কৃষকের দিকে নজর দেয়ার আহ্বান কাজী খলীকুজ্জমানের
বৃহস্পতিবার, ২৮শে মে, ২০২০ ইং
today-news
brac-epl
প্রচ্ছদ » App Home Page
কৃষিতে করোনার প্রভাব

কৃষকের দিকে নজর দেয়ার আহ্বান কাজী খলীকুজ্জমানের

বাংলাদেশের অর্থনীতিকে শক্ত ভিতের ওপর দাঁড় করাতে যারা অগ্রণী ভূমিকা পালন করে আসছেন, তাদের মধ্যে প্রথম সারিতে রয়েছেন কৃষক। করোনা ভাইরাসের প্রভাবে চলমান সংকটকালে কৃষক যেন তার উৎপাদিত ফসল ঠিকভাবে ঘরে তুলতে পারে সেদিকে সরকারকে নজর দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) চেয়ারম্যান ড. কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ।

তিনি বলেন, কৃষক যেন ধান কাটতে গিয়ে শ্রমিক সংকটে না পড়ে এটায় নজর দিতে হবে। স্বাস্থ্য বিধি মেনে এটা যেন করা হয়। কৃষকের উৎপাদিত ফসলের ন্যায্য দাম পাওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। প্রয়োজনে সরকার কৃষি শ্রমিকদের যেন পর্যাপ্ত সুরক্ষা সামগ্রী দেয়। আর পণ্য পরিবহনের ব্যবস্থা করে। কৃষককে যেন বীজ সহ সহজ শর্তে ঋণ দেয়া হয়। এখানে প্রণোদনারও প্রয়োজন আছে। এজন্য খুব দ্রুত তথ্য ভিক্তিক পরিকল্পনা করে কাজে নেমে যেতে হবে। মনে রাখতে হবে কৃষি এবং গ্রামে যে কৃষি বহির্ভূত কাজ হচ্ছে তার জন্য আমাদের প্রবৃদ্ধির ভিতটা শক্ত আছে।

বর্তমান করোনা ভাইরাস পরিস্থিতিতে কৃষি সেক্টরে বাংলাদেশের করণীয় নিয়ে ড. কাজী খলিকুজ্জমান আহমদের কাছে জানতে চাওয়া হলে অর্থসূচককে তিনি এসব কথা বলেন।

স্বাধীনতা পুরস্কার জয়ী এ অর্থনীতিবিদ বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা খাদ্য উৎপাদন বাড়াতে গুরুত্ব দিয়েছেন। এ ব্যপারে ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রধানমন্ত্রী যেগুলো কৃষিমন্ত্রীকে বলেছেন, সেগুলো ব্যবস্থা নেয়ার জন্য যেখানে যেটা দরকার সেখানে নজর দিতে হবে। এপ্রিল থেকেই আসছে আগাম বোরো। মে-জুন মাসে দেশজুড়ে বোরো ধান কাটা হবে। আমাদের চালের ৬০ থেকে ৬৫ শতাংশ আসে বোরে থেকে। বোরোর দিকে খুব বেশি নজর দিতে হবে।

বোরো ধানের বিষয় কয়েকটি দিক লক্ষ্য রাখার পরামর্শ দিয়ে ড. কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ বলেন, এই বোরোর দিকে নজর দেয়ার কতগুলো দিক আছে। একটা হলো, যখন ফসল তোলা হয় তখন দেখা যায় অনেক সময় বাজ (বজ্রপাত) পড়ে, এই ভয়ে শ্রমিক পাওয়া যায় না। গত বছর দেরিতে ফসল কাটা হয়েছে। এমন অনেক বছরই দেরিতে দেখেছি। এবার যোগ হচ্ছে অন্য (করোনা নিয়ে) সমস্যা। সুতরাং এখানে খেয়াল রাখতে হবে, ফসল তোলাটা নিশ্চিত করতে হবে।

তিনি বলেন, এটা কীভাবে করা যায়, তার জন্য যা যা ব্যবস্থা করা প্রয়োজন সেটা সরকারকে করতে হবে। শ্রমিক যদি ভয়ে ফসল কাটতে না যায় তাদের কীভাবে নেয়া যাবে সেই পরিকল্পনা করতে হবে। সেটা যেন স্বাস্থ্যসম্মতভাবে করা হয় এটাও দেখতে হবে। আগে থেকেই চিন্তা করে সব ঠিক করতে হবে। বোরোর ব্যাপারে এটা গুরুত্বপূর্ণ দিক আমি মনে করি।

