তবুও আজ ঈদ
বুধবার, ৮ই জুলাই, ২০২০ ইং
today-news
brac-epl
প্রচ্ছদ » App Home Page
এমন মলিন নিরানন্দ ঈদ আসেনি আগে

তবুও আজ ঈদ

করোনাভা্‌ইরাসের তাণ্ডবে লণ্ডভণ্ড সব। থমকে গেছে জীবনের স্বাভাবিক গতি। হুমকীর মুখে মানুষের জীবন ও জীবিকা। এর মধ্যেই উঠেছে শাওয়ালের চাঁদ। এসেছে ‘খুশি’র ঈদ। প্রতি বছর রমজানের রোজার মাধ্যমে সিয়াম সাধনার সময়ে মানুষ অপেক্ষায় থাকে আনন্দের বার্তা নিয়ে কখন আসবে ঈদ। শাওয়ালের চাঁদ দেখার পর চারদিকে বেজে উঠে- ও মন, রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ। এই গানে আনন্দের, শিহরণের দোলা লাগে প্রতিটি মানুষের মনে। সেটি কেবল মুসলিমদের নয়, হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টানদেরও। হাজার বছরের অসাম্প্রদায়িক ঐতিহ্যের এই বাংলাদেশে কোনো ধর্মীয় উৎসবই যে ধর্মের সীমারেখায় আটকে থাকে না, হয়ে উঠে সবার উৎসব।

কিন্তু এই প্রথম ঈদ এসেছে মলিনবেশে। বিবর্ণ আনন্দ নিয়ে। এর আগে দূর্গা পূঁজায়ও ছিল করোনার কালো ছায়া। কিন্তু তখন করোনা সংকটের কেবল শুরু। তখনো এমন তীব্র হয়ে উঠেনি সংকট। কিন্তু দীর্ঘ সাধারণ ছুটিতে সাধারণ মানুষের আয় রোজগার বন্ধ হয়ে পড়া, অর্থ কষ্ট, খাদ্যাভাব, নানা অসুখে চিকিৎসা না পাওয়া সব মিলিয়ে জীবন হয়ে উঠেছে দেশের বেশিরভাগ মানুষের। তারউপরে আছে জীবন ও জীবিকা হারানো, ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি। আছে আগামী দিনের অনিশ্চয়তা।

অসংখ্য চাকরিজীবী এবার বেতন-বোনাস পায়নি, অনেকে চাকরি হারিয়েছে, শ্রমজীবী মানুষের আয় বন্ধ, কৃষক বেঁচতে পারেনি ফসল, জেলে পায়নি মাছের দাম, খামারেই নষ্ট হয়েছে দুধ ও ডিম, অনেক ইন্ডাস্ট্রি চালু হবে কি না আছে সে অনিশ্চয়তা, পুঁজিবাজারের বিনিয়োগকারীর ভয় পুঁজি হারানোর।

করোনার সংকটের মধ্যে দেশের একাংশ লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে ঘূর্ণিঝড় আমপানের আঘাতে। ঘর-বাড়ি হারিয়েছে হাজার হাজার মানুষ। নষ্ট হয়ে গেছে ক্ষেতের ফসল। ঝরে পড়েছে বাগানের আম-লিচু। ভেসে গেছে মাছের খামার। পোল্ট্রি আর ডেয়ারি খামারগুলো তছনছ হয়ে গেছে।

ঈদ সবার জন্যে সমান আনন্দ কখনোই আনতে পারে না। জনগোষ্ঠির একটি অংশ এখনো দারিদ্রসীমার নিচে। তাদের অনেকের সন্তানদের গায়েই ঈদের নতুন জামা-কাপড় উঠে না। কিন্তু তবু ঈদের দিনে অনন্ত একটু পিঠা-সেমাই রান্না হয়। জোটে একটু ভালোমন্দ খাবার। যারা একটু সামার্থ্যবান তারা দরিদ্রদের পাশে দাঁড়ান। নাভাবে তাদের সহায়তা করেন। তাতে সাময়িকভাবে হলেও তাদের অভাবের তীব্রতা একটু কমে। অন্তত ঈদের দিনে সন্তানের মুখে ভালো-মন্দ খাবার তুলে দিতে পারেন তারা। কিন্তু এবার সেই ‘সামর্থবানদের’ একটি বড় অংশ নিজেরাই পড়েছে তীব্র আর্থিক সংকট ও ভবিষ্যত অনিশ্চয়তায়। আর বাকীরা গুটিয়ে গেছে ভাইরাসের সংক্রমণের ভয়ে।

অতীতেও নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগ ঈদসহ নানা উৎসবে প্রভাব ফেলেছে। তবে সেটি সাধারণত হয়েছে কিছু আঞ্চলে। সারাদেশে তার প্রভাব পড়েনি। আর তাই সরকার এবং অন্যরা সহজেই তাদের পাশে দাঁড়াতে পেরেছে। তাছাড়া সাময়িক সংকট শেষে কিছু দিনের মধ্যেই জীবন আবার স্বাভাবিক গতিতে ফিরবে তেমন নিশ্চয়তা ছিল। কিন্তু এবারের সংকট কবে শেষ হবে, তার আগে কতটা তীব্র ছাপ রেখে যাবে জানে না কেউ।

এবারই প্রথম দেশে কোনো ঈদগাহ মাঠে ঈদের জামাত হচ্ছে না। প্রায় ৩শ বছরের ঐতিহ্যে ব্যতিক্রম ঘটেছে কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়া মাঠে। দেশের সবচেয়ে বড় ঈদের জামাত এখানেই অনুষ্ঠিত হয়। মসজিদে জামাত অনুষ্ঠিত হলেও সেখানে শারীরিক দূরত্ব রেখে পড়তে হয়েছে নামাজ।

ঈদ বললেই চোখের সামনে ভেসে উঠে কোলাকুলির ছবি। কিন্তু করোনা সংক্রান্ত স্বাস্থ্যবিধিতে কোলাকুলি বারণ। এই প্রথম ঈদ উদযাপিত হয়েছে কোলাকুলি ছাড়া। প্রতিবেশী, স্বজন ও বন্ধুদের সাথে দেখাসাক্ষাত, মুরব্বীদে পা ছুঁয়ে সালাম-কিছুই ছিল না এবার।

এবার দেশের লাখ লাখ মানুষের ঘরে সেমাইটিও রান্না হয়নি। দুপুরেও হাড়ি চড়বে কি-না আছে সন্দেহ।

এমন নিরানন্দ, বিষন্ন ও বিবর্ণ-মলিন ঈদ আসেনি আগে। তবু এই ঈদেই হোক প্রত্যয় ঘুরে দাঁড়ানোর। উজ্জীবিত হোক সবাই অনিশ্চিত আগামীকে মোকাবেলা করে অজানা লড়াইয়ে জয়ী হবার।

এই বিভাগের আরো সংবাদ