ মোকাবেলায় যদি সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি কিছুটা ধীর হয়ে পড়ে তাহলে তা ইস্পাতের চাহিদায় প্রভাব ফেলবে।
ইস্পাত শিল্পের জন্য আরেকটি বড় সমস্যা হচ্ছে অতি মাত্রায় ব্যাংক ঋণ। পুঁজিঘন এই শিল্পে মূলধনের বড় একটি অংশ ব্যাংক ঋণের মাধ্যমে মেটানো হয়, যা এই শিল্পের জন্য একটি বাড়তি চাপ। এই খাতে আগামী দিনে বিক্রি কমে যাওয়া এবং বকেয়া বেড়ে যাওয়ার আশংকা আছে।
সিমেন্ট এবং ইস্পাত শিল্পের ব্যবসা পুনরুদ্ধারের গতিও হতে পারে ধীর।

ফার্মাসিউটিক্যালস
যে দু’তিনটি খাতের ব্যবসায় করোনার নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে সবচেয়ে কম, ফার্মাসিউটিক্যালস তাদেরই একটি।
করোনাভাইরাস আতঙ্কে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ বাসার জন্যে এন্টিবায়োটিক, এন্টিভাইরাল, ভিটামিন ইত্যাদি কিনে মজুদ করেছে। তাতে কোনো কোনো ওষুধ কোম্পানির বিক্রি অনেক বেড়ে গেছে। আবার কয়েকটি কোম্পানি করোনার চিকিৎসায় ব্যবহৃত (যদিও বিশ্ব স্বাস্ত্য সংস্থা অনুমোদিত নয়) নানা ওষুধ উৎপাদন করেছে।
ফার্মাসিউটিক্যালস শিল্পে করোনার কিছুটা নেতিবাচক প্রভাব পড়ে থাকলেও তা দ্রুতই কাটিয়ে উঠতে পারবে এই শিল্প।

অন্যান্য খাত
ইউসিবি ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্টের রিসার্চ অনুসারে, টেলিকম খাতে স্বল্প থেকে মাঝারি ঝুঁকি রয়েছে। লকডাউন চলাকালীন সময়ে ভয়েস কলের পরিমাণ ২০ শতাংশের মতো কমে গেছে। অন্যদিকে ডাটা ব্যাবহার ২৫ শতাংশের মতো বাড়লেও এসব প্যাকেজে নানা ছাড় ও বোনাস দেওয়ার কারণে কোম্পানিগুলোর মার্জিন বৃদ্ধি তেমন হয়নি। তবে আগামী দিনে টেলিকম খাত দ্রুতই তাদের ব্যবসা পুনরুদ্ধারে সক্ষম হবে।
টোব্যাকো খাতে করোনার ব্যাপক প্রভাব পড়েছে। সিগারেটের বিক্রি ৫০ শতাংশের মতো কমে গেছে। অন্যদিকে করোনায় সরকারের ব্যাপক রাজস্ব ঘাটতির কারণে আগামী অর্থবছরের বাজেটে সিগারেটের উপর কর বাড়তে পারে। তবে
সাধারণ ছুটি শেষে সিগারেটের বিক্রিও বাড়তে পারে। সব মিলিয়ে এই খাতে স্বল্প থেকে মাঝারি ঝুঁকি রয়েছে। অন্যদিকে ব্যবসা পুনরুদ্ধারের গতি হতে পারে মাঝারি থেকে দ্রুত।

 

এই বিভাগের আরো সংবাদ