করোনা সংকটে উদ্বিগ্ন ক্ষুদ্র শিল্প উদ্যোক্তারা
সোমবার, ২৫শে মে, ২০২০ ইং
today-news
brac-epl
প্রচ্ছদ » App Home Page

করোনা সংকটে উদ্বিগ্ন ক্ষুদ্র শিল্প উদ্যোক্তারা

২০১০ সালে ছোট পরিসরে ব্যবসা শুরু করেছিলেন হাসিনা মুক্তা। অনেক বাধা পেরিয়ে, সংগ্রাম করে এগিয়ে নিচ্ছিলেন তার তার ‘নতুনত্ব বুটিকস ও হস্তশিল্প’ প্রতিষ্ঠানটি। গত তিন বছরে বেশ ভালোই উন্নতি হয়। কিন্তু করোনা ভাইরাসের কারণে হোঁচট খেল তার অগ্রযাত্রা। এরই মধ্যে পণ্য বিক্রি বন্ধ হয়ে সংকটে পড়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

প্রতিষ্ঠানের ভাড়া, কারখানার কর্মচারীদের বেতন, ইউলিটি বিল সব মিলিয়ে মাসে তার খরচ আড়াই লাখ টাকা। হাসিনা মুক্তা বলছেন, এই সংকটকালে ব্যবসাটা টিকিয়ে রাখাই তার জন্য কঠিন।

হাসিনা মুক্তার মতো এমন অনেক ছোট উদ্যোক্তা এখন শঙ্কিত সামনে ব্যবসা টিকিয়ে রাখা নিয়ে। এই সংকটকালে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের (এসএমই) জন্য সরকারকে ফান্ড গঠনের পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের।

উদ্যোক্তারা বলছেন, তাদের জন্য নিতে হবে বিশেষ পদক্ষেপ। অন্যথায় তারা টিকে থাকতে পারবেন না।

করোনা ভাইরাস সংকটের পরিপ্রেক্ষিতে করণীয় নির্ধারণ করতে আজ (৩০ মার্চ) প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ে এ-সংক্রান্ত একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। সেখানে এসএমই খাতে সহায়তার প্রস্তাব উঠবে বলে জানা গেছে।

হাসিনা মুক্তা বলেন, সাধারণত পহেলা বৈশাখ ও ঈদুল ফিতরকে এসএমই পণ্য বিক্রির প্রধান মৌসুম বলে ধরা হয়। এ বড় দুটো টার্গেট নিয়ে আমরা পণ্য তৈরি করি। প্রতি বছর এ সময় উল্লেখযোগ্য পণ্য বিক্রি হয় আমাদের। কিন্তু এখন আমাদের সবার কাজই বন্ধ। আমরা বড় বিপদের মধ্যে আছি, ঝুঁকির মধ্যে আছি। আমি আরও কয়েকজন উদ্যেক্তার সঙ্গে কথা বলেছি। কিন্তু বুঝতে পারছি না কীভাবে এ সংকট কাটিয়ে উঠব। অফিস ভাড়া ও কর্মচারীদের বেতন দেওয়াটাই চ্যালেঞ্জ হয়ে পড়বে। এসএমই উদ্যোক্তাদের ব্যবসা শুরুটা হয় লোন-টোন নিয়ে।

২০১৪ সালে দেশের সফল যুব আত্মকর্মীর পুরস্কার পাওয়া হাসিনা মুক্তা বলেন, আমাদের নিজস্ব ফান্ড তেমন থাকে না। আমরা ব্যাংক বা অন্য কোনো উৎস থেকে লোন নিই, প্রতি মাসে লোনের কিস্তি পরিশোধ করতে হয়। যারা বড় শিল্প উদ্যোক্তা তারা একটা অবস্থানে চলে গেছেন। ব্যবসায় আমরা মাত্র ওঠার চেষ্টা করছি। হাঁটা শিখছি। তার মধ্যে এমন পরিস্থিতি আমাদের বড় ক্ষতি। এখন সরকার আমাদের জন্য কিছু না করলে বেশির ভাগই ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা বেশি।

রাজধানীর সায়দাবাদে ফ্যাক্টরির অবস্থান জানিয়ে হাসিনা মুক্তা বলেন, আমার স্টাফ আছে ১৫ জন। আমার ফ্যাক্টরির ভাড়া, স্টাফের বেতন নিয়ে মাসিক খরচ আড়াই লাখ টাকা। এখন বিক্রি বন্ধ। প্রতি মাসে আড়াই লাখ টাকা কোথা থেকে দেব? তারপর এসএমই লোন পরিশোধ করতে হবে।