ফসল উৎপাদন করে সরবরাহ জনিত সমস্যার জন্য কৃষক যেন বিপাকে না পড়ে সে দিলে লক্ষ্য রাখতে হবে জানিয়ে ড. কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ বলেন, সরবরাহ চেইন সচল রাখতে হবে। কৃষকের উৎপাদিত সবজি যেখানে যেমন প্রয়োজন সেখানে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করতে হবে।

তিনি বলেন, দেখা যাবে অনেক কৃষকের কাছে হয়তো ভাল বীজ নেই সেটা তাকে দিতে হবে। তারপর অন্যান্য উপকরণ লাগবে সেই উপকরণ কৃষকদের কাছে পৌঁছে দেয়া। পৌঁছে দেয়ার জন্য যানবাহন লাগবে, সাধারণ যানবাহনে হবে না। এটা যাবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও)কিছু নিয়ম কানুন আছে সে নিয়ম কানুন মেনে। সেগুলো আগে থেকে চিন্তা করতে হবে। আগে থেকে এসব বিষয় যদি ঠিক করে রাখা না হয় তাহলে আমাদের বীজ থাকলেও সেটা হয়তো পৌঁছানো যাবে না।

‘ডব্লিউএইচওর যে নিয়ম কানুন আছে সেই নিয়ম কানুন মেনে তাদের কাছে পৌঁছাতে হবে। কাজেই আমি মনে করি বোরো মৌসুমকে খুবই গুরুত্ব দিতে হবে, সঙ্গে অন্যান্য যে ফসল আছে ভুট্টাও চলে আসছে এরই মধ্যেই। এ বিষয়েও লক্ষ্য রাখতে হবে।’

কৃষককে নিবিড় পর্যএবেক্ষণ করে তাদের যার যা প্রয়োজন সেটা দেয়ার পরামর্শ দিয়ে ড. কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ বলেন, সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে এ তথ্যটাতো জানতে হবে কার কী নেই, কার কোনটা লাগে, কোথায় লাগে। সেটা এখন থেকেই শুরু করতে হবে। হাতে সময় নেই। খুব তাড়াতাড়ি তথ্য সংগ্রহের কাজটা শুরু করতে হবে। যাতে আমরা জানি, কোথায় কী দিতে হবে। কারও হয়তো বীজ নেই, বীজ লাগবে। কারও হয়তো বীজ আছে, কিন্তু পানির ব্যবস্থার সমস্যা আছে। সেই সমস্যা সমাধান করতে হবে। মোটকথা যার যেটা লাগে সে ব্যবস্থা করতে হবে। এসব সহায়তা কীভাবে পৌঁছে দেয়া যায় সেইটার ব্যবস্থা করতে হবে।

কৃষককে বিনা সুদে ঋণ দেয়ার পরামর্শ দিয়ে পিকেএসএফ চেয়ারম্যান বলেন, ধান উঠলে ওই সময়ে কৃষক যাতে হুট করে সব বিক্রি করে না দেয় সেই জন্য তাদেকে সহজ শর্তে বা বিনাসুদে ঋণের ব্যবস্থা করতে হবে। এটা করা হলে কৃষক ধান সংরক্ষণ করে পরে বিক্রিতে উৎসাহী হবে। এটা করা হলে ধানের ন্যায্য দাম পাবে কৃষক। কৃষিকাজ করার জন্যও এ ঋণের দরকার হতে পারে। এছাড়া সরকারকে কৃষকের কাছ থেকে ধান কেনা বাড়ানোর পরামর্শ দেন তিনি।

