এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে যুগান্তকারী সাড়া

ক্রমেই বাড়ছে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের গ্রাহক সংখ্যা। গ্রামীণ জনগোষ্ঠী এখন সহজেই টাকা জমা রাখতে পারছে ব্যাংকে। প্রবাসীদের পাঠানো অর্থও সহজে পৌঁছে যাচ্ছে। আবার ঋণও পাওয়া যাচ্ছে এখান থেকে। এর মাধ্যমে ব্যাংকিং সেবা ছড়িয়ে পড়ছে গ্রামগঞ্জে। চাঙাও হচ্ছে প্রত্যন্ত এলাকার ব্যবসা-বাণিজ্য। যাতে বদলে যাচ্ছে গ্রামীণ অর্থনীতি।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সাল শেষে এজেন্টের মাধ্যমে খোলা মোট হিসবা সংখ্যা ৫২ লাখ ৬৮ হাজার ৮৯৬টি। কিন্তু এক বছর আগেও এ সংখ্যাটি ছিল ২৪ লাখ ৫৬ হাজার ৯৮২টি। সুতরাং বছরের হিসাব খোলার প্রবৃদ্ধি ১১৪ শতাংশ। তবে এর বেশিরভাগ হিসাবই খোলা হয়েছে মাত্র পাঁচ ব্যাংকে। এ সেবায় ২০ লাখ ৮ হাজার গ্রাহক তৈরি করে শীর্ষে রয়েছে ডাচ্‌-বাংলা ব্যাংক। এরপরই ব্যাংক এশিয়া তৈরি করেছে ১৯ লাখ ১৬ হাজার। সেবাটি চালুর অল্প দিনেই ইসলামী ব্যাংক পেয়েছে ৪ লাখ ৬১ হাজার গ্রাহক। আর শহরের তুলনায় গ্রামাঞ্চলে এই ধরনের সেবার হিসাব খোলা হয়েছে প্রায় ৫ গুণ বেশি। ফলে এর মাধ্যমে ব্যাংক সেবা যে গ্রামে পৌঁছে গেছে, তা প্রতীয়মান হয়।

শুধু গ্রাহক হিসাবের দিক থেকে নয় এজেন্ট ও আউটলেট বিস্তৃতিতেও শীর্ষে অবস্থান করছে ডাচ্‌-বাংলা ব্যাংক। ব্যাংকটির আউটলেট সংখ্যা ৩ হাজার ৭৭১টি। এর পরেই রয়েছে ব্যাংক এশিয়া। ৩ হাজার ৫২৫টি আউটলেট নিয়ে দিত্বীয় স্থানে রয়েছে ব্যাংকটি। পর্যাক্রমে এর পরেই রয়েছে ইসলামী ব্যাংক, এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংক ও মধুমতি ব্যাংক।

তবে সবচেয়ে বেশি আমানত পেয়েছে পর্যায়ক্রমে ইসলামী ব্যাংক, ডাচ্‌-বাংলা, আল-আরাফাহ্‌ ইসলামী ব্যাংক, ব্যাংক এশিয়া ও অগ্রণী ব্যাংক।  আলোচ্য সময়ে ৭ হাজার ৫১৭ কোটি টাকার আমানত সংগ্রহ করেছে ব্যাংকগুলো। আর এজেন্টের মাধ্যমে এই পাঁচ ব্যাংক সংগ্রহ করেছে মোট আমানতের ৮৬ শতাংশ।

২০১৯ শেষে এজেন্টের মাধ্যমে ঋণ বিতরণ হয়েছে ৪৪৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে ব্যাংক এশিয়া একাই দিয়েছে ২৫৯ কোটি টাকা। যা মোট বিতরণের ৫৮ শতাংশ। এই তালিকায় পর্যাক্রমে আরও রয়েছে ব্র্যাক ব্যাংক, সিটি ব্যাংক, ডাচ-বাংলা ও আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক। মোট বিতণের ৯৮ দশমিক ৪২ শতাংশই দিয়েছে এই পাঁচ ব্যাংক।