বড় শিল্প প্রতিষ্ঠান সরকারের কাছে যে ধরনের প্রণোদনা পেয়েছে, এসএমই খাতেও প্রণোদনার ব্যবস্থা কিংবা ফান্ড গঠনের দাবি জানান তিনি।

গত বুধবারের ভাষণে প্রধানমন্ত্রী রপ্তানিমুখী শিল্প খাতের জন্য ৫ হাজার কোটি টাকার তহবিলের ঘোষণা দিয়েছেন। সেখানে স্পষ্টই উল্লেখ করা হয়েছে এ ধরনের শিল্পের শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা পরিশোধে এ অর্থ ব্যয় হবে। তবে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প উদ্যোক্তাদের বেশির ভাগের ব্যবসাই স্থানীয় বাজারকেন্দ্রিক। ফলে তাদের পক্ষে এ তহবিল থেকে সহায়তা পওয়ার সুযোগ কম। তাই তাদের জন্য যেন বিশেষ ব্যবস্থা রাখা হয় এটাই চাওয়া এসএমই উদ্যোক্তাদের।

বর্তমান পরিস্থিতিতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা বেশি সমস্যায় পড়েছে এবং তাদের প্রতি সরকারের বিশেষ নজর দিতে হবে বলে মনে করেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন। তিনি বলেন, এখানে যারা শ্রমে নিয়োজিত তাদের কর্মসংস্থানের কী হবে সেটা ভাবতে হবে।

ভর্তুকি পুনর্বিন্যাস করা প্রয়োজন বলে উল্লেখ করে ড. ফাহমিদা বলেন, বড় খাতগুলোকে না দিয়ে ছোট খাতগুলোতে যারা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে তাদের যাতে দেয়া যায়, সেভাবে পুনর্বিন্যাস করা প্রয়োজন। উৎপাদন খাতে, কৃষি খাতে, ক্ষুদ্র মাঝারি শিল্পখাতে যাদের নতুন করে ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তাদের দিকে নজর রাখতে হবে।

করোনা পরিস্থিতিতে উদ্যোক্তাদের জন্য করণীয় নির্ধারণে আজ (৩০ মার্চ) প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ে এক বৈঠকে আলোচনা হবে বলে জানান এসএমই ফাউন্ডেশনের মহাব্যবস্থাপক ফারজানা খান। তিনি বলেন, শিল্প মন্ত্রণালয়ের সচিব সেখানে থাকবেন। শিল্প মন্ত্রণালয় থেকে আমরা এ ব্যাপারে কিছু নির্দেশনা পেয়েছি। এসএমই উদ্যোক্তাদের পণ্য বিক্রির দুটি বড় উপলক্ষ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এ বিষয়ে করণীয় সম্পর্কে আমরা একটা প্রস্তাব তৈরি করেছি। আর্থিক প্রণোদনা দেয়াসহ ফান্ড গঠনের প্রস্তাবও আছে। আমরা তাদের সমস্যাগুলো চিহ্নিত করছি।

এসব প্রস্তাব প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে তুলে ধরা হবে বলে জানান এসএমই ফাউন্ডেশনের মহাব্যবস্থাপক।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের (বিআইডিএস) সিনিয়র রিসার্চ ফেলো ড. নাজনীন আহমেদ বলেন, বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা বেশি। তাদের চেয়ে বর্তমান প্রেক্ষাপটে অণু ও ক্ষুদ্র শিল্পের জন্য সহায়তা সবচেয়ে বেশি জরুরি। এর সাথে যারা জড়িত, তারা অতি অল্প পুঁজিতে ব্যবসা করেন। তাদের টিকে থাকার সক্ষমতা কম। দ্রুত একটা জরুরি ফান্ড গঠন করা প্রয়োজন, যেখান থেকে ক্ষতিগ্রস্ত উদ্যোক্তাদের রিফাইন্যান্সিং স্কিমে টাকা দেয়া হবে।

ওয়ার্ল্ড এসএমই ফোরামের তথ্য অনুসারে, এসএমই খাতে প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৮ লাখ ৫০ হাজার। আর এ খাতে কর্মসংস্থানের পরিমাণ ৭৩ লাখ। কর্মসংস্থান সৃষ্টির বিবেচনায় এটা বিশ্বের পঞ্চম বৃহত্তম।

অর্থসূচক/এমআরএম/কেএসআর

এই বিভাগের আরো সংবাদ