'আর্থিক প্রতিষ্ঠানে গতি ফেরাতে নীতিসহায়তা জরুরি'
শুক্রবার, ২৯শে মে, ২০২০ ইং
today-news
brac-epl
প্রচ্ছদ » App Home Page

‘আর্থিক প্রতিষ্ঠানে গতি ফেরাতে নীতিসহায়তা জরুরি’

গোলাম সারওয়ার ভূঁইয়া ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যান্ড ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট ফিন্যান্স কোম্পানি (আইআইডিএফসি) লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক। তিনি নন-ব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সংগঠন বাংলাদেশ লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স কোম্পানিজ অ্যাসোসিয়েশন (বিএলএফসিএ) এর ভাইস-চেয়ারম্যান। সম্প্রতি অর্থসূচককে দেওয়া একান্ত সাক্ষাতকারে এই খাতের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করেছেন।

নন-ব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাতের বর্তমান অবস্থা কি?

নন-ব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো বর্তমানে কিছুটা কঠিন সময় পার করছে। ২০১৯ সালে পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস লিমিটেড এর অবসায়নের সিদ্ধান্তের পর  এই পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছে। পিপলস লিজিংয়ে রাখা আমানত ফেরত পাওয়ার বিষয়টি নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দেওয়ায় অনেকেই এখন আর্থিক প্রতিষ্ঠানে আমানত রাখতে অস্বস্তি বোধ করছে। শুধু ব্যক্তি নয়, প্রাতিষ্ঠানিক আমানতকারীদের অনেকেও এখন শঙ্কিত। এখন পর্যন্ত আমানতকারীদের টাকা ফেরত পাওয়ার বিষয়ে নির্ভরযোগ্য কোনো সিদ্ধান্ত আসেনি। এই সিদ্ধান্তের কারণেই পুরো আর্থিক খাত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আমানতকারীরা ভাবছেন পিপলস লিজিং এর মতই অন্যান্য প্রতিষ্ঠানও হয়তো টাকা ফেরত দিতে পারবে না। যদিও আইআইডিএফসিসহ কিছু এনবিএফআই এর আর্থিক ভিত্তি অনেক ব্যাংকের চেয়েও মজবুত, তবু আমানতকারীরা আস্থা রাখতে পারছেন না। কারণ তারা ভাল-মন্দ সব প্রতিষ্ঠানকে মিলিয়ে ফেলছেন।

আসলে পিপলস লিজিং এর ঘটনায় প্রভাবিত হয়েছে পুরো লিজিং খাত। ফারমার্স ব্যাংককে ঘুরে দাঁড়াতে সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক যেভাবে সহযোগিতা করেছে, পিপলস এর ক্ষেত্রে সেরকম কিছু দেখা যায়নি। এর ফলে আর্থিক খাত থেকে আমানতকারীদের টাকা পাওয়ার বিষয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এর ফলে ব্যক্তি আমার উপকারের পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক আমানতকারীরা ও এসে নিজেদের টাকা ফেরত নিতে চাচ্ছেন। এমনকি মেয়াদ পূর্তির আগেও টাকা ফেরত চেয়েছেন অনেকে। এই চাপের মুখে ব্যবসা সম্প্রসারণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। খুব দ্রুত এই সমস্যার সমাধান হওয়া উচিত।


অর্থসূচকে প্রকাশিত পুঁজিবাজার ও ব্যাংক-বিমার খবর গুরুত্বপূর্ণ খবরগুলো এখন নিয়মিত পাওয়া যাচ্ছে আমাদের ফেসবুক গ্রুপ Sharebazaar-News & Analysis এ। প্রিয় পাঠক, গ্রুপটিতে যোগ দিয়ে সহজেই থাকতে পারেন আপডেট।


পিপলস লিজিং ছাড়া অন্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর অবস্থা কেমন?

পিপলস লিজিং ছাড়া সার্বিক বিবেচনায় আর্থিক খাতের অবস্থা তেমন খারাপ নয়। আসলে  প্রত্যেকটি সেক্টরেই কিছু শক্তিশালী, কম শক্তিশালী এবং কিছু দুর্বল প্রতিষ্ঠান থাকে। আর্থিক খাতও এর থেকে আলাদা নয়। এই খাতের কিছু কিছু প্রতিষ্ঠান আছে যারা অনেক ব্যাংকের চেয়েও ভাল ব্যবসা করে। যেমন গত বছরেও আমরা এক হাজার কোটি টাকা নতুন ঋণ বিতরণ করেছি। এখাতে কিছু দুর্বল প্রতিষ্ঠানও আছে। কিন্তু পিপলস লিজিং এর ঘোষণা আসার পর থেকে দুর্বলদের পাশাপাশি শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানগুলোতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।

তবে দুয়েকটি প্রতিষ্ঠান একটু নাজুক অবস্থায় থাকলেও সামগ্রিকভাবে আর্থিক খাতের অবস্থা কিন্তু নাজুক নয়। এই খাতে চাপে আছে ঠিকই, কিন্তু বড় সঙ্কটে নেই। এত চাপের মধ্যেও কিন্তু বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠান আমানতকারী চাওয়া মাত্র তাদের আমানতের অর্থ ফেরত দিচ্ছে। এর মধ্যেও কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান ব্যবসা সম্প্রসারণ করছে। এই খাতে খেলাপি ঋণের হার ব্যাংকিং খাতের চেয়ে অনেক কম।

তহবিল অথবা নীতি সহায়তার প্রয়োজন আছে কি?