এজেন্টদের মাধ্যমে গত ডিসেম্বর পর্যন্ত মোট ১৫ হাজার ৫৩৪ কোটি টাকার প্রবাসী আয় রেমিট্যান্স বিতরণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ডাচ্‌-বাংলা ৬ হাজার ৯০ কোটি টাকা, ব্যাংক এশিয়া ৩ হাজার ৬৫৬ কোটি টাকা, ইসলামী ব্যাংক ২ হাজার ৮২৮ কোটি টাকা, আল-আরাফাহ্‌ ইসলামী ব্যাংক ১ হাজার ৮০৬ কোটি টাকা এবং অগ্রণী ব্যাংক এনেছে ৭০৫ কোটি টাকা।

জানা যায়, বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে ব্রাজিলে প্রথম এজেন্ট ব্যাংকিং সেবা চালু হয়। আর বাংলাদেশে এজেন্ট ব্যাংকিং সেবা চালু হয় ২০১৪ সালে। বাংলাদেশ ব্যাংক ২০১৩ সালের ৯ ডিসেম্বর এজেন্ট ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনাসংক্রান্ত নীতিমালা জারি করে। ২০১৪ সালের জানুয়ারিতে প্রথম এজেন্ট ব্যাংকিং সেবা চালু করে ব্যাংক এশিয়া। পাইলট কার্যক্রম শুরু করে মুন্সিগঞ্জ জেলার সিরাজদিখান উপজেলায়। জৈনসার ইউনিয়নের ব্যবসায়ী ইসলাম শেখকে প্রথম এজেন্ট হিসেবে নিয়োগ প্রদান করে ব্যাংকটি।

বাংলাদেশ ব্যাংক প্রতিবেদনটিতে বলেছে, এজেন্ট ব্যাংকিং বিকাশের অন্যতম কারণ হলো আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর ও ব্যয়সাশ্রয়ী সেবা প্রদান। এজেন্ট আউটলেটে একজন গ্রাহক সহজেই তার বায়োমেট্রিক বা হাতের আঙুলের স্পর্শের মাধ্যমে হিসাব পরিচালনা করতে পারেন। গ্রামীণ জনপদের আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে এজেন্ট ব্যাংকিং তাই কার্যকরী একটি উদ্যোগ বলে বিবেচিত হচ্ছে। এ জন্য ব্যাংকগুলোও তাদের এজেন্ট ব্যাংকিং কার্যক্রম প্রতিনিয়ত প্রসারিত করছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিমালা অনুযায়ী, এজেন্ট ব্যাংকিং পরিচালনার জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের সঙ্গে প্রত্যেক এজেন্টের একটি চলতি হিসাব থাকতে হয়। এ সেবার মাধ্যমে ছোট অঙ্কের অর্থ জমা ও উত্তোলন করা যায়। প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স স্থানীয় মুদ্রায় বিতরণ, ছোট অঙ্কের ঋণ বিতরণ ও আদায় এবং এককালীন জমার কাজও করতে পারছেন। উপযোগ সেবা বিল পরিশোধের পাশাপাশি সরকারের অধীনে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির অর্থ প্রদান করতে পারছেন এজেন্টরা। এ ছাড়া নীতিমালা অনুযায়ী ব্যাংক হিসাব খোলা, ঋণ আবেদন, ডেবিট ও ক্রেডিট কার্ডের নথিপত্র সংগ্রহ করতে পারছেন এসব এজেন্ট থেকে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, এরই মধ্যে মোট ২২টি বাণিজ্যিক ব্যাংক বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছ থেকে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের লাইসেন্স পেয়েছে। তবে ১৯টি ব্যাংক দেশব্যাপী তাদের এ কার্যক্রম পরিচালনা করছে। যে ১৯টি বাণিজ্যিক ব্যাংক এজেন্ট ব্যাংকিং কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে সেগুলো হলো ইসলামী ব্যাংক, ডাচ্‌–বাংলা, ব্যাংক এশিয়া, আল-আরাফাহ্‌ ইসলামী, সোশ্যাল ইসলামী, মধুমতি, মিউচুয়াল ট্রাস্ট, এনআরবি কমার্শিয়াল, স্ট্যান্ডার্ড, অগ্রণী, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী, মিডল্যান্ড, দি সিটি, প্রিমিয়ার, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল, এবি ব্যাংক, এনআরবি, ব্র্যাক ও ইস্টার্ন ব্যাংক।

অর্থসূচক/জেডএ/এমএস