সরকারকে সার্বিক বিষয়ে তথ্য নিয়ে রাখার পরামর্শ দিয়ে ড. কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ বলেন, সব তথ্য সরকারের কাছে থাকার কথা না। কারণ সমস্যাতো মাত্র ঘটেছে। এই তথ্য যোগার করতে হবে। কার কোথায় কোনটা লাগবে, তারপর সেটা পৌঁছে দেয়ার ব্যবস্থা করতে সেখানে জনবল লাগবে। সেখানে স্বাস্থ্য সম্মত যানবাহনের ব্যবস্থা লাগবে। সবাইকে স্বাস্থ্য বিধি মেনে চলতে হবে। এটা সঠিকভাবে করতে হবে। এটা খুবই জরুরি। আমরা যদি সবার জন্য খাদ্য নিশ্চিত করতে চাই তাহলে এটা করতে হবে। বোরোতে যদি মার খাই তাহলে আরও সমস্যায় পড়তে হবে।

করোনার প্রভাবে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির সম্মুখিন হতে হবে মন্তব্য করে ড. কাজী খলিকুজ্জমান আহমদ বলেন, সারা দেশে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা প্রচুর হয়েছে। এটাতে একটা বড়ভাবে ধাক্কা লাগবে। এখানে সরকারকে নজর দিতে হবে। এসব উদ্যোক্তারা ঋণ নিয়েই ব্যবসা শুরু করে। তাদের হয়তো ঋণ আদায়টা পিছিয়ে দিতে হবে। আরও ঋণ লাগলে সেটা তাকে সহজ শর্তে দিতে হবে। এমনকি অনুদানও দেয়া দরকার। বড় -বড়দের না দিয়ে এমন ছোট উদ্যোক্তাদের অনুদান দিতে হবে।

সরাদেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সম্পর্কে এখনই তথ্য নেয়ার পরাপর্শ দিয়ে এ অর্থনীতিবিদ বলেন, ছোট-ছোট উদ্যোক্তা আছে সারা দেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে। সেটারও তথ্য বেশি নেই। কিছু তথ্য আছে আমাদের কাছে, পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের কাছে যে তথ্য আছে, এছাড়া সরকারের বিভিন্ন সংস্থার কাছে তথ্য আছে সেটার ভিক্তিতে কাজ করা দরকার। যাতে এসব উদ্যোক্তারা স্বাভাবিক ভাবে চলতে পারে। তারা যেন চলতে পারে অথবা যে অবস্থায় আছে সেটা যেন ধরে রাখতে পারে। আমাদের প্রবৃদ্ধি যে হয় সেটার ভিতটা কিন্তু গ্রামীণ অর্থনীতিতে। গ্রামের কৃষি এবং কৃষিবর্হিভূত কাজের ভিতটা শক্ত আছে সে জন্য।

বাংলাদেশের জনগণের ভেতরে বিপদে ঘুরে দাড়াবার শক্তি আছে মন্তব্য করে ড. কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ বলেন, করোনার প্রভাব কতদিন থাকবে সেটা বোঝা যাচ্ছে না। এই ভাবেই যদি চলে তাহেল অত বেশি ক্ষতি হবে না, আমরা ঘুরে দাঁড়িয়ে যেতে পারবো। বাংলাদেশিদের মধ্যে একটা আন্তঃশক্তি আছে তারা এমন দুঃসময়ে ঘুরে দাঁড়ায়। ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে, সচেষ্ট থাকে।

তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় সবাই এক হয়েছিল, ১৯৯৮ সালের বন্যাতেও সবাই এক হয়েছিল। এই বারও আমি আশা করছি এভাবে সবাই এগিয়ে আসবে, সচেতন থাকবে। সরকারি প্রনোদনা যেটা আছে সেটা তো আছেই। যে কাজ আমি বললাম সেটা সরকার বা তার প্রতিষ্ঠানকে করতে হবে।

কৃষি সম্প্রসারণ কেন্দ্র আছে, বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিআরআরআই), বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি) আছে; তারা এ কাজগুলো করবে। তারপরেও এ বাংলাদেশে মানুষ বিপদে একে অন্যেকে সহায়তা করে। সেটা আমরা আগে দেখছি, এবারও হয়তো হবে। সবাই মিলে এই সংকট কাটিয়ে উঠতে পারবো। আর এ জন্য খুব দ্রুত পরিকল্পনা এবং তথ্য ভিক্তিক পরিককল্পনা করে কাজে নেমে যেতে হবে। পরিস্থিতি উত্তোরণে এর কোন বিকল্প নেই বলে মনে করেন ড. কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ।

অর্থসূচক/এমআরএম/কেএসআর

এই বিভাগের আরো সংবাদ