বিশ্বাস আর একটু যত্নের নামই ভালোবাসা
মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই, ২০২০
today-news
brac-epl
প্রচ্ছদ » App Home Page

বিশ্বাস আর একটু যত্নের নামই ভালোবাসা

১৪ ফ্রেব্রুয়ারি। বিশ্বজুড়ে পালিত হয়েছে ভ্যালেন্টাইনস ডে বা ভালোবাসা দিবস। পিছিয়ে নেই আমরাও। ভালোবাসার সঙ্গে বসন্ত বরণ এক হওয়ায় গোটা শহর ভরে উঠেছিল হলুদ আর লালের মেলায়।

দোয়েল চত্বর থেকে শাহবাগ মোড়, পলাশি থেকে ঢাবি কলাভবন ক্যাম্পাস আর ওদিকে প্রেসক্লাব থেকে কার্জন হল ছাড়িয়ে সেই নিউমার্কেট পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছিলো তরুণ-তরুণীদের ঢল। অপেক্ষাকৃত অল্পবয়সীদের ভিড়ে দেখা গেছে বিবাহিত যুগলদেরও।

শুক্রবার ছুটির দিন হওয়ায় সপরিবারে বেরিয়ে পড়েছিল ভালোবাসার সুবাস নিতে। এতসব ভালোবাসার ভিড়ে খানিকটা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিলো নাগরিক জীবন। রাজধানীর সড়কগুলোতে স্থবির হয়ে পড়েছিলো যান চলাচল। অফিস থেকে আমাকে তো একপ্রকার হেঁটেই বাড়ি ফিরতে হয়েছে। মাত্র তিনবার বাস-রিকসা পাল্টে এবং সবশেষে শাহাবাগ মোড় পাড় হয়ে রমনাপার্কের বুক চিড়ে বয়ে যাওয়া সরু রাস্তা ধরে হেঁটে তবেই না বাড়ি ফিরেছি। আর পার্কের ভিতর দিয়ে আসতে আসতে অনুভব করেছি ভালোবাসা দিবসকে ঘিরে বাঙালি তরুণ প্রজন্মের উচ্ছ্বাস। অনেক হয়তো প্রশ্ন তুলবেন, এভাবে দল বেঁধে রাস্তায় আর পার্কে ঘুরে বেড়ানোটাই কি ভালোবাসা? মোটেই তা নয়, মনে প্রেম থাকলে ঘরে বসেই তা প্রকাশ করা সম্ভব। করোনার ভয়ে চীনা তরুণ-তরূণীদের তো ঘর থেকে বের হয়ে ভালোবাসা দিবস উদযাপনের কোনও সুযোগ ছিলো না। তাই তারা ঘরে বসে স্যোশাল মিডিয়ার মাধ্যমে প্রিয়জনদের সঙ্গে সময় কাটিয়েছেন, শেয়ার করেছেন মনের আবেগ।

১৪ ফেব্রুয়ারিকে নিয়ে আমরা যতই আবেগের ডালা উপুর করে দেই না কেন, ভালোবাসা কোনো দিনক্ষণের ধার ধারে না। ভালোবাসা একদিনের নয়, বছরেও নয়, প্রতিটি মুহূর্ত আমরা ভালোবাসার মধ্যেই বসবাস করছি। যদিও আমরা সবসময় আমরা তা টের পাই না। যেমন সারাক্ষণ বাতাসের মধ্যে থেকে উপলব্ধি করতে পারি না অক্সিজেনের গুরুত্ব।

দিন কয়েক আগে আমার গৃহকর্মী পারুলকে নিয়ে একটা স্ট্যাটাস দিয়েছিলাম। সেখানে লাইক কমেন্টের বন্যা বয়ে গেছে, বহু সুন্দর সুন্দর কমেন্টসও এসেছে। পারুলের বাড়ি ময়মনসিংহের নেত্রকোনা জেলার প্রাত্যন্ত গ্রামে। গত বুধবার দেশ থেকে ফেরার সময় সে আমার জন্য পিঠা, বরুই, সিমসহ হাবিজাবি নানান কিছু নিয়ে এসেছে। হয়তো এসব কিছু তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয়, এগুলোর আর্থিক মূল্যও নগণ্য। কিন্তু ও আমার কথা ভেবে, আমাকে ভালোবেসেই এনেছে এসব। আর আমিও ভালোবেসেই ওর দেয়া উপহারগুলো গ্রহণ করেছি। আমি জানি, এসব ফিরিয়ে দিলে সে কষ্ট পেত। গোটা বিষয়টাই আসলে এক ধরনের বড় রকমের ভালোবাসার বিনিময়।

