আজ বসন্ত: বাঙালির প্রেমের উৎসব
বুধবার, ২৬শে ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ইং
today-news
brac-epl
প্রচ্ছদ » App Home Page

আজ বসন্ত: বাঙালির প্রেমের উৎসব

ষড়ঋতুর দেশ বাংলাদেশ। গ্রীষ্ম, বর্ষা, শরৎ, হেমন্ত, শীত ও বসন্তকে এক সাথে বলা হয় ষড়ঋতু। আর বসন্তকে বলা হয় ‘ঋতুরাজ’। কথাটি শুনলেই ফুলের ঘ্রাণ এসে দোলা দেয় মনে। মনে হয় ফুলেলময় দিনের কথা। বাংলা ভাষাভাষিরা পহেলা ফাল্গুনে বসন্ত উৎসবে মেতে উঠে। তবে শুধু কি বাংলাদেশিরাই এ উৎসবে মেতে উঠে? মোটেই নয়, ঋতু ভেদে সারাবিশ্বেই পালিত হয় বসন্ত।

স্থান: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ছবি মহুবার রহমান। ১৯ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮।

এদেশের মানুষ গাছের ডালে নতুন পাতায় দেখতে পায় বসন্তের আগমনী বার্তা। শীতের ঝরাপাতা মারিয়ে আর কোকিলের ডাকের সাথে মিলেমিশে বাংলার বুকে আসে বসন্ত। পহেলা ফাল্গুনে এই বসন্ত পালন করা হয়। এদিন লাল, হলুদ রঙয়ের পোশাক পরে খোপায় ফুল গুজিয়ে নারী ও তরুণীরা উৎসবে মেতে উঠেন। তবে ঋতুরাজ বসন্তের আগমনের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক রয়েছে ভালোবাসার। দুইয়ে মিলে প্রাণবন্ত হোক আমাদের যত আশা, ‘ফাগুনের আগুন লাগে তোমার হৃদয়ে, বলি হে সখা সেজেছো কেমন নতুনের আগমনে’। ঋতুরাজ বসন্ত। এ ঋতুতে প্রকৃতিকন্যা নতুন রূপে সজ্জিত হয়। বিশেষ করে গাছে নতুন কচি পাতার আগমন ঘটে। ‘শিমুল, পলাশ আর কৃষ্ণচূড়ার আবাসে চারিদিক লাল রাঙা হয়ে পড়ে।’ বসন্তে রমণীরা হলুদ-লালচে শাড়ির মিশেলে নিজেদের সুন্দরভাবে সাজিয়ে তোলেন।

তেমনি ভালোবাসা দিবসেও অপরূপে সজ্জিত হয় বিভিন্ন বয়সী। আজ ফাল্গুনের প্রথম প্রহরে রক্তিম লালিমা নিয়ে সূর্য তার ভালোবাসায় প্রকৃতিকে নবরূপে সজ্জিত করে। আজ আপনজনকে ভালোবাসা বিলানোর দিন। ভালোবাসা শুধুই লোক দেখানো নয়, ভালোবাসা আত্মার এক নিবিড় সম্পর্ক। ভালোবাসে না, এমন মানুষ খুব কমই আছে পৃথিবীতে।

ভালোবাসা মনের সব অন্ধকারকে দূর করে আলোর সন্ধান এনে দেয়। ভালোবাসার জন্য কোনো দিবস লাগে না। তবুও আমরা ভ্যালেন্টাইনের প্রেমের কাহিনিকে অবলম্বন করে ভালোবাসার জন্য দিনক্ষণ পেতে রেখেছি। ভালোবাসার জন্য অনন্তকালের প্রয়োজন নেই। ভালোবাসা খুবই আবেগ আর স্নেহমাখা বুলি। ভালোবাসা শুধু প্রেমিক-প্রেমিকার মাঝে সীমাবদ্ধ নয়। ভালোবাসাটা জগৎজুড়ে এক মায়ার বন্ধন। মা-বাবা, আত্মীয়স্বজন সবাই ভালোবাসার অংশ।

