প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত প্যাকেজ বাস্তবায়ন কঠিন হলেও অসম্ভব নয়
বুধবার, ৩রা জুন, ২০২০ ইং
today-news
brac-epl
প্রচ্ছদ » App Home Page

প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত প্যাকেজ বাস্তবায়ন কঠিন হলেও অসম্ভব নয়

প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত প্যাকেজের সিংহভাগ অর্থ যোগান দেবে দেশের ব্যাংক খাত। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে ব্যাংক খাত কতটুকু সামর্থ্য রাখে, এটাই বড় প্রশ্ন। বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে এক লাখ কোটি টাকারও বেশি অতিরিক্ত তারল্য আছে ব্যাংকিং খাতে। কিন্তু ব্যাংকাররা বলছেন ভিন্ন কথা। বাংলাদেশ ব্যাংকসহ সংশ্লিষ্টদের সদিচ্ছা থাকলে এই প্যাকেজ বাস্তবায়ন সম্ভব বলে মত বিশ্লেষকদের।

অর্থনীতির ওপর করোনা ভাইরাসের প্রভাব কাটাতে এবং পরিস্থিতির উত্তরণে পাঁচটি প্যাকেজে ৭২ হাজার ৭৫০ কোটি টাকার আর্থিক প্রণোদনা ঘোষণা করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। যা জিডিপির প্রায় ২ দশমিক ৫২ শতাংশ। রোববার (৫ এপ্রিল) প্রধানমন্ত্রী তার সরকারি বাসভবন গণভবনে এক সংবাদ সম্মেলনে নতুন চারটি প্যাকেজে ৬৭ হাজার ৭৫০ কোটি টাকার প্রণোদনা ঘোষণা করেন। এর আগে তৈরি পোশাক খাতের জন্য পাঁচ হাজার কোটি টাকার প্যাকেজ ঘোষণা করেছিলেন সরকারপ্রধান।

সূত্র জানায়, প্যাকেজ ঘোষণার পর এ নিয়ে কাজ শুরু করেছে অর্থ মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ ব্যাংক। বিশেষ করে এ অর্থের ব্যবহার, উপকারভোগীর শ্রেণি, প্যাকেজ থেকে ঋণ নেয়া ও পরিশোধের সময়সহ বিভিন্ন দিক-নির্দেশনা নিয়ে নীতিমালা করবে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ নিয়ে খুব শিগগির প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে। এরপর প্যাকেজ বাস্তবায়নের কাজ শুরু করবে সরকারি ও বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো।

এবিষয়ে জ্যেষ্ঠ ব্যাংকার ও অগ্রণী ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ার আহমেদ বলেন, পরিস্থিতির বিবেচনায় খুবই ভালো প্যাকেজ ঘোষণা করেছেন প্রধানমন্ত্রী। তবে এর যথাযথ বাস্তবায়নের বিষয়টা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এমনিতেই ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো আমানত পাচ্ছে না। ফলে দীর্ঘদিন থেকে কমে চলেছে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ। এরমধ্যে এসব প্যাকেজের টাকা যোগান দেওয়া ব্যাংকগুলোর জন্য চ্যালেঞ্জিং। তবে এটি অসম্ভব কিছু নয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের থেকে রেপো রেট, সিএসআর, এসএলআর সহ নীতিগত সহায়তা প্রদান করলে ব্যাংকিং খাতে তারল্য বাড়বে। সংকটকালীন নির্দিষ্ট খাতে ব্যয় করতে পারবে সেই অর্থ। এখন বাংলাদেশ ব্যাংক কিভাবে এবং কি পরিমাণ টাকা ছাড়বে তার উপর নির্ভর করবে প্যাকেজ বাস্তবায়ন।

অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের সাবেক চেয়ারম্যান ও মেঘনা ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক নুরুল আমিন বলেন, করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব কতদিন থাকবে তা কেউ জানে না। তারপরেও আর্থিক খাতকে শক্তিশালী করতে যে তাৎক্ষণিক প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়েছে তা প্রশংসনীয়। করোনা সমস্যা দীর্ঘমেয়াদী হলে নতুন করে আরও সহযোগিতার প্রয়োজন হতে পারে। বাংলাদেশ ব্যাংক ইতিমধ্যেই যেসব নীতিগত সহযোগিতা প্রদান করেছে এবং ভবিষ্যতে করবে, তা যেন প্রকৃত ব্যক্তিরা পায়। ইচ্ছাকৃত খেলাপি বা দুর্নীতিবাজদের পক্ষে না গেলেই এই উদ্যোগ সফল হবে। প্যাকেজটির বাস্তবায়নে বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিগত সহায়তার কোন বিকল্প নেই। তবে সার্বিক বিবেচনায় বর্তমানে স্বাস্থ্য খাতের ব্যয় বৃদ্ধি করা দরকার বলে মনে করেন সাবেক এই জ্যেষ্ঠ ব্যাংকার।