এমন না যে, আমি তার ওপর রাগ করি না, বকা দেই না। অন্যরা যা যা করে কাজের বুয়াদের সঙ্গে আমি হযতো তার সবই করি, কিন্তু ওকে একটা স্পেস দেই। ওর ওপর কখনও নজদারি করি না, প্রভুত্ব ফলাই না। সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে আমার এখানে কাজ করে সে। সকালে নিজে হাতে চা আর রুটি বানিয়ে আমাকে দেয়, নিজে খায়। যখন যেটা প্রয়োজন নিজে হাতে নিয়ে নেয়, কখনও কোন কিছু নিয়ে দ্বিধা করে না। ওর ওপর আমার পুরোপুরি বিশ্বাস আছে, ওর দ্বারা কখনও আমার কোন ক্ষতি হবে না। আমার কাছে এই বিশ্বাস আর স্বাধীনতার নামই ভালোবাসা।

এখানে বুয়ার প্রসঙ্গ টানলেও ভালোবাসার মানুষের কাছে মোটামুটি সব মানুষের চাওয়াই কিন্তু এক। তারা ভালোবাসার মানুষের কাছে, স্বাধীনতা চায়, বিশ্বস্ততা চায়, খানিকটা যত্নও চায়। যেই স্পর্শে বিশ্বাস নেই, সেই ভালোবাসা বেশি দিন টিকে না, তা যতই ফুল আর চকলেট বিনিময় হউক না কেন। একই সঙ্গে ভালোবাসা একটু স্পেস চায়, ভালোবাসা থেকে একটু দূরে নিঃশ্বাস ফেলার সুযোগ চায়। যেমন নদীতে থাকা মাছও জলের বাইরে নাক উঁচিয়ে বাতাস টেনে নেয়। ভালোবাসাকে বেশিদিন বাঁচিয়ে রাখার জন্যই এটুকু স্পেস জরুরি।

শেষ করছি প্রয়াত কবি ও কথাশিল্পী নবনীতা দেবসেনের একটা লেখার কিছু অংশ দিয়ে। আজকের দিনে ভালোবাসার এর চেয়ে সুন্দর ব্যাখ্যা আর পাইনি।

ভালবাসা হল – বাড়ি ফিরতে দেরি হলে যখন মা বলে, “কী হল, আজ অনেক দেরি হয়ে গেল !”

ভালোবাসা হল – কাজের থেকে ফিরলে বাবা যখন প্রশ্ন করে, “আজ কি খুব খাটাখাটুনি গেল ?”

ভালোবাসা হল – বৌদি যখন বলে, “কি রে, মেয়ে দেখছি তোর জন্য । তোর কাউকে পছন্দ থাকলে বল ।”

ভালবাসা হল – যখন দাদা বলে, “তুই একদম চিন্তা করিস না, আমি তো আছিই !”

ভালোবাসা হল – মন খারাপ বুঝতে পেরে ছোট বোন যখন বলে, “চল না দাদা, একটু ঘুরে আসি ।”

ভালোবাসা হল – প্রিয় বন্ধু যখন জড়িয়ে ধরে বলে, “তোকে ছাড়া কিছু জমে না রে !”

এইগুলো খুবই ছোট কিন্ত জীবনের অমুল্য মুহূর্ত ! এইগুলো হারিয়ো না ।

ভালোবাসা শুধুমাত্র বয়ফ্রেন্ড বা গার্লফ্রেন্ড থাকা নয় ।

ভালবাসো তাদের যারা তোমার জীবনের এক একটা বিশেষ অংশ জুড়ে আছে ।

যখন ছোট্ট মেয়েটি বাবার মাথা যন্ত্রনা করছে বলে কপাল টিপে দেয় – সেটাই ভালোবাসা ।

যখন স্বামীর জন্য চা করতে গিয়ে স্ত্রী তাতে একটা চুমুক দিয়ে দেখে চিনিটা ঠিকঠাক হয়েছে কিনা – সেটাই ভালবাসা ।

যখন মা সন্তানের জন্য খাবারের বড় টুকরোটা সরিয়ে রাখে – সেটাই ভালোবাসা ।

পিচ্ছিল রাস্তায় যখন তোমার বন্ধু তোমার হাতটা শক্ত করে ধরে রাখে – সেটাই ভালোবাসা ।

ফোনের ইনবক্সে যখন দাদার মেসেজ আসে – ‘কি রে ঠি ক ঠা ক পৌঁছে গেছিস তো ?’ – সেটাই ভালোবাসা ।

একটা ছেলে একটা মেয়ের হাত ধরাধরি করে ঘুরে বেড়ানোর নাম ভালোবাসা নয় ।

ভালোবাসা হল – যখন তোমার একটা একটা ছোট্ট মেসেজ তোমার বন্ধুর মুখে হাসি ফোটায় ।

নিরাপত্তা, বন্ধন, বিশ্বাস আর একটু যত্নের নামই ভালোবাসা।

মাহমুদা আকতার: লেখক ও সাংবাদিক

অর্থসূচক/এনএম

এই বিভাগের আরো সংবাদ