এই মুহূর্তে আমাদের কিছু নীতি সহায়তা ও তহবিলের প্রয়োজন আছে। এ বিষয়ে বিভিন্ন পর্যায়ে আমরা আলোচনা করে আসছি। সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক ও অর্থমন্ত্রীর সাথে আলোচনা হয়েছে। আমরা একটি নীতি সহায়তা চাচ্ছি। এছাড়াও আমরা চাই পুঁজিবাজারের মত আর্থিক খাতের জন্যেও একটি নির্দিষ্ট মেয়াদে তহবিল গঠন করা হোক।

যেমন আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সিআরআর এর যেসব টাকা ব্যাংকে রাখা আছে এর বিপরীতে ২০০ শতাংশ পর্যন্ত উইথড্র হারের লিমিট দেয়া হোক। দুর্বল আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কিছু ভালো বিনিয়োগ আছে সেগুলোকে সিকিউরিটি হিসেবে নিয়ে তার বিপরীতে একটি তহবিল গঠন করা হোক। ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের সামাজিকভাবে বয়কট করার সুপারিশ করেছি। তারা যেন বিদেশ ভ্রমণ করতে না পারে, রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে দাওয়াত না পায়, আলাদা নামে ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে যাতে বাধাপ্রাপ্ত হয় এবং খেলাপী মামলায় জামিনের সময় যেন ২০ শতাংশ ফেরত নেওয়ার ব্যবস্থা করা হয় তার আবেদন জানিয়েছি আমরা। পাশাপাশি এনআই এক্ট এর জন্য কোর্টের সংখ্যা বাড়ানোর আবেদন  জানানো হয়েছে।

একজন খেলাপি ১০ লাখ টাকার কিস্তি দিতে পারছে না, কিন্তু ১০ কোটি টাকার ব্যয় করে সন্তানের বিয়তে জমকালো অনুষ্ঠান করছে। এটা চলতে পারে না। এরকম ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নেওয়ার কঠোর দাবি জানিয়েছি আমরা।

কিছু প্রতিষ্ঠান চার বছর ধরে রেড জোনে অবস্থান করছে এর কারণ কি?

অনেকগুলো সূচকের বিবেচনায় আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে তিনটি অঞ্চলে বিভক্ত করে বাংলাদেশ ব্যাংক। কিন্তু সবগুলো সূচক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য প্রযোজ্য নয়। অনেকগুলো বিষয় আছে যেগুলো বাদ দেওয়া প্রয়োজন। এ নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাথে আমাদের আলোচনা চলছে। এছাড়াও লাল হলুদ বা সবুজ অঞ্চলে যাওয়া একটি চলমান প্রক্রিয়া। গত বছরে যারা লাল অঞ্চলে ছিল তারা এবছর হলুদ অঞ্চলে চলে এসেছে। আবার হলুদ অঞ্চল থেকে লালে চলেও যেতে পারে। ব্যবসার উপর নির্ভর করেই প্রক্রিয়া চলতেই থাকে।

এসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানীর কাছে খেলাপি ঋণ বিক্রি এবং মার্জার এর বিষয়ে আপনার মতামত কি?

প্রত্যেক খাতেই কিছু সবল ও দুর্বল প্রতিষ্ঠান থাকে। কারো কর্পোরেট গভর্নেন্স ভালো, আবার কেউ দুর্বল। সে ক্ষেত্রে মার্জারের বিষয়টিকে আমি সমর্থন করি। কারণ একটি দুর্বল প্রতিষ্ঠানকে একটি সবল প্রতিষ্ঠানের সাথে যুক্ত করা হলে পর্যায়ক্রমে দুর্বল প্রতিষ্ঠানটিও সবল হয়ে উঠবে।

