পোশাক শিল্পে বদলে গেল সুমাইয়াদের জীবন

পোশাক কারখানা
ছবি: ফাইল ছবি

পোশাক শ্রমিকএক সময় জীবনটাকে মনে হতো বিশাল বোঝা। প্রতিদিন বয়ে বেড়াতে কষ্ট হতো খুব। মাঝেমাঝে বিষময় মনে হতো স্নিগ্ধ সকালও। মনে হতো এভাবে সারাটা জীবন সকাল আর সন্ধ্যা গুণেগুণে পার করার চাইতে মরে যাওয়া ভালো।

কিন্তু এখন আর তেমন মনে হয় না সুমাইয়ার। বাঁচার স্বপ্ন নতুন করে ধরা দিয়েছে জীবনে। সকল প্রতিবন্ধকতা হটিয়ে স্বচ্ছলতা আর স্বাচ্ছন্দ্যকে নিজের মুঠোয় করে নিয়েছেন তিনি। তৈরি পোশাক খাত এমন অনেক সুমাইয়াকে সাহায্য করেছে জীবন যুদ্ধে জয়ী হতে।

নাটোরের সুমাইয়া আক্তার জীবন যুদ্ধে জয়ী এক যোদ্ধা। কিছু বুঝতে শেখার আগেই বাবাকে হারানো সুমাইয়া জন্ম থেকেই অন্ধ। রঙিন পৃথিবীর ঝলমলে আলোর পরশ পায়নি চোখ। তাতেও খুব আক্ষেপ ছিল না তার। কিন্তু ভাতের কষ্ট তাকে কাঁদিয়েছে।

তবে চোখে দেখতে না পাওয়া, খাবারের অভাব তাকে থামাতে পারেনি। কষ্টের মাঝেও খুলনার প্রতিবন্ধী স্কুল থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করেছেন তিনি।

এরপর গাজীপুরের কোনাবাড়ির জুরুন এলাকার কেয়া গ্রুপের পোশাক কারখানায় চাকরি নেন ২০০৮ সালে। মেয়ে শ্রমিকদের চেকারের কাজ করেন তিনি। চাকরি জীবনের প্রথম মাসে বেতন পেয়েছিলেন ৩ হাজার ৩০০ টাকা।

এরপর আর ভাতের কষ্ট করতে হয়নি সুমাইয়ার। এখন বেতন পাচ্ছেন ৬ হাজার ৮০০ টাকা। ৫ সদস্যের পরিবার চলে তার উপার্জনের পয়সা দিয়ে। দুই বছর আগে বিয়ে করেছেন আরেক অন্ধ টাঙ্গাইলের রুবেল রানাকে। তবে স্বামী কাজ না করতে পারায় পুরো সংসার তার আয়ের ওপর নির্ভর করে।

এখন কেমন আছেন জিজ্ঞেস করতেই স্বামী রুবেলের হাতটা চেপে ধরে বলেন, ‘খুব ভালো আছি। আল্লাহ আমাকে খুব সুখে রেখেছেন। এখন আর ভাতের কষ্ট হয় না। চাকরির পর থেকে পুরো সংসার আমার আয়ের ওপর নির্ভর করে। কোম্পানি থাকার জন্য একটা ঘর দিয়েছে। যেখানে পরিবার নিয়ে আছি’।

জীবনের কোনো ইচ্ছা পূরণ হয়েছে কি না জানতে চাইলে সুমাইয়া বলেন, ‘ছোট বেলা থেকেই আমার গান শেখার শখ ছিল। তবে সে সময় শিখতে পারিনি। কোম্পানির স্যার আমার গানে মুগ্ধ হয়ে ৯ হাজার ৮০০ টাকার হারমোনিয়াম কিনে দিয়েছেন। গান শেখানোর জন্য রেখে দিয়েছেন শিক্ষক।

সুমাইয়ার মতো এখন পোশাক শিল্পের ৬ হাজার প্রতিবন্ধী শ্রমিক জয় করেছেন জীবনের কষ্টকে। নিজের অবস্থান অনুযায়ী প্রশিক্ষণ নিয়ে আজ তারা সফল। বেকারত্বের বেড়াজাল থেকে বেরিয়ে তারা দক্ষ শ্রমিকের খাতায় নাম লিখিয়েছে।তাদের উপার্জনের টাকায় চলে সংসার। চলে সন্তানদের লেখাপড়া, মায়ের ওষুধ কেনা। দেওয়া হয় বিমার কিস্তি।