ভালোবাসা অন্য রকম অভিজ্ঞতা। কেউ ভালোবেসে হাসে, কেউ বা ভালোবেসে হাসায় অন্যজনকে। ভালোবাসা দিবসে কেউ ছুটে আপনজনের সান্নিধ্যে, কেউ আবার ভালোবাসার টানে ছুটে যায় ছিন্নমূলের কাছে। কেউ ভালোবাসে, কেউ ভালোবাসায়। এই ভালোবাসাবাসির মধ্যখানে আবার কেউ এসে দেয়াল হয়ে দাঁড়ায়। পবিত্র ভালোবাসার জয় দেখতে আগ্রহী আমরা সবাই। ভালোবাসায় পরিপূর্ণ হোক সবার জীবন।

বসন্ত উৎসবের একদম প্রাচীনতম রুপ প্রোথিত আছে দোলযাত্রার মাঝে। ফাল্গুন মাসের পূর্ণিমা তিথিতে অনুষ্ঠিত হয় দোলযাত্রা। আর এর প্রাণকেন্দ্রে থাকেন রাধা-কৃষ্ণ। তাদেরকে দোলায় বসিয়ে পূজা করা হয়। উত্তর ভারতে যেটিকে বলা হয় হোলি, বাংলায় সেটিই পরিচিত দোল হিসেবে।

ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়, ভারতবর্ষের পূর্বাঞ্চলের প্রাচীন আর্য জাতির হাত ধরে এই উৎসবের জন্ম। খ্রিস্টের জন্মেরও বেশ কয়েকশো বছর আগে থেকে উদযাপিত হয়ে আসছে এই উৎসবটি। আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ৩০০ অব্দে পাথরের উপর খোদাই করা এক পাথরে পাওয়া গেছে এই উৎসবের নমুনা। এছাড়া হিন্দুদের পবিত্র গ্রন্থ বেদ ও পুরাণেও রয়েছে এই উৎসবের উল্লেখ।

এছাড়াও এই উৎসবের ফিরিস্তি রয়েছে আরো বহু জায়গায়। তৃতীয়-চতুর্থ শতকে বাৎস্যায়ন রচনা করেছিলেন তার জগদ্বিখ্যাত ‘কামসূত্র’। সেখানে দেখা যায় দোলায় বসে নর-নারীর আমোদ-প্রমোদের বিবরণ। সপ্তম শতকের দিকে রাজা হর্ষবর্ধনের শাসনামলে সংস্কৃত ভাষায় লেখা হয়েছিল একটি প্রেমের নাটিকা, সেখানেও ছিল হোলির বর্ণনা। সপ্তম শতকে রচিত শ্রীকৃষ্ণের ‘রত্নাবলী’ এবং অষ্টম শতকের ‘মালতী-মাধব’ – এই দুই নাটকেও দেখা মেলে এই উৎসবের। তালিকা থেকে বাদ দেয়া যাবে না জীমূতবাহনের ‘কালবিবেক’ ও ষোড়শ শতকের ‘রঘুনন্দন’ গ্রন্থের কথাও। পরবর্তী সময়ে ভারতবর্ষজুড়ে অনেক মন্দিরের গায়েও হোলি খেলার নমুনা বিভিন্নভাবে ফুটে উঠতে দেখা যায়।

প্রথমদিকে ভারতবর্ষে এসে ইংরেজরা এই উৎসবকে রোমান উৎসব ‘ল্যুপেরক্যালিয়া’র সাথে গুলিয়ে ফেলেছিল। অনেকেই আবার একে গ্রিকদের উৎসব ‘ব্যাকানালিয়া’র সাথেও তুলনা করত।

অর্থসূচক/এএইচআর

এই বিভাগের আরো সংবাদ