বিশ্বের অনেক দেশই এসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানীর মাধ্যমে খেলাপি ঋণ কমাতে সক্ষম হয়েছে। তারা যেহেতু খারাপ ঋণগুলো কিনে নিচ্ছে, সেহেতু এখানে দুপক্ষেরই লাভ। যে ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান খেলাপি ঋণ আদায় করতে পারছে না; বা দীর্ঘ সময় তাদের পক্ষে অপেক্ষা করা সম্ভব নয়, এসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানীর কাছে সেই ঋণ বিক্রি করে টাকা পেলে নতুন বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হবে। তবে এক্ষেত্রে সরকারি নীতি সহায়তা এবং আইনের সঠিক প্রয়োগ অত্যন্ত জরুরী। তাহলে দেশের পুরো অর্থনীতি উপকৃত হবে।

খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির পেছনে কী নৈতিক অবক্ষয়েরও কোনো যোগসূত্র আছে? আমাদের শিক্ষার কারিকুলামে কী নৈতিক শিক্ষার প্রতি আরেকটু বেশি গুরুত্ব আরোপ করা প্রয়োজন?

শুধু আর্থিক খাতে নয়, সব খাতেই নৈতিক অবক্ষয়ের প্রভাব পড়েছে। তা না হলে হাজার হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার হচ্ছে কিভাবে। দুর্নীতি প্রতিরোধকারী প্রতিষ্ঠানগুলো কি করছে। শুধু আইন করে কোনো দেশের দুর্নীতি নির্মূল করা সম্ভব নয়। আইনের কঠোর প্রয়োগও হতে হবে। পাশাপাশি সচেতনতা ও নৈতিকতা চর্চার প্রতিও গুরুত্ব দিতে হবে।

স্কুল-কলেজে নৈতিক শিক্ষার প্রতি গুরুত্ব তো বাড়াতে হবেই, পরিবার এবং সমাজেও এর চর্চা করতে হবে বেশি করে। কারণ মানুষের নৈতিক শিক্ষা শুরু হয় ঘর থেকে। কোনো সন্তান যদি দেখে তার বাবা কোনো অনিয়ম করছে, দুর্নীতির মাধ্যমে অর্থ রোজগার করছে, তার আয়ের সঙ্গে মিল নেই এমন জীবনযাপন করছে তাহলে ওই সন্তান সেটিকেই স্বাভাবিক বলে ধরে নেবে। সন্তানও পরবর্তীতে একই কাজ করবে। অন্যায় কাজ করতে কোনো দ্বিধাহবে না তার। কোনো অনুশোচনা হবে না।

সমাজেও নৈতিকতার চর্চা বাড়াতে হবে। দুর্নীতিবাজদের শিক্ষা দিতে হলে তাদের সামাজিকভাবে বয়কট করতে হবে। পাসপোর্ট জব্দ, রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে দাওয়াত না দেয়া, বিদেশে যেতে বাধা সৃষ্টি করলে এটার একটা ইতিবাচক প্রভাব দেখা যাবে। যেখানে একজন গ্রাহক ১০ লাখ টাকার কিস্তি পরিশোধ না করে ১০ কোটি টাকা খরচ করে স্টেডিয়াম ভাড়া নিয়ে পারিবারিক অনুষ্ঠান করছে সেখানে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে। তা না হলে তারা আরও উৎসাহিত হবে। তাই এগুলোকে সুকৌশলে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। মাত্র ৫০ হাজার টাকা বেতন পেয়ে একজন কর্মকর্তা বিলাসবহুল গাড়ি, বাড়ি ব্যবহার ও জাঁকজমক জীবনযাপন করেন কিভাবে। মসজিদ মাদ্রাসায় বড় অঙ্কের দান করে কিভাবে। তাদেরকে সমাজিকভাবে বয়কট করা দরকার। অনুদান নেওয়ার আগে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদেরকেও একবার খোঁজ নেওয়া দরকার, ওই ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান বৈধভাবে আয় করছে কি-না। কারণ আমরা যদি তাদের বয়কট না করে চাঁদা চাইতে যাই তাহলে পরোক্ষভাবে তাদেরকে উৎসাহিত করা হবে। এজন্য সচেতনতা বৃদ্ধি ও তাদের বিরুদ্ধে জনমত তৈরি করা সময়ের দাবি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে কোনো তহবিল সহায়তা বা নীতি সহায়তা চান কি না?

আপদকালীন সময় আমরা বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছ থেকে একটি তহবিল সহায়তা চাই। যাতে করে জনগণের আস্থা ফেরানো যায়। আমরা যদি পুনরায় আগের অবস্থানে ফিরে যেতে পারি তাহলে আবার নিজেরা নিজেদের মত আগাতে পারব। এছাড়া আইনগত সহায়তার বিষয়েও আমরা সুপারিশ করেছি। আর্থিক প্রতিষ্ঠান আইন ২০২০-এ খেলাপি ঋণ গ্রহীতাদের সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। সেখানে কিধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে সে বিষয়েও উল্লেখ করা আছে। এটার যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে পারলেই তাহলে আমি আশাবাদী অবস্থার উন্নতি হবে।

 

এই বিভাগের আরো সংবাদ