প্রধানমন্ত্রীর নতুন করে ঘোষিত চার প্যাকেজের মধ্যে প্রথম প্যাকেজে ক্ষতিগ্রস্ত শিল্প ও সার্ভিস সেক্টরের জন্য ৩০ হাজার কোটি ঋণ সুবিধা দেয়া হবে। এ ঋণ সুবিধার সুদের হার হবে ৯ শতাংশ। সুদের অর্ধেক সরকার ভর্তুকি দেবে। বাকি অর্ধেক দিতে হবে উদ্যোক্তাদের।

দ্বিতীয় প্যাকেজে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল হিসেবে ২০ হাজার কোটি টাকার একটি ঋণ সুবিধা দেয়া হবে। এর সুদ হারও হবে ৯ শতাংশ। তবে এ ক্ষেত্রে সরকার ৫ শতাংশ সুদ ভর্তুকি দেবে। এ দুই প্যাকেজে ভর্তুকি বাবদ সরকারের খরচ বাড়বে কমই। কারণ এতে সব মিলিয়ে খরচ হবে মাত্র তিন হাজার কোটি টাকা। এই তিন হাজার কোটি টাকা বাজেট থেকে দেয়া হতে পারে। এ ক্ষেত্রে পরিচালন ঋণ থেকে তা নেয়া হতে পারে। ভর্তুকি বাদে পুরো টাকাটাই আসবে ব্যাংকিং খাত থেকে।

ঘোষিত চারটি প্যাকেজের বাকি দুটি মূলত তহবিল। এর একটি হলো এক্সপোর্ট ডেভেলপমেন্ট ফান্ড (ইডিএফ)। ব্লক টু ব্লক এলসির আওতায় কাঁচামাল আমদানি সুবিধা বাড়াতে সরকার শুধু এর আকার বাড়িয়েছে। এতে অতিরিক্ত ১২ হাজার ৭৫০ কোটি টাকা যুক্ত হবে। এ টাকার পুরোটাই দেবে বাংলাদেশ ব্যাংক। এছাড়া প্রিশিপমেন্ট ক্রেডিট রিফাইন্যান্স স্কিম নামে বাংলাদেশ ব্যাংক পাঁচ হাজার কোটি টাকার একটি নতুন ঋণ সুবিধা চালু করবে। এটিও বাংলাদেশ ব্যাংক পরিচালনা করবে।

সাধারণত দেশে তফসিলি সরকারি-বেসরকারি ব্যাংকগুলো সব সময়ই ঋণ দিয়ে থাকে। যে চারটি নতুন প্যাকেজের ঘোষণা এসেছে তার সব সুবিধাই মূলত ঋণ হিসেবে গণ্য হবে। আর এ ঋণ আসবে সেই ব্যাংকগুলো থেকেই। অর্থাৎ এ ক্ষেত্রে সরকারকে কিছুই করতে হচ্ছে না। যা করার ব্যাংকগুলোই করবে। ব্যাংক-গ্রাহক সম্পর্ক ভিত্তিতে এ ঋণ দেওয়া হবে।

এছাড়া রফতানিমুখী শিল্পের জন্য আগেই ঘোষিত ৫ হাজার কোটি টাকার প্যাকেজ থেকে ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে ইতোমধ্যে নীতিমালা প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। যেসব প্রতিষ্ঠানের মোট উৎপাদিত পণ্যের ৮০ শতাংশ পণ্য রফতানি হয় সেসব প্রতিষ্ঠান শ্রমিকদের বেতন-ভাতা দেয়ার জন্য ঋণ নিতে পারবে। এক্ষেত্রে শিল্পমালিকরা ২ শতাংশ সার্ভিস চার্জ দিয়ে এ ঋণের সুবিধা নিতে পারবেন।

অর্থসূচক/জেডএ/কেএসআর

এই বিভাগের আরো সংবাদ