লক্ষ্মীপুরের বাক-প্রতিবন্ধী আব্দুল বাতেন এখন চিত্রশিল্পী। কাগজে লিখে জানতে চাইলে তিনি জানান, ২০০৬ সালে ৫ হাজার ৫০০ টাকা বেতনে সিকিউরিটি গার্ডের চাকরি নিয়েছিলেন বাতেন। পরে নিজের যোগ্যতা দিয়ে হয়েছেন চিত্রশিল্পী। কারখানায় সব ধরনের ব্যানারসহ বিভিন্ন চিত্র কিংবা লেখালেখির কাজ করেন তিনি। এখন তিনি ১২ হাজার ৫০০ টাকা বেতন পান। প্রতিমাসে মা-বাবার জন্য ৬ হাজার টাকা পাঠান গ্রামে। এক মেয়ে আর স্ত্রীকে নিয়ে সুখে আছেন বাতেন।

কুমিল্লার মুরাদনগরের বাক-প্রতিবন্ধী নাসির উদ্দিন কাজ করেন ডায়িংয়ে। ২০০৮ সালে সাড়ে ৪ হাজার টাকা বেতনে চাকরি শুরু করেন তিনি। নিজের যোগ্যতা দিয়ে হয়েছেন দক্ষ শ্রমিক। মজুরি পাচ্ছেন পুরো ১২ হাজার টাকা। পরিবারকে নিয়ে তিনিও খুঁজে পেয়েছেন সুখ।

জানা যায়, কেয়া গার্মেন্টস লিমিটেডের ওই পোশাক কারখানায় ১৪ হাজার শ্রমিকের মধ্যে ৪০ শতাংশই প্রতিবন্ধী। যার মধ্যে ১৮ জন আছেন একেবারে অন্ধ। ১৭৪ জন কিছুই করতে পারেন না। মাস শেষে এসে বেতন নিয়ে যান। বাকিগুলোর মধ্যে বেশিরভাগই বাক-প্রতিবন্ধী- যারা অতি দক্ষতার সঙ্গে কারখানাটিতে কাজ করছেন।

কেয়া গার্মেন্টসের ফায়ার সার্ভিস বিভাগের কর্মকর্তা মনির হোসেন জানান, সরকারি ছুটির পাশাপাশি প্রতিবন্ধীরা আরও ৪০ দিন ছুটি পেয়ে থাকে। বিভিন্ন সময়ে অসুস্থ হলে কোম্পানির খরচে তাদের চিকিৎসা করানো হয়। মাতৃত্বকালীন ভাতাও দেওয়া হয় তাদের।

এদিকে তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ) বলছে, তারা দেশের প্রতিবন্ধীদের সহায়তায় আরও এগিয়ে আসবে। তাদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কর্মসংস্থান, সুসংহত জীবন ও জীবিকার জন্য আরও অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। যাতে অন্য কারখানাগুলোতে তারা চাকরির সুযোগ পায়।

সংগঠনটির তথ্য মতে, কেয়া গ্রুপ ছাড়া আরও কিছু কারখানায় এমন প্রতিবন্ধী কাজ করছেন। ইন্টারস্টফ অ্যাপারেলসে মোট ৪ হাজার শ্রমিকের ৭ শতাংশই হলো প্রতিবন্ধী। টেক্স ইউরোপ (বিডি) লিমিটেডে ৭২ জন, ইউটা ফ্যাশনসে ১১ জন, বিজিএমইএতে ২ জন ও বিইউএফটিতে ১ জন প্রতিবন্ধী কর্মরত রয়েছেন।

এই বিষয়ে জানতে চাইলে সংগঠনটির সহ-সভাপতি শহীদুল্লাহ আজীম অর্থসূচককে জানান, প্রতিবন্ধী নারীদের জন্য নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে আরও সহায়তা করা হবে। এজন্য তাদের প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ করে তোলা হবে।

প্রশিক্ষিত প্রতিবন্ধীদের ইতোমধ্যে পোশাক কারখানার মালিকরা বিভিন্ন বিভাগে কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দিচ্ছে। তাতে কেয়া, ইন্টার স্টাপ ও এবা গার্মেন্টসসহ অন্যান্য কারখানা যোগ্যতার সাথে ভূমিকা রাখছে বলে জানান তিনি।

তিনি বলেন, যদি প্রতিটি কারখানায় অন্তত ৪ থেকে ৫ জন করে নিয়োগ দেওয়া গেলে ৪ হাজার কারখানাতে বড় সংখ্যক প্রতিবন্ধীর কর্মসংস্থানের সুযোগ হতে পারতো। কিন্তু এটি এখনও হয়ে উঠেনি। তবে তাদের কর্মসংস্থানের সুযোগ দেওয়ার জন্য মালিকদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।

প্রশিক্ষণের মাধ্যমে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদেরকে দক্ষ মানবসম্পদে পরিণত করা সম্ভব হলে প্রতিবন্ধীর কর্মসংস্থান হওয়ার মধ্য দিয়ে বদলে দেওয়া যেতো প্রায় ১৮ হাজার সুমাইয়া, বাতেন আর নাসিরদের মতো মানুষের জীবন।

সুমাইয়াদেরও স্বপ্ন কাজের এমন ভালো সুযোগের মধ্য দিয়ে বদলে দেওয়া যাবে রুক্ষ দুঃষহ